শিশুরা সত্যিই আমাদের পৃথিবীর সবচেয়ে অসাধারণ সৃষ্টি। তাদের ছোট্ট দেহের ভিতর লুকিয়ে থাকে এমন কিছু ক্ষমতা যা বড়দের চোখেও যেন যাদুর মতো মনে হয়। এই আর্টিকেলে আমরা শিশুদের জন্মগত দশটি সুপারপাওয়ার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব এবং দেখব কীভাবে এই ক্ষমতাগুলো তাদের প্রতিদিনের জীবনে কার্যকর হয়।
শিশুরা শুধু কিউট নয়; তারা প্রকৃত অর্থে “মিনি সুপারহিরো”। তাদের জন্মকাল থেকেই শুরু হয় এই আশ্চর্য ক্ষমতার প্রকাশ। একে বলা যায় মানবদেহের জাদুকরী নকশা।
১. কখনোই কাঁদে না!
অনেকে ভাবেন, নবজাতকের কাঁদা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শিশু জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসে সত্যিকারের কাঁদার ক্ষমতা রাখে না। তাদের অশ্রুনালী বিকাশিত হয় না, তাই তারা কেবল চিৎকার, নাক সুঁকানো বা অস্বস্তি প্রকাশের মাধ্যমে নিজের অনুভূতি জানায়।
গবেষকরা বলেছেন, শিশুরা আসলে শারীরিকভাবে কান্না উৎপাদন করতে সক্ষম নয়। তারা চিৎকার বা নরম আওয়াজ করে নিজেদের অসুবিধা বা ক্ষুধা জানানোর চেষ্টা করে। এটি একটি প্রাকৃতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
২. জন্মগত জলমানব ক্ষমতা
শিশুরা পানির নিচে এক অদ্ভুত স্বাচ্ছন্দ্যবোধ প্রকাশ করে। এই ক্ষমতাকে বলা হয় ‘ডাইভিং রিফ্লেক্স’। জন্মের পর ছয় মাস পর্যন্ত শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই পানির নিচে শ্বাস বন্ধ করতে পারে এবং সাঁতারের মতো মুভমেন্ট করে।
গবেষণা অনুযায়ী, শিশুরা জন্মের কিছু মাসে নিজেই জানে কখন পানি থেকে শ্বাস নিতে হবে এবং কীভাবে গিলে খাবার বা পানীয় নেওয়া যায়। এটি প্রাকৃতিকভাবে জীবিত থাকার একটি অসাধারণ কৌশল।
শিশুদের এই ক্ষমতা শুধু জলের সাথে পরিচিতি নয়, বরং তাদের সংরক্ষণ ও সুরক্ষা তত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৩. গিলে খাওয়া এবং শ্বাস নেওয়া একসাথে করা
শিশুদের গলবিল বড়দের তুলনায় উঁচুতে থাকে। ফলে তারা সহজেই খাবার গিলে ফেলতে পারে এবং একই সময়ে শ্বাস নিতে পারে।
বড়দের ক্ষেত্রে যদি খাবার গিলে নেওয়ার সময় শ্বাস নেওয়া হয়, তা দমবন্ধের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু শিশুদের এই জন্মগত ক্ষমতা তাদের খাদ্য গ্রহণ প্রক্রিয়াকে নিরাপদ রাখে। বিশেষ করে পানির নিচে বা হালকা খেলাধুলার সময় এটি কার্যকর হয়।
৪. অসীম হাঁচির ক্ষমতা
শিশুদের নাকের নাসারন্ধ্র বড়দের তুলনায় অনেক চিকন। তাই নাক পরিষ্কার রাখার জন্য তারা হাঁচি দিতে বাধ্য হয়। হাঁচি দেওয়ার সময় শিশুদের নাক থেকে জীবাণু ও ধূলিকণা বের হয়, যা তাদের শ্বাসযন্ত্রকে সুস্থ রাখে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। শিশুদের নাক পরিষ্কার রাখার এই ছোট্ট ক্ষমতা বড়দের কাছে অনেকটাই বিস্ময়কর।
৫. যখন খুশি ঘুমানো
নবজাতকরা এমন এক গভীর ঘুমে থাকে, যেখানে চারপাশের শব্দ বা আলো তাদের জাগাতে পারে না। এটি তাদের জন্মগত এক বিশেষ ক্ষমতা।
এই ঘুম শিশুদের মস্তিষ্ক, দেহ ও ইমিউন সিস্টেমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা যদি অল্প বয়সেই গভীর ঘুমে থাকে, তা তাদের বৃদ্ধি, শেখার ক্ষমতা এবং রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।

৬. নিজের ভাষা বোঝার ক্ষমতা
গবেষকরা বলেছেন, নবজাতকের কান্না তাদের মায়ের মাতৃভাষার সুর ও স্বরে প্রভাবিত হয়। জন্মের আগেই শিশু মায়ের গলার সুর ও মাতৃভাষার স্বর শনাক্ত করতে শেখে।
ফলে তারা নিজের ভাষার মতো সুরে কান্না করে এবং মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। এটি তাদের মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৭. হামাগুড়ি দেওয়ার প্রাকৃতিক দক্ষতা
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, নবজাতকও প্রথম কয়েক মাসে হামাগুড়ি দিতে শেখে। মায়ের বুকে পৌঁছানোর জন্য তারা নিজে নিজে ছোট ছোট মুভমেন্ট শুরু করে।
এই ক্ষমতা শুধু শারীরিক বিকাশ নয়, বরং শিশুদের কৌশলশক্তি ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাকেও বাড়িয়ে দেয়।
৮. অতিরিক্ত নমনীয় দেহ
নবজাতকের দেহ প্রায় ৩০০ হাড় নিয়ে গঠিত, যা বয়সের সাথে কমে আসে। জন্মের সময় তাদের দেহ তুলতুলে ও নমনীয় থাকে, যা প্রসব প্রক্রিয়াকে সহজ করে।
এই নমনীয়তা তাদের দৈহিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করে এবং বিভিন্ন আন্দোলন, হামাগুড়ি, গিলতে খেতে সক্ষম হওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করে।
৯. চুল ও চোখের রূপ পরিবর্তনের ক্ষমতা
শিশুদের চুল ও চোখের রঙ প্রাথমিকভাবে পরিবর্তনশীল। কালো চুল স্ট্রেইট হতে পারে, কোকড়া চুল সোজা হতে পারে। চোখের রঙও বয়সের সাথে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়।
শিশুদের এই পরিবর্তনশীলতা তাদের শারীরিক বৈচিত্র্য এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের পরিচায়ক।
১০. দ্রুত ওজন বৃদ্ধি, কিন্তু মোটা নয়
প্রথম বছরে শিশুর ওজন প্রায় তিনগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু শরীরের বৃদ্ধি এত দ্রুত ঘটে যে, তারা মুটিয়ে যায় না। এটি স্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধির একটি অংশ এবং তাদের শরীরের বৃদ্ধি প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে।
শিশুদের এই দ্রুত বৃদ্ধির ক্ষমতা তাদের জীবনের প্রথম বছরগুলোতে শক্তি ও স্বাস্থ্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের ক্ষমতার শিক্ষা ও প্রভাব
শিশুরা এই ক্ষমতা দিয়ে শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিক ও সামাজিক দিক থেকেও অনন্য। শিশুদের জন্মগত এই “সুপারপাওয়ার” প্রাপ্তি মানব জীবনের বিস্ময়জনক দিক তুলে ধরে।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা ছোট বেলায় যেমন পানিতে সাঁতার কাটা বা হামাগুড়ি দেয়, তেমনই তারা দ্রুত শিখতে সক্ষম হয়। তাদের জন্মগত নমনীয়তা ও ভাষা বোঝার ক্ষমতা মস্তিষ্কের সৃজনশীলতা ও চিন্তার বিকাশেও সাহায্য করে।
শিশুদের এই বিশেষ ক্ষমতাগুলো সঠিক পরিবেশে বিকশিত হলে তারা শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক দিক থেকে সুস্থ ও সক্রিয় হতে পারে।
শিশুরা শুধু ছোট নয়, তারা বাস্তব জীবনের ছোট্ট সুপারহিরো। জন্মকাল থেকেই তাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকে এমন কিছু অসাধারণ ক্ষমতা যা আমাদের বিস্মিত করে। তাদের এই জন্মগত সুপারপাওয়ারকে বুঝতে পারা এবং সঠিকভাবে বিকাশে সাহায্য করা আমাদের দায়িত্ব।
শিশুরা আমাদের পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময়, শক্তিশালী এবং প্রাকৃতিক “সুপারহিরো”। তাদের জন্মগত ক্ষমতা কেবল আনন্দ এবং বিস্ময় নয়, বরং মানবজীবনের জীবনীশক্তিরও এক নিদর্শন।