কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া পুণ্ড্রনগর: প্রাচীন বাংলার প্রথম রাজধানী ও মহাস্থানগড়ের সমৃদ্ধ ইতিহাস
প্রাচীন যুগের বাংলা ভূখণ্ড আজকের মতো কোনো একক রাজনৈতিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল না; বরং তা বিভক্ত ছিল একাধিক ভূ-সাংস্কৃতিক অঞ্চলে, যা ইতিহাসে জনপদ নামে খ্যাত। পুণ্ড্র, গৌড়, বঙ্গ, সমতট, হরিকেল, রাঢ় ও বরেন্দ্র জনপদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন এবং সুসংগঠিত নগর সভ্যতার ভিত্তি গড়ে উঠেছিল বরেন্দ্রভূমির বুকে—যা ইতিহাসে পুণ্ড্রবর্ধন এবং যার প্রাণকেন্দ্র পুণ্ড্রনগর (বর্তমান বগুড়ার মহাস্থানগড়) নামে অমর হয়ে রয়েছে।
খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে শুরু করে মুসলিম বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার বছর ধরে পুণ্ড্রনগর ছিল প্রাচীন বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক প্রশাসনিক কেন্দ্র, ব্যবসা-বাণিজ্যের আন্তর্জাতিক মহাধমনী এবং বৌদ্ধ, জৈন ও ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির মিলনমেলা। করতোয়া নদীর শান্ত প্রবাহের তীরে গড়ে ওঠা এই সুরক্ষিত দুর্গনগরী বাংলার লিখিত ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন জীবন্ত স্মারক।

বৈদিক সাহিত্য ও মহাকাব্যে পুণ্ড্র জাতির প্রাচীনতম উপস্থিতি
ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন সাহিত্যে পুণ্ড্রদের উল্লেখ পাওয়া যায় হাজার হাজার বছর পূর্ব থেকে। ঋগ্বেদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঐতরেয় আরণ্যক-এ সর্বপ্রথম ‘পুণ্ড্র’ জাতির নাম উচ্চারিত হয়েছে আর্য সংস্কৃতির বহির্ভূত এক পরাক্রমশালী অনার্য জনগোষ্ঠী হিসেবে। পরবর্তীতে মহাভারত, রামায়ণ, মৎস্য পুরাণ এবং কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র-এ পুণ্ড্র জনপদের ভৌগোলিক ও বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির বহুবিধ বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে।
মহাভারতের পৌরাণিক বিবরণ অনুযায়ী, অসুর রাজা বলির ঔরসে এবং রানি সুদেষ্ণার গর্ভে মহর্ষি দীর্ঘতমার বরে পাঁচ রাজপুত্রের জন্ম হয়—অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র এবং সুহ্ম। এই পাঁচ পুত্র পূর্ব ভারতে পাঁচটি শক্তিশালী জনপদ প্রতিষ্ঠা করেন, যার মধ্যে পুণ্ড্রদের আবাসভূমিই পরবর্তীতে বিস্তৃত পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই পৌরাণিক আখ্যানটি প্রাচীন বাংলার আদিম জাতিগোষ্ঠীর ভূখণ্ড বিভাজন ও নগর গঠনের এক রূপক সামাজিক দলিল।
প্রাচীনকালে করতোয়া নদী পুণ্ড্র জনপদকে পূর্বের প্রাগজ্যোতিষপুর (বর্তমান আসাম) এবং কামরূপ থেকে পৃথক করেছিল, আর পশ্চিমে গঙ্গা ও মহানন্দা নদী এর স্বাভাবিক প্রাকৃতিক সীমানা নির্ধারণ করত। উর্বর পলল মাটি ও নদীবাহিত অনুকূল ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পুণ্ড্রনগরে খুব দ্রুত কৃষিনির্ভর সমাজ থেকে একটি উন্নত নগররাষ্ট্রের রূপান্তর ঘটেছিল।
মহাস্থান ব্রাহ্মী লিপি: বাংলার লিখিত ইতিহাসের প্রথম প্রামাণ্য দলিল
১৯৩১ সালে মহাস্থানগড়ের ধ্বংসাবশেষে মাটির নিচ থেকে আবিষ্কৃত হয় একটি ক্ষুদ্র চুনাপাথরের খণ্ডাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে মহাস্থান ব্রাহ্মী লিপি নামে যুগান্তকারী স্থান দখল করে আছে। মাত্র ছয় লাইনে খোদাই করা প্রাকৃত ভাষার এই শিলালিপিটি খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের মৌর্য সম্রাট অশোকের সমকালীন বলে পণ্ডিতদের দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে।

এই শিলালিপিতে ‘পুণ্ড্রনগর’-এর সুনির্দিষ্ট নাম উল্লেখ রয়েছে এবং এটি বাংলার প্রথম প্রশাসনিক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক লিখিত দলিল। লিপিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, কোনো এক জরুরি অবস্থা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে (সম্ভবত অনাবৃষ্টি বা দুর্ভিক্ষের সময়) পুণ্ড্রনগরের স্থানীয় শাসক মহামাত্র যেন রাজকীয় শস্যাগার থেকে প্রজাদের জন্য খাদ্যশস্য এবং ‘গণ্ডক’ ও ‘কাকনিক’ নামক প্রাচীন মুদ্রা ঋণ হিসেবে বিতরণ করেন। একইসাথে সেখানে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছিল যে, সুদিন ফিরে এলে প্রজারা আবার সেই শস্য ও মুদ্রা রাজকোষে ফিরিয়ে দেবে।
মহাস্থান ব্রাহ্মী লিপিটি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকেই পুণ্ড্রনগর ছিল এক সমৃদ্ধ মৌর্য প্রাদেশিক শাসনকেন্দ্র, যেখানে কেন্দ্রীভূত রাজস্ব ব্যবস্থা, শস্য গুদামজাতকরণ এবং আধুনিক জনকল্যাণমুখী ত্রাণ পরিচালনার সুসংগঠিত কাঠামো বিদ্যমান ছিল।
মৌর্য থেকে গুপ্ত যুগ: পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তির স্বর্ণালী অধ্যায়
মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর বাংলায় সাময়িক রাজনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ ঘটলেও খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের উত্থানের সাথে সাথে পুণ্ড্রনগর পুনরায় তার হারানো গৌরব ফিরে পায়। গুপ্ত রাজারা সমগ্র বাংলাকে বিভিন্ন প্রশাসনিক বিভাগে ভাগ করেছিলেন, যাকে বলা হতো ভুক্তি। এদের মধ্যে সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুক্তি ছিল পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তি।
দামোদরপুর ও বৈগ্রাম থেকে প্রাপ্ত গুপ্ত যুগের তাম্রশাসনগুলো থেকে জানা যায়, পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তির প্রাদেশিক গভর্নর বা উপরিকে সরাসরি গুপ্ত সম্রাটদের দ্বারা নিযুক্ত হতেন। সম্রাট প্রথম কুমারগুপ্ত ও বুধগুপ্তের আমলে পুণ্ড্রনগর ছিল এমন এক আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক কেন্দ্র, যেখানে নগরপাল, মহত্তর (স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ), প্রথম-কুলিক (প্রধান কারিগর) এবং প্রথম-কায়স্থ (প্রধান লেখক বা সচিব)-এর সমন্বয়ে গঠিত একটি আধুনিক পৌর পরিষদ শহর পরিচালনা করত।
গুপ্ত যুগে পুণ্ড্রনগর শুধুমাত্র শাসনকেন্দ্রই ছিল না, বরং তা উত্তর ভারতের গঙ্গা উপত্যকার সাথে পূর্ব ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগকারী প্রধান বাণিজ্যিক ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছিল। করতোয়া ও পদ্মার সংযোগকারী নৌপথ দিয়ে বস্ত্র, সুগন্ধি কাঠ, চাল ও মসলা রপ্তানি হতো দূরদূরান্তে। রোমান সাম্রাজ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ভারতীয় মসলা ও সিল্কের যে বিশাল চাহিদা ছিল, তার একটি উল্লেখযোগ্য জোগান যেত পুণ্ড্রবর্ধনের নদী বন্দরগুলো থেকেই।
চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাংয়ের চোখে ৭ম শতকের পুণ্ড্রনগর
খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে (৬৩৯-৬৪০ খ্রিস্টাব্দ) বিখ্যাত চীনা বৌদ্ধ পণ্ডিত ও পর্যটক হিউয়েন সাং (Xuanzang) পুণ্ড্রবর্ধন ভ্রমণ করেন। তাঁর রচিত বিশ্ববিখ্যাত ভ্রমণবৃত্তান্ত সি-ইউ-কি (Si-Yu-Ki)-তে পুণ্ড্রনগরের যে প্রাণবন্ত ও বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়, তা প্রাচীন বাংলার নাগরিক জীবনের এক অমূল্য প্রতিচ্ছবি।

হিউয়েন সাং পুণ্ড্রবর্ধনকে পুন-না-ফা-তান-না (Pun-na-fa-tan-na) হিসেবে উল্লেখ করে লেখেন:
“এই দেশটির পরিধি প্রায় ৪,০০০ লি (প্রায় ৬৬০ মাইল) এবং রাজধানী পুণ্ড্রনগরের পরিধি ৩০ লি (প্রায় ৫ মাইল)। দেশটি অত্যন্ত জনবহুল এবং শস্য ও ফলে পরিপূর্ণ। এখানে ২০টিরও বেশি বৌদ্ধ মঠ ছিল, যেখানে ৩,০০০ জনেরও বেশি ভিক্ষু মহাযান ও হীনযান উভয় মতবাদ অধ্যয়ন করতেন। এখানে প্রায় ১০০টি দেবমন্দির বিদ্যমান ছিল এবং বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসের মানুষ অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করতেন। দিগম্বর নির্গ্রন্থদের (জৈন অনুসারী) সংখ্যাও ছিল অগণিত।”
হিউয়েন সাং রাজধানী পুণ্ড্রনগরের ঠিক বাইরে অবস্থিত পো-শি-পো বিহার (ভাসু বিহার)-এর বর্ণনা দেন, যেখানে সম্রাট অশোকের একটি স্মারক স্তূপ ছিল এবং বুদ্ধ স্বয়ং সেখানে তিন মাস ধর্মপ্রচার করেছিলেন বলে তৎকালীন জনশ্রুতি প্রচলিত ছিল। এই ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, সপ্তম শতকেও পুণ্ড্রনগর ছিল একটি বহুত্ববাদী, পরমতসহিষ্ণু ও উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিক পীঠস্থান।
নগর পরিকল্পনা ও দুর্গ স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন
মহাস্থানগড়ের বর্তমান প্রত্নতাত্ত্বিক খনন প্রমাণ করে যে, পুণ্ড্রনগর ছিল প্রাচীন বিশ্বের এক অনন্য সুরক্ষিত দুর্গনগরী (Citadel)। মাটির উঁচু টিলা এবং পোড়ামাটির ইটের তৈরি এক সুউচ্চ প্রাচীর দিয়ে শহরটিকে ঘিরে রাখা হয়েছিল।
নগর পরিকল্পনার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:
- আয়তাকার প্রতিরক্ষা প্রাচীর: নগরটির মূল দুর্গপ্রাকার উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১,৫২৩ মিটার দীর্ঘ এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১,৩৭১ মিটার প্রশস্ত। সমতল ভূমি থেকে এর দেওয়ালের উচ্চতা গড়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ ফুট।
- করতোয়া নদীর প্রাকৃতিক সুরক্ষা: নগরের পূর্ব পাশ দিয়ে বয়ে চলা তৎকালীন খরস্রোতা করতোয়া নদী ছিল দুর্গের প্রধান প্রাকৃতিক পরিখা ও জলপথের নিরাপত্তা ব্যুহ।
- গভীর কৃত্রিম পরিখা: উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে খনন করা হয়েছিল গভীর পরিখা, যা শত্রু আক্রমণ থেকে নগরকে সুরক্ষিত রাখত। উত্তর দিকের পরিখাটি স্থানীয়ভাবে ‘কালীদহ সাগর’ নামে পরিচিত।
- পরিকল্পিত সড়ক ও পয়ঃনিষ্কাশন: দুর্গের অভ্যন্তরে খনন করে পোড়ামাটির নর্দমা পাইপ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং রিং-ওয়েল বা পাতকুয়ার সন্ধান পাওয়া গেছে, যা উন্নত নগর জীবনের সাক্ষ্য দেয়।

ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ও প্রত্নক্ষেত্র
মহাস্থানগড় ও তার পার্শ্ববর্তী প্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে বহু শত বছরের প্রাচীন মন্দির, মঠ ও স্তূপের ধ্বংসাবশেষ। এগুলোর মধ্যে প্রধান কয়েকটি স্থাপনা নিচে আলোচিত হলো:
১. গোবিন্দ ভিটা
দুর্গপ্রাচীরের উত্তর দেওয়ালের ঠিক বাইরে এবং করতোয়া নদীর বাঁকে অবস্থিত গোবিন্দ ভিটা একটি বিশাল দ্বৈত-মন্দির কমপ্লেক্স। খননকার্যের ফলে এখানে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতক থেকে শুরু করে পাল-সেন যুগ পর্যন্ত চারটি পৃথক নির্মাণ স্তর উন্মোচিত হয়েছে। নদী ঘেঁষা এই উঁচু বেদীর ওপর নির্মিত সুদৃশ্য মন্দিরটি পুণ্ড্রনগরের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় আকর্ষণ ছিল।
২. গোকুল মেধা (বেহুলার বাসর ঘর)
পুণ্ড্রনগর দুর্গের দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গোকুল মেধা প্রাচীন বাংলার স্থাপত্যকলার এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। লোকগাথায় এটি চাঁদ সওদাগরের পুত্র লক্ষ্মীন্দর এবং বেহুলার লোহার বাসর ঘর হিসেবে প্রচলিত হলেও প্রত্নতাত্ত্বিক বিচারে এটি একটি বিশাল বহুতল ধাপযুক্ত বৌদ্ধ স্তূপ ও পরবর্তীকালের শিব মন্দির। ১৭২টি আয়তাকার অন্ধকুঠুরি (Blind Cells) ক্রমান্বয়ে ধাপে ধাপে সাজিয়ে এর সুউচ্চ ভিত্তিপ্রস্তর তৈরি করা হয়েছিল, যাতে নরম মাটিতে এত বিশাল ওজনের সৌধ অক্ষত থাকে।
৩. বৈরাগীর ভিটা ও পরশুরামের প্রাসাদ
দুর্গপ্রাচীরের অভ্যন্তরে অবস্থিত বৈরাগীর ভিটায় পাওয়া গেছে প্রাচীন মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর ও খোদাই করা পাথরের স্তম্ভ। অন্যদিকে দুর্গের উত্তর-পূর্ব অংশে অবস্থিত পরশুরামের প্রাসাদ অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে নির্মিত হলেও এটি পুণ্ড্রনগরের শেষ হিন্দু সামন্ত রাজা পরশুরামের স্মৃতি বহন করে।
৪. জিয়ত কুণ্ড (জীবন কূপ)
পরশুরামের প্রাসাদের কাছে অবস্থিত একটি বিশাল পাথরের সানবাঁধানো ঐতিহাসিক কূপ, যা স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী অলৌকিক সঞ্জীবনী শক্তি সম্পন্ন ছিল। যুদ্ধে আহত বা নিহত সৈন্যদের এই কূপের পানি দিয়ে পুনরুজ্জীবিত করা হতো বলে লোকবিশ্বাস প্রচলিত আছে।
পোড়ামাটির ফলকচিত্র ও শিল্পকলার মহিমা
পুণ্ড্রনগরের প্রত্নতাত্ত্বিক খননে আবিষ্কৃত হাজার হাজার টেরাকোটা ফলক (Terracotta Plaques) এবং সিলমোহর প্রাচীন বাংলার লোকশিল্প ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। শুঙ্গ, কুষাণ, গুপ্ত এবং পাল যুগের শিল্পরীতি এই পোড়ামাটির ফলকগুলোতে ফুটে উঠেছে।
ফলকগুলোতে দেখা যায় তৎকালীন সাধারণ মানুষের পোশাক, অলংকার, নৃত্যরত নারী, শিকারের দৃশ্য, হাতির লড়াই, পদ্মফুল, মিথুন মূর্তি এবং বৌদ্ধ জাতকের নানাবিধ গল্পগাথা। এছাড়া কড়ি, ব্রোঞ্জের ক্ষুদ্রাকার বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্ব মূর্তি, অলংকৃত মৃৎপাত্র এবং উত্তরাঞ্চলীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র (NBPW) প্রমাণ করে যে পুণ্ড্রনগর ছিল প্রাচীন প্রাচ্যের এক বিশিষ্ট শিল্প ও নকশা কেন্দ্র।
পাল-সেন যুগ থেকে মুসলিম বিজয়: পুণ্ড্রনগরের ঐতিহাসিক রূপান্তর
অষ্টম শতকে বাংলায় পাল রাজবংশের উত্থানের পর পুণ্ড্রনগর তার কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক রাজধানীর মর্যাদা কিছুটা হারিয়ে নবপ্রতিষ্ঠিত পাহাড়পুর (সোমপুর মহাবিহার) ও বিক্রমপুরের দিকে ক্ষমতা স্থানান্তরিত হতে দেখে। তবে পাল আমলেও পুণ্ড্রনগর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক দুর্গ ও আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে বহাল ছিল।
দ্বাদশ শতকে সেন রাজাদের আমলে পুণ্ড্রবর্ধন অঞ্চলের নাম ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে। ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে (১২০৪-১২০৫ খ্রিস্টাব্দ) ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির নদীয়া বিজয়ের পর বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা ঘটে। পরবর্তীতে ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগে সুফি সাধক হযরত শাহ সুলতান বলখী মাহীসওয়ার (র.) পুণ্ড্রনগরে আগমন করেন এবং ইসলাম প্রচার শুরু করেন। রাজা পরশুরামের পতনের মধ্য দিয়ে প্রাচীন পুণ্ড্রনগর তার পূর্বের হিন্দু-বৌদ্ধ নগর সত্তার অবসান ঘটিয়ে একটি ইসলামি আধ্যাত্মিক কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয় এবং কালক্রমে লোকমুখে এর নাম দাঁড়িয়ে যায় মহাস্থানগড় (মহিমান্বিত স্থান)।
প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার ও জাতীয় ঐতিহ্যের চিরন্তন মূল্য
দীর্ঘকাল বিস্মৃতির অতলে ঢাকা থাকার পর ১৮০৮ সালে ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিল্টন প্রথম এই স্থানটি জরিপ করেন। পরবর্তীতে ১৮৭৯ সালে ব্রিটিশ ভারতের প্রত্নতত্ত্বের জনক স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম মহাস্থানগড়কে হিউয়েন সাংয়ের বর্ণিত প্রাচীন পুণ্ড্রনগর হিসেবে চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করেন।
১৯২৮-২৯ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক কে. এন. দীক্ষিতের নেতৃত্বে এখানে প্রথম বড় আকারের বৈজ্ঞানিক খননকাজ পরিচালিত হয়। ১৯৯৩ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এবং ফ্রান্সের প্রত্নতত্ত্ববিদদের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ধারাবাহিক খননে এখানে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত মোট ১৮টি পৃথক সাংস্কৃতিক স্তর আবিষ্কৃত হয়েছে—যা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় নিরবচ্ছিন্ন মানববসতির এক বিরল রেকর্ড।
পুণ্ড্রনগর কেবল ইট-পাথরের প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ নয়; এটি বাঙালি জাতিসত্তার হাজার বছরের প্রারম্ভিক মেধা, উন্নত নগর পরিকল্পনা, অসাম্প্রদায়িক জ্ঞানচর্চা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এক অমর ভিত্তিপ্রস্তর। বরেন্দ্রভূমির এই পুণ্যভূমি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, হাজার বছর আগেই এই বাংলা বিশ্বসভ্যতার অগ্রযাত্রায় নিজের স্বর্ণোজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছিল।
Comments are closed.