ব্যবসায় সাংবাদিকতা: সম্পাদনা- অজয় দাশগুপ্ত ও রোবায়েত ফেরদৌস
প্রকাশকাল: একুশে বইমেলা ফেব্রুয়ারি ২০১০
মুখ্য সম্পাদনা: অজয় দাশগুপ্ত, সম্পাদনা রোবায়েত ফেরদৌস
প্রচ্ছদ: রবীন আহসান
পৃষ্ঠা বিন্যাস: বিবেকানন্দ জয়ধব
প্রকাশক: রবীন আহসান, শ্রাবণ প্রকাশনী,
১৩২ আজিজ সুপার মার্কেট- দ্বিতীয় তলা, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০।
মূল্য: ২৫০ টাকা।
কেউ ব্যবসা করতে চান, কেউ আবার সাংবাদিকতা। ব্যবসায় সাংবাদিকতাও করেন কেউ কেউ। ব্যবসা ও সাংবাদিকতার যেমন কিছু কৌশল ও নীতি আছে, তেমনই ব্যবসায় সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে কিছু কৌশল ও নীতি আছে। আর সেসব কৌশলে নানা দিক উঠে এসেছে অজয় দাশগুপ্ত ও রোবায়েত ফেরদৌসে সম্পাদিত ব্যবসায় সাংবাদিকতা শীর্ষক গ্রন্থে। গ্রন্থটিতে ব্যবসায় সাংবাদিকতার মৌলিক ধারণা দেয়া হয়েছে। ব্যবসা সংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরির পদ্ধতি, কলাকৌশল সম্পর্কেও পর্যাপ্ত ধারণা দেয়া হয়েছে। ব্যবসায় সংক্রান্ত সাংবাদিকতা কীভাবে সৃষ্টি হলো আর কীভাবেই বা জনপ্রিয় হলো- তার ইতিহাসও গ্রন্থটিতে তুলে ধরা হয়েছে। ব্যবসায় সাংবাদিকতা গ্রন্থটির ২৬ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘১৮৮২ সালে চার্লস ডাও, এডওয়ার্ড জোনস ও চার্লস বার্গস্ট্রেসের এক ধরনের ওয়ার সার্ভিস চালু করেন যার সাহায্যে ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগ হাউসগুলো সংবাদ পেতে শুরু করে। এর একশ’ বছরেরও বেশি সময় পর শেয়ার বাজারে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ বাড়তে থাকায় গণমাধ্যমে ব্যবসায় সাংবাদিকতা প্রাধান্য লাভ করতে থাকে’ (প্রথম অধ্যায়, ব্যবসায় সাংবাদিকতার ধরন ও কৌশল)।
ব্যবসায় সাংবাদিকতা শুরু হয়েছিল কীভাবে? তার জবাব দেয়া হয়েছে ব্যবসায় সাংবাদিকতা গ্রন্থটিতেই। বলা হয়েছে, ‘পণ্যের মূল্য সংক্রান্ত খবর প্রকাশ শুরু হয় অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম ব্যবসায় পত্রিকা বাজারে আসে ১৭৯৩ সালে। ১৮৪৯ সালে জুলিয়াস রয়টার্স ইউরোপে বিজনেস সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করেন। যুক্তরাষ্ট্রে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের আত্মপ্রকাশ ১৮৮৯ সালে। অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে বিকশিত হয়েছে মিডিয়া। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ বাড়তে থাকায় উন্নত-অনুন্নত সব দেশের গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য প্রচারে আগ্রহ লক্ষণীয়। টেলিভিশনে লেনদেনের দৃশ্য সরাসরিই প্রচার করা হচ্ছে। বাংলাদেশও যুক্ত হয়েছে এ ধারায়’ (প্রথম অধ্যায়, ব্যবসায় সাংবাদিকতার ধরন ও কৌশল)।
… কতগুলো মোটাদাগে ভাগ করে সংবাদক্ষেত্র বা সংবাদ উৎস চিহ্নিত করা যায়: ১. মার্কেট বা বাজার, ২. কৃষি, ৩. ব্যবসায়, ৪. অর্থায়ন, ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক অবস্থা, ৫. শিল্প ও শিল্পায়ন, ৬. পরিবহন ব্যবস্থা, ৭. শ্রম, শ্রমিক ও শ্রমবাজার, ৮ সরকারের পলিসি (নীতিমালা), ৯. রিয়েল এস্টেট, ১০. দুর্নীতি, ১১. ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, ১২. আন্তর্জাতিক।
ব্যবসায় সাংবাদিকতার উৎপত্তি ও ইতিহাস যুক্তরাষ্ট্রে অষ্টাদশ শতাব্দিতে। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য কিংবা পণ্যের মূল্য সংক্রান্ত খবরাখবর, দূরদূরান্তের বাণিজ্যের খবর সবকিছু যখন পাঠকের প্রয়োজন হয়েছে, তখনই ব্যবসায় সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা হয়েছে। বিশেষ করে কোন পণ্যের কেমন দাম কিংবা বাজারে পণ্যের স্বল্পমূল্য সংক্রান্ত খবরাখবর মধ্যবিত্ত ক্রেতার যেমন আরাধ্য, তেমনই বিনিয়োগ বা লাভবান হওয়ার জন্য ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিরও কাঙ্ক্ষিত বিষয়। শুল্ক কিংবা আমদানি নীতি সংক্রান্ত বিষয়েও শিল্পপতিরা কম আগ্রহ রাখেন না।
ব্যবসায় সাংবাদিকতা গ্রন্থটির একটি বৈশিষ্ট্য হলো এই গ্রন্থে ব্যবসায় সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা যেমন তুলে ধরা হয়েছে, তেমনই ব্যবসায় সংক্রান্ত প্রতিবেদন কীভাবে লিখতে হবে, তাও উল্লেখ করা হয়ছে। গ্রন্থটির দ্বিতীয় অংশে আছে প্রতিবেদন মূল্যায়ন। ওই অংশে বিভিন্ন প্রতিবেদন সম্পর্কে মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া গ্রন্থটিতে ব্যবসায় সাংবাদিকতার ধরন ও প্রকরণ উল্লেখ করা হয়েছে। ৪৬ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, … কতগুলো মোটাদাগে ভাগ করে সংবাদক্ষেত্র বা সংবাদ উৎস চিহ্নিত করা যায়: ১. মার্কেট বা বাজার, ২. কৃষি, ৩. ব্যবসায়, ৪. অর্থায়ন, ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক অবস্থা, ৫. শিল্প ও শিল্পায়ন, ৬. পরিবহন ব্যবস্থা, ৭. শ্রম, শ্রমিক ও শ্রমবাজার, ৮ সরকারের পলিসি (নীতিমালা), ৯. রিয়েল এস্টেট, ১০. দুর্নীতি, ১১. ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, ১২. আন্তর্জাতিক। পেশাদার সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ করে ব্যবসা বা বিজনেস বিটে যারা সাংবাদিকতা করেন, তাদের জন্য বিশেষ কিছু টিপস দেয়া হয়েছে। টিপসগুলো হলো:
১. জারগন বা বিশিষ্টার্থক শব্দে পূর্ণ ভাষা ব্যবহার থেকে দূরে থাকা বা পরিহার করা;
২. টেকনিক্যাল টার্মের সংজ্ঞার্থ নির্ণয় করা;
৩. সংবাদ সম্মেলনে নির্বোধের মতো প্রশ্ন না করা;
৪. সংখ্যা নিয়ে অনুভূতিশূন্য না হওয়া;
৫. সংখ্যা সর্বদাই নিরপেক্ষ;
৬. সংখ্যাকে লেখার বিষয়বস্তুর মধ্যে নিয়ে আসা;
৭. বলার চেয়ে দেখানো উত্তম;
৮. তথ্য-পরিসংখ্যানের পেছনে যারা রয়েছে তাদের খুঁজে বের করা;
৯. মানবিক বিষয় তুলে ধরা;
১০. এটা কোনোভাবেই ভুললে চলবে না যে সব কিছুর পরেও বিজনেস জার্নালিজম সাংবাদিকতারই অংশ।
সম্পাদক পরিচিতি: ব্যবসায় সাংবাদিকতা গ্রন্থটি অজয় দাশগুপ্ত ও রোবায়েত ফেরদৌস সম্পাদনা করেছেন। গ্রন্থটির প্রথম ব্ল্যার্বে অজয় দাশগুপ্ত সম্পর্কে বলা হয়েছে, আর শেষ ব্ল্যার্বে রোবায়েত ফেরদৌস। অজয় দাশগুপ্ত রসায়নে মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে বেছে নিয়েছেন। অর্থনীতি হলো তার আরাধ্য বিষয়। একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা এই সাংবাদিক ছাত্রজীবন থেকে জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ‘জয়ধ্বনি’ সম্পাদনা করেছেন। বিভিন্ন সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা অভিজ্ঞতার ঝুলি কাঁধে নিয়ে ২০০৫ সালে সমকাল সম্পাদকীয় বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। একাধিক বই লিখেছেন তিনি। তার মধ্যে অন্যতম: সংবাদপত্রে হরতালচিত্র: ১৯৪৭-২০০০, বাংলাদেশে ব্যাংকিংয়ের তিন দশক, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: প্রতিবাদের প্রথম বছর, সাম্রাজ্যবাদের শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, একাত্তরের যাত্রী, একাত্তরের ৭১, অর্থনীতি: সংবাদ ও সাংবাদিকতা প্রভৃতি।
ব্যবসায় সাংবাদিকতা গ্রন্থটির অপর সম্পাদক রোবায়েত ফেরদৌস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক। ১৯৯৭ সাল থেকে প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং এখন অধ্যাপনা করছেন। এই শিক্ষক সাংবাদিকতাও করেছেন। খবরের কাগজ দিয়ে সাংবাদিকতার অনুশীলন করেন। রোবায়েত ফেরদৌসের গ্রন্থের সংখ্যা সাতটি: গণমাধ্যম/শ্রেণিমাধ্যম, তথ্যের অধিকার, তসলিমার ‘ক’: পাণ্ডুলিপি পোড়ে না, নির্বাচন ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বাংলাদেশের সংবাদপত্রে জেন্ডার সংবেদনশীলতা, তথ্য অধিকারের স্বরূপ সন্ধানে, বিশেষ জনের বিশেষ সাক্ষাৎকার। এছাড়া সংবাদপত্রে নিয়মিত লেখালেখি এবং বিভিন্ন টেলিভিশনে উপস্থাপক ও অতিথি হিসেবেও কথা বলেছেন মানবাধিকার আন্দোলনের অ্যাক্টিভিস্ট রোবায়েত ফেরদৌস।
কেন পড়বেন গ্রন্থটি: গ্রন্থটিতে ব্যবসা সাংবাদিকতা সংক্রান্ত কলাকৌশল, প্রতিবেদন তৈরির নিয়ম এবং টিপস দেয়া হয়েছে। এসব টিপস অবলম্বন করে সাংবাদিকতা করলে প্রভূত উন্নতি করা সম্ভব। ব্যবসায় সাংবাদিকতা গ্রন্থটি ব্যবসা বা বিজনেস বিটের সাংবাদিকদের বিশেষভাবে পাঠে উৎসাহিত করছি।
Comments are closed.