৮৪, চারিং ক্রস রোড (84, Charing Cross Road) হলো আমেরিকান নাট্যকার ও লেখিকা হেলেন হ্যানফ (Helene Hanff)-এর লেখা বিশ্বখ্যাত এক অবিস্মরণীয় স্মৃতিচারণমূলক পত্রোপন্যাস বা আত্মজীবনীমূলক ক্লাসিক। ১৯৪৯ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ বিশ বছর ধরে নিউ ইয়র্কের নিঃসঙ্গ সাহিত্যপ্রেমী লেখিকা হেলেন এবং লন্ডনের ৮৪ চারিং ক্রস রোডের অ্যান্টিকোয়ারিয়ান বইয়ের দোকান ‘মার্কস অ্যান্ড কোং’ (Marks & Co.)-এর প্রধান বুক-বায়ার ফ্রাঙ্ক ডোয়েল (Frank Doel) ও তাঁর সহকর্মীদের মধ্যকার নিয়মিত চিঠিপত্র বিনিময়ের বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে এই অমর গ্রন্থটি রচিত। প্রিমিয়াম পাবলিকেশন থেকে আরমান কবির-এর প্রাঞ্জল অনুবাদে প্রকাশিত এই বইটি শুধু দুষ্প্রাপ্য বই সংগ্রহের গল্প নয়, বরং আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পারের অচেনা মানুষদের নিখাদ মানবিক মায়া, আন্তরিক বন্ধুত্ব ও নির্ভেজাল বইপ্রেমের এক অনন্য ঐতিহাসিক দলিল।
এক নজরে বইয়ের তথ্য ও সারসংক্ষেপ
| মূল বইয়ের নাম | 84, Charing Cross Road |
| বাংলা অনুবাদ | ৮৪, চারিং ক্রস রোড |
| মূল রচয়িতা | হেলেন হ্যানফ (Helene Hanff) |
| অনুবাদক | আরমান কবির |
| প্রকাশনী | প্রিমিয়াম পাবলিকেশন (Premium Publications) |
| মূল প্রকাশকাল | ১৯৭০ (আমেরিকা ও যুক্তরাজ্য) |
| সাহিত্যের ধারা | পত্রোপন্যাস / স্মৃতিচারণ / আত্মজীবনী (Epistolary Memoir) |
| ঘটনাস্থল ও সময়কাল | ম্যানহাটন, নিউ ইয়র্ক ও লন্ডন, ১৯৪৯–১৯৬৯ |
| অনলাইন পরিবেশক | রকমারি ডট কম (Rokomari) |
সূচনা: দুই মহাদেশের দূরত্ব ছাপিয়ে এক অলৌকিক চিঠির মেলবন্ধন
পৃথিবীতে কত হাজারো ধরনের প্রেমের গল্প লেখা হয়েছে, কত বিচ্ছেদের হাহাকার সাহিত্যের পাতায় কালজয়ী রূপ পেয়েছে! কিন্তু এমন কোনো সম্পর্কের কথা কি আপনি কল্পনা করতে পারেন—যেখানে ভালোবাসার ভিত্তি ছিল শুধুই ধুলোবালিমাখা পুরনো বইয়ের সুবাস, যেখানে প্রধান চরিত্র দুজন কখনো মুখোমুখি হননি, যাদের মধ্যে কখনো কোনো প্রণয়মূলক প্রণোদনা ছিল না, অথচ তাঁদের আত্মিক টানটি ছিল অতলস্পর্শী? ঠিক এমনই এক অদ্ভুত, অকৃত্রিম ও চিরভাস্বর সম্পর্কের জীবন্ত দলিল হলো ৮৪, চারিং ক্রস রোড।
বইটি শুরু হয় ১৯৪৯ সালের অক্টোবরের এক মেঘলা দিনে। স্থান আটলান্টিক মহাসাগরের পশ্চিম তীরের কর্মব্যস্ত শহর নিউ ইয়র্ক। পেশায় টেলিভিশনের নাটক ও চিত্রনাট্য ঘষামাজার কাজ করা চরম অর্থকষ্টে থাকা এক স্বাধীনচেতা তরুণী হেলেন হ্যানফ তাঁর ছোট্ট ভাড়াবাড়িতে বসে ছিলেন। চরম সাহিত্যপিপাসু হেলেনের নেশা ছিল ক্লাসিক্যাল ইংরেজি সাহিত্য পড়া। কিন্তু আমেরিকার চটকদার বইয়ের দোকানগুলোতে যেসব আধুনিক ও দামি সংস্করণ পাওয়া যেত, সেগুলোর আকাশচুম্বী দাম যেমন তাঁর সাধ্যের বাইরে ছিল, তেমনই সেগুলোর আড়ম্বর তাঁর রুচির সাথে মিলত না। হেলেন চাইতেন চমৎকার বাঁধাইয়ের সেকেন্ডহ্যান্ড ভিন্টেজ বই—যেগুলোর প্রতিটি পৃষ্ঠা বহু পাঠকের হাতের স্পর্শ পেয়ে মখমলের মতো মোলায়েম হয়েছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে স্যাটারডে রিভিউ অব লিটারেচার সাময়িকীতে একটি ছোট বিজ্ঞাপন তাঁর চোখে পড়ে। লন্ডনের ৮৪ চারিং ক্রস রোডের এক প্রাচীন অ্যান্টিকোয়ারিয়ান বইয়ের দোকান Marks & Co.—যাঁরা পুরনো ও দুষ্প্রাপ্য বই সংগ্রহ করে পাঠকদের কাছে ডাকযোগে পৌঁছে দেওয়ার দাবি করছিল। নিছক কৌতূহল ও বইয়ের তালিকায় কিছু বিরল ইংরেজি প্রবন্ধের নাম লিখে হেলেন হ্যানফ তাঁর প্রথম চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন। তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি, সেই সামান্য একটি ইনকোয়ারি লেটার কীভাবে তাঁর জীবনের পরবর্তী কুড়িটি বছরকে এক পরম মায়ার সুতোয় বেঁধে দেবে!
হেলেন হ্যানফের আত্মকথন ও নিউ ইয়র্কের নিঃসঙ্গ দিনলিপি
হেলেন হ্যানফের ব্যক্তিত্বটি ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত, ঠোঁটকাটা, তীক্ষ্ণ রসিক এবং একই সাথে অসম্ভব সংবেদনশীল। চরম দারিদ্র্য সত্ত্বেও সাহিত্যের প্রশ্নে তিনি ছিলেন চরম একরোখা। তাঁর কাছে বই কেনা মানে ঘরের সাজসজ্জা বাড়ানো ছিল না, বরং বই ছিল তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো অপরিহার্য সঙ্গী। তিনি চিঠিতে অকপটে লিখতেন:
“আমি এমন বই পছন্দ করি যা আগে কেউ পড়ে স্পর্শ করে গেছে। যখন আমি একটি পুরনো বই খুলি এবং দেখতে পাই কোনো এক পূর্ববর্তী পাঠক কোনো বিশেষ লাইনের নিচে পেন্সিল দিয়ে দাগ দিয়ে রেখেছেন বা মার্জিনে কিছু মন্তব্য লিখেছেন, তখন আমার মনে হয় শতাব্দীর ব্যবধান মুছে দিয়ে আমি সেই অচেনা সহযাত্রীর মনের সাথে কথা বলছি।”
নিউ ইয়র্কে হেলেনের জীবন ছিল একাকী। তিনি বিয়ে করেননি, ছিলেন প্রচণ্ড আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। তাঁর চিঠির ভাষা ছিল নাটকীয়, তীব্র কৌতুকপূর্ণ ও সরাসরি আমেরিকান ঘরানার। কোনো বই পছন্দ না হলে তিনি সোজাসাপটা ধমক দিয়ে লিখতেন, আবার কোনো কাঙ্ক্ষিত বই পেলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে শিশুদের মতো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। তাঁর এই উচ্ছল স্বভাবই লন্ডনের চিরাচরিত ঠান্ডা মেজাজের ব্রিটিশ বুকসেলারদের মন জয় করে নিয়েছিল।
৮৪ চারিং ক্রস রোড ও ‘মার্কস অ্যান্ড কোং’-এর জাদুকরী জগৎ
লন্ডনের ‘চারিং ক্রস রোড’ কেবল একটি সাধারণ সড়ক নয়; বিশ্বজুড়ে বইপ্রেমীদের কাছে এটি এক তীর্থক্ষেত্র। ভিক্টোরিয়ান যুগ থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত এই রাস্তাটি ছিল শত শত প্রাচীন বইয়ের দোকানের প্রাণকেন্দ্র। ধুলোমাখা তাক, চামড়ার বাঁধাই করা বইয়ের গন্ধ এবং কাঠের মেঝেতে মৃদু পায়ের আওয়াজ—এই ছিল ৮৪ চারিং ক্রস রোডের ‘মার্কস অ্যান্ড কোং’ দোকানের চিরচেনা আবহ।
দোকানটির মূল কর্ণধার ছিলেন বেঞ্জামিন মার্কস ও মার্ক কোহেন, তবে দোকানের দৈনন্দিন ব্যবসা ও পুরনো বই সংগ্রহের মূল কাণ্ডারি ছিলেন প্রধান বায়ার ফ্রাঙ্ক ডোয়েল (Frank Doel)। ফ্রাঙ্ক ছিলেন নিখাদ একজন রক্ষণশীল ব্রিটিশ জেন্টলম্যান। প্রথমদিকে হেলেন হ্যানফের উদ্দাম ও রসাত্মক চিঠির জবাবে ফ্রাঙ্ক লিখতেন অত্যন্ত রাশভারী, আনুষ্ঠানিক ব্যবসায়িক ভাষায়—“Dear Madam, In response to your inquiry…”। কিন্তু হেলেনের অনাবিল আন্তরিকতা এবং অকৃত্রিম রসিকতার কাছে সেই ব্রিটিশ আভিজাত্যের বরফ গলতে বেশি সময় লাগেনি। অল্পদিনের মধ্যেই ফ্রাঙ্কের চিঠির সম্ভাষণ বদলে গিয়ে দাঁড়ায় “Dear Helene”-এ।
ফ্রাঙ্ক ডোয়েল ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি সারা ইংল্যান্ডের আনাচে-কানাচে ঘুরে ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ও নিলামঘর থেকে খাঁটি মুক্তোর মতো দুর্লভ বই খুঁজে বের করতেন। হেলেনের বিচিত্র সব বায়না—কখনো ১৬১১ সালের জেমস ষষ্ঠ সংস্করণের কোনো খণ্ড, কখনো উইলিয়াম হ্যাজলিটের প্রবন্ধ সমগ্র, আবার কখনো বা আইজ্যাক ওয়ালটনের জীবনচরিত—ফ্রাঙ্ক দিনের পর দিন ধৈর্য ধরে খুঁজে এনে অতি স্বল্পমূল্যে হেলেনের জন্য ডাকবাক্সে তুলে দিতেন।
যুদ্ধোত্তর ব্রিটেনের সংকট ও এক বাক্স ভালোবাসার খাদ্য-পার্সেল
এই বইটির সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দিক হলো এর ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলেও ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে এবং ১৯৫০-এর শুরুর দিকে যুক্তরাজ্যে মারাত্মক অর্থনৈতিক মন্দা ও তীব্র খাদ্যসংকট চলছিল। সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য মাংস, ডিম, শুকনো ফল, চিনি ইত্যাদির ওপর কড়া সরকারি রেশন ব্যবস্থা জারি ছিল। মাসের পর মাস একটি পরিবারের কপালে এক টুকরো ভালো মাংস বা আসল মাখন জুটত না।
লন্ডন থেকে ফ্রাঙ্কের চিঠির পরতে পরতে এই অভাবের ইঙ্গিত পেতেই হেলেনের কোমল হৃদয় কেঁদে ওঠে। তিনি বুঝলেন, যে মানুষগুলো তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক খোরাক জোগাতে দিনরাত পরিশ্রম করছেন, তাঁদের পেট ভরে খাওয়ার মতো পর্যাপ্ত আহার নেই! হেলেন তখন চরম আর্থিক অনটনে থেকেও নিউ ইয়র্কের খাদ্য সরবরাহকারী সংস্থার মাধ্যমে প্রতি ক্রিসমাসে ও বিশেষ অনুষ্ঠানে ৮৪ চারিং ক্রস রোডের ঠিকানায় পাঠাতে লাগলেন উপহার সামগ্রীর বিশেষ বাক্স। তাতে থাকত আসল ব্রিটিশ চর্বিহীন হ্যাম, শুকনো ডিমের গুঁড়ো, তাজা ক্যানভর্তি ফল, কফি ও খাঁটি আইরিশ মাখন।
এই খাদ্য-পার্সেলগুলো দোকানের কর্মচারীদের জীবনে যেন ঈশ্বরের আশীর্বাদ হয়ে এল। ফ্রাঙ্ক ডোয়েল, তাঁর স্ত্রী নোরা ডোয়েল, এবং দোকানের অন্যান্য নারী কর্মী—সিসিলি ফার (Cecily Farr) ও মেগান ওয়েলস (Megan Wells)—সবাই হেলেনের কাছে কৃতজ্ঞতায় অবনত হয়ে ব্যক্তিগতভাবে আলাদা চিঠি লিখতে শুরু করেন। বই কেনার একটি গতানুগতিক ব্যবসায়িক লেনদেন মুহূর্তের মধ্যে রূপ নিল এক অচ্ছেদ্য আন্তর্জাতিক পারিবারিক বন্ধনে। একজন নিঃস্ব আমেরিকান নারীর মমতার হাত পৌঁছে গেল আটলান্টিকের ওপারে এক ক্ষুধার্ত ব্রিটিশ বুকস্টোরের অন্তরে।
হেলেনের অনবদ্য চিঠি ও সাহিত্যিক রুচির বহিঃপ্রকাশ
৮৪, চারিং ক্রস রোড পাঠের আনন্দ মূলত এর অপূর্ব ভাষারীতি ও সংলাপের ভেতর নিহিত। হেলেন চিঠিতে কখনও ফ্রাঙ্ককে শাসাতেন এই বলে যে, তিনি যদি ল্যাটিন অনুবাদগ্রন্থের বদলে আধুনিক ফরাসি গদ্য পাঠান, তবে তিনি আর কোনোদিন চিঠি লিখবেন না! তিনি লিখতেন:
“ফ্রাঙ্ক, তুমি আমাকে স্যামুয়েল পেপিসের যে ডায়েরিটা পাঠিয়েছ, তার চামড়ার কভারটা এত নরম আর প্রাচীন যে আমি সারা রাত ওটা গালে ছুঁইয়ে বসে ছিলাম! তোমরা ব্রিটিশরা কী দিয়ে বই বাঁধাই করতে যে চারশো বছর পরেও সেগুলো এত তরতাজা থাকে?”
চিঠিপত্রের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর চিরায়ত সাহিত্যের প্রতি হেলেনের গভীর শ্রদ্ধা। তিনি ভালোবাসতেন জন ডান (John Donne)-এর কবিতা, স্যার আর্থার কুইলার-কাউচের সাহিত্য সমালোচনা এবং স্যামুয়েল জনসনের ধ্রুপদী অভিধান। হেলেনের কাছে বই কোনো প্রদর্শনীর বস্তু ছিল না; বই ছিল জীবনের সেরা কথোপকথন। ধ্রুপদী সাহিত্যের এই ভালোবাসা ঠিক যেমন আমরা দেখতে পাই হেনরি জেমসের মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান দ্য টার্ন অব দ্য স্ক্রু কিংবা আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সমুদ্রজয়ের অমর সৃষ্টি দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি উপন্যাসের গূঢ় দার্শনিক বোধের মাঝে—হেলেনের চিঠির পাতায় পাতায় সেই একই ধ্রুপদী সাহিত্যের প্রতি নিরঙ্কুশ নিষ্ঠা প্রতিফলিত হয়েছে।
না-দেখা সম্পর্কের বিয়োগান্তক সমাপ্তি ও এক অপূর্ণ সাক্ষাৎ
বিশটি বছর চোখের পলকে কেটে যায়। বছরের পর বছর ফ্রাঙ্ক ডোয়েল এবং তাঁর স্ত্রী নোরা হেলেনকে নিমন্ত্রণ জানিয়ে এসেছেন লন্ডনে তাঁদের বাড়িতে বেড়াতে আসার জন্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, হেলেনের আর্থিক অবস্থা কখনোই এত ভালো ছিল না যে তিনি আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ইংল্যান্ড ভ্রমণের বিপুল বিমান ভাড়া জোগাড় করতে পারবেন। কখনও দাঁতের চিকিৎসার খরচ, কখনও বা বাড়িভাড়ার দেনা শোধ করতে গিয়ে তাঁর জমানো সামান্য অর্থ ফুরিয়ে যেত।
অবশেষে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে এক মর্মান্তিক চিঠি নিউ ইয়র্কে পৌঁছায়। চিঠিটি লিখেছিলেন ফ্রাঙ্ক ডোয়েলের শোকগ্রস্ত স্ত্রী নোরা ডোয়েল। তিনি হেলেনকে জানান, দীর্ঘদিনের বুক-হান্টার ও তাঁর আজীবনের অদৃশ্য বন্ধু ফ্রাঙ্ক ডোয়েল অ্যাপেন্ডিক্স ফেটে যাওয়ার কারণে মাত্র ৬৩ বছর বয়সে হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেছেন।
সংবাদটি হেলেনকে নিদারুণভাবে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। যে মানুষটির সাথে বিশ বছর ধরে তিনি মনের সব কথা ভাগ করে নিয়েছেন, যাঁর হাতের লেখায় লেখা ঠিকানায় তিনি প্রতি মাসে চিঠি পাঠাতেন, তাঁর সাথে হেলেনের রক্তমাংসের শরীরে আর কখনো দেখা হলো না। এর কিছুদিন পরেই ৮৪ চারিং ক্রস রোডের দোকানটিও বন্ধ হয়ে যায়। অবশেষে ১৯৭১ সালে যখন হেলেনের এই চিঠিপত্রের সংকলনটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়ে বিশ্বজোড়া খ্যাতি লাভ করে, তখন হেলেন প্রথমবারের মতো লন্ডনে যাওয়ার টিকিট কাটেন। কিন্তু ততদিনে ৮৪ চারিং ক্রস রোডের সেই জাদুকরী দোকানটি ভেঙে ফেলে খালি করে দেওয়া হয়েছে। ধুলোমাখা শূন্য মেঝেতে দাঁড়িয়ে হেলেন কেবল অনুভব করতে পেরেছিলেন ফ্রাঙ্ক আর পুরনো বইগুলোর অতৃপ্ত দীর্ঘশ্বাস। হেলেন তাঁর বইয়ের শেষ পংক্তিতে লিখেছিলেন সেই কালজয়ী আকুতি:
“তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কখনো লন্ডনের চ্যারিং ক্রস রোডের পাশ দিয়ে হেঁটে যাও, তবে দয়া করে ৮৪ নম্বরের দিকে একটু তাকিও এবং আমার পক্ষ থেকে সেখানে একটি মৃদু চুম্বন এঁকে দিও। কারণ আমি ওই দোকানটির কাছে আজীবন ঋণী ছিলাম।”
তুলনামূলক বিশ্লেষণ সারণী: বিশ্বসাহিত্যের বিখ্যাত পত্রোপন্যাস ও বইপ্রেমের ক্লাসিক
বিশ্বসাহিত্যে বইপ্রেম এবং চিঠিপত্রের মেলবন্ধন নিয়ে বেশ কিছু অনন্য মাস্টারপিস রচিত হয়েছে। নিচের সারণীতে ৮৪, চারিং ক্রস রোড-এর সাথে সমগোত্রীয় অন্যান্য ক্লাসিকের তুলনামূলক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো:
| বইয়ের নাম | লেখক | সাহিত্যের ধারা | মূল থিম ও আবহ | বিশেষ আবেদন |
|---|---|---|---|---|
| ৮৪, চারিং ক্রস রোড | হেলেন হ্যানফ | আত্মজীবনীমূলক পত্রোপন্যাস | আটলান্টিকপারের বন্ধুত্ব ও বইপ্রেম | বাস্তব চিঠি, নিখাদ মমতা ও অপূর্ণ দেখা |
| দ্য গার্নসি লিটারারি সোসাইটি | মেরি অ্যান শ্যাফার | ঐতিহাসিক পত্রোপন্যাস | দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাৎসি দখলদারিত্ব ও বই | যুদ্ধপীড়িত দ্বীপের পাঠকদের একতাবোধ |
| দ্য শ্যাডো অব দ্য উইন্ড | কার্লোস রুইস সাফন | গথিক মিস্ট্রি থ্রিলার | বিস্মৃত বইয়ের কবরস্থান ও বার্সেলোনা | বই রক্ষার লড়াই ও রহস্যময় ট্র্যাজেডি |
| ড্রাকুলা ভার্সেস শার্লক হোমস | অনূদিত সংকলন | ভিক্টোরিয়ান মিস্ট্রি ও ক্লাসিক | লন্ডনের কুয়াশাচ্ছন্ন রহস্য ও গোয়েন্দাগিরি | লন্ডন শহরের প্রাচীন ইতিহাসের রোমাঞ্চ (রিভিউ পড়ুন) |
প্রিমিয়াম পাবলিকেশন ও আরমান কবিরের অনুবাদ মূল্যায়ন
একটি পত্রোপন্যাস অনুবাদ করা সাধারণ আখ্যানমূলক উপন্যাস অনুবাদের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও সংবেদনশীল। কারণ এখানে চিঠির প্রেরকের মেজাজ, তাঁর ব্যবহৃত পরিহাস ও সূক্ষ্ম কৌতুকবোধের প্রতি পূর্ণ সুবিচার করতে হয়। হেলেন হ্যানফের ভাষার মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত গতি, খামখেয়ালিপনা এবং অকপট সারল্য ছিল। অন্যদিকে ফ্রাঙ্ক ডোয়েলের চিঠির ভাষা ছিল প্রথাগত, বিনম্র ও সংযত।
আরমান কবির তাঁর বাংলা অনুবাদে এই দুই মেরুর ভাষাগত ভারসাম্য চমৎকারভাবে বজায় রেখেছেন। হেলেনের ক্ষুরধার আমেরিকান উইট এবং ফ্রাঙ্কের শান্ত রাশভারী ব্রিটিশ ভদ্রতাবোধ—দুটিই বাংলা ভাষায় জীবন্ত হয়ে ধরা দেয়। প্রিমিয়াম পাবলিকেশন বইটির প্রচ্ছদ ও মুদ্রণে যে আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে, তা যেকোনো সাধারণ পাঠককে মুগ্ধ করবে। পাতার বিন্যাস, ফন্টের স্পষ্টতা এবং মূল চিঠির তারিখ অনুযায়ী সজ্জিত অধ্যায়গুলো পড়তে গিয়ে মনে হয় যেন পাঠক নিজেই কোনো ব্যক্তিগত ড্রয়ার খুলে বহু যুগের পুরনো হলদেটে চিঠিপত্রগুলো স্পর্শ করছেন।
কেন প্রতিটি বইপ্রেমীর জীবনে এই বইটি পড়া অবশ্য কর্তব্য?
আজকের ডিজিটাল যুগে আমরা যখন চোখের পলকে ইমেইল, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারি, তখন ডাকযোগে পাঠানো কাগজের চিঠির গুরুত্ব হয়তো অনেকেই ভুলে গেছেন। কিন্তু একটি চিঠির জন্য অধীর আগ্রহে কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করার যে ব্যাকুলতা, চিঠির খামে লাগানো ডাকটিকিটের যে ইতিহাস, আর হাতে লেখা অক্ষরের ভেতরে যে স্পন্দন লুকিয়ে থাকে—তা কখনো কৃত্রিম প্রযুক্তির মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব নয়।
৮৪, চারিং ক্রস রোড আমাদের মনে করিয়ে দেয়:
- নিঃস্বার্থ সম্পর্কের মহিমা: শারীরিক উপস্থিতি কিংবা রক্তের সম্পর্ক ছাড়াও সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে মানুষের মাঝে আজীবনের নিঃস্বার্থ বন্ধন গড়ে তোলা সম্ভব।
- যুদ্ধের বিপরীতে মানবতার জয়গান: রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক সীমানা যখন মানুষকে বিভক্ত করে, তখন এক টুকরো ভালোবাসা ও উপহারের বাক্স দুই দেশের সাধারণ মানুষের মনকে একসূত্রে বেঁধে ফেলে।
- শারীরিক বইয়ের স্পর্শ ও সৌরভ: কিন্ডল বা পিডিএফ ফাইলের যুগে চামড়ার বাঁধাই আর পুরনো কাগজের গন্ধের যে আলাদা একটি আত্মা থাকে, তা বইপ্রেমীদের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. ‘৮৪, চারিং ক্রস রোড’ কি একটি বাস্তব ঘটনার ওপর রচিত বই?
হ্যাঁ, এটি সম্পূর্ণ বাস্তব ঘটনা। ১৯৪৯ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২০ বছর ধরে নিউ ইয়র্কের নাট্যকার হেলেন হ্যানফ এবং লন্ডনের মার্কস অ্যান্ড কোং বইয়ের দোকানের ফ্রাঙ্ক ডোয়েলের মধ্যে আদান-প্রদান করা প্রকৃত চিঠিপত্র নিয়েই বইটি সংকলিত হয়েছে।
২. ফ্রাঙ্ক ডোয়েল এবং হেলেন হ্যানফের মধ্যে কি কখনো দেখা হয়েছিল?
না, তাঁদের দুজনের কখনো সামনাসামনি দেখা হয়নি। ১৯৬৯ সালে ফ্রাঙ্ক ডোয়েল আকস্মিক মৃত্যুবরণ করার আগে হেলেন আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে লন্ডনে যেতে পারেননি। ফ্রাঙ্কের মৃত্যুর পর হেলেন যখন লন্ডনে পৌঁছান, ততদিনে ৮৪ চারিং ক্রস রোডের দোকানটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
৩. এই বইটির ওপর ভিত্তি করে কি কোনো চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে?
হ্যাঁ, ১৯৮৭ সালে এই অমর আত্মজীবনীর ওপর ভিত্তি করে একই নামে একটি প্রশংসিত ব্রিটিশ-আমেরিকান চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। এতে হেলেন হ্যানফের চরিত্রে অ্যান ব্যানক্রফ্ট এবং ফ্রাঙ্ক ডোয়েলের চরিত্রে বিশ্বখ্যাত অভিনেতা অ্যান্থনি হপকিন্স অনবদ্য অভিনয় করেছিলেন।
৪. বইটি কাদের পড়া উচিত?
যাঁরা বই ভালোবাসেন, পুরনো বইয়ের গন্ধ ও বাঁধাইয়ের প্রেমে পড়েন, ডাকঘরের চিঠি ও চিঠির স্মৃতিচারণ পছন্দ করেন এবং যুদ্ধোত্তর ইতিহাসের বাস্তব মানবিক বন্ধন অনুভব করতে চান—তাঁদের প্রত্যেকের জন্য এই বইটি পড়া অবশ্য কর্তব্য।
৫. বাংলা অনুবাদে বইটি কোথা থেকে সহজে সংগ্রহ করা যাবে?
প্রিমিয়াম পাবলিকেশন প্রকাশিত এবং আরমান কবিরের প্রাঞ্জল অনুবাদে ‘৮৪, চারিং ক্রস রোড’ বইটি রকমারি ডট কমের অনলাইন শপ থেকে আকর্ষণীয় ছাড় ও ক্যাশ অন ডেলিভারি সুবিধায় খুব সহজেই সংগ্রহ করা যায়।
Comments are closed.