১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল, শনিবার। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্গত ইউক্রেনের চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের (Chernobyl Nuclear Power Plant) ৪ নম্বর চুল্লিতে ঘটে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ পারমাণবিক বিপর্যয়। বিস্ফোরণের বিকট শব্দে উড়িয়ে নিয়ে যায় চুল্লির এক হাজার টন ওজনের কংক্রিটের ছাদ। বাতাসে মুক্ত হয় হিরোশিমায় নিক্ষিপ্ত পারমাণবিক বোমার চেয়েও প্রায় চারশত গুণ বেশি তেজস্ক্রিয় বিষবাষ্প। চুল্লির গলিত কোর থেকে নির্গত সেই অতি-তেজস্ক্রিয় মেঘ বাতাস বেয়ে সবচেয়ে প্রথমে আছড়ে পড়েছিল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঠিক পশ্চিম পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় দশ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এক সুদৃশ্য সবুজ পাইন বনে।
পরবর্তী কয়েকদিনের মধ্যে সেই বনের বুকে ঘটে যায় এক ভৌতিক দৃশ্যপট। পাইন গাছের সবুজ পাতাগুলো কোনো আগুন ছাড়াই মুহূর্তের মধ্যে অস্বাভাবিক উজ্জ্বল লালচে-বাদামী, তামাটে ও সোনালী বর্ণ ধারণ করে। পুড়ে ছাই না হয়েও হাজার হাজার পাইন গাছ দাঁড়িয়ে থেকেই নিথর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এই ধ্বংসস্তূপ থেকেই জন্ম নেয় পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর ও কুখ্যাত বনাঞ্চল—“রেড ফরেস্ট” (Red Forest) বা স্থানীয় ইউক্রেনীয় ভাষায় ‘রুডি লিস’ (Рудий ліс)।
কিন্তু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিজ্ঞানীদের মহলে কেন একে প্রায়শই ‘মোভিং ফরেস্ট অব চেরনোবিল’ (The Moving Forest of Chernobyl) বা চলমান বন বলে আখ্যা দেওয়া হয়? কীভাবে একটি সম্পূর্ণ বনকে মাটি খুঁড়ে পাতালে কবর দেওয়া হয়েছিল? ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের সময় এই নিষিদ্ধ বনের মাটিতে রুশ সেনাদের আত্মঘাতী পরিখা খননের পরিণতি কী হয়েছিল? আর চরম প্রাণঘাতী তেজস্ক্রিয়তার মধ্যেও সেখানে কীভাবে শুরু হয়েছে প্রকৃতির এক অলৌকিক পুনর্জন্ম? চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক চেরনোবিলের লাল বনের রোমাঞ্চকর ও শিহরণ জাগানো বিজ্ঞানভিত্তিক ইতিহাস।
☢️ এক নজরে চেরনোবিলের রেড ফরেস্ট (লাল বন)
| ভৌগোলিক অবস্থান: | চেরনোবিল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৪ নম্বর চুল্লির ঠিক পশ্চিমে (চেরনোবিল এক্সক্লুশন জোন বা নিষিদ্ধ এলাকা, ইউক্রেন) |
| আয়তন: | প্রায় ১০ বর্গকিলোমিটার (৪ বর্গমাইল) |
| দুর্ঘটনার তারিখ: | ২৬ এপ্রিল, ১৯৮৬ |
| মূল গাছের প্রজাতি: | স্কটস পাইন (Pinus sylvestris); বর্তমানে পুনরুত্থিত বার্চ ও অ্যাস্পেন বন |
| শোষিত রেডিয়েশনের মাত্রা: | ৫০ থেকে ১০০ গ্রে (Gy) বা ১০,০০০ রন্টজেনের বেশি (যেকোনো জীবিত প্রাণীর তাৎক্ষণিক মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট) |
| প্রধান তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ: | সিজিয়াম-১৩৭ (Cs-137), স্ট্রনশিয়াম-৯০ (Sr-90), প্লুটোনিয়াম-২৩৯ ও আয়োডিন-১৩১ |
| বর্তমান বৈজ্ঞানিক মর্যাদা: | বিশ্বের সর্বাধিক তেজস্ক্রিয় প্রাকৃতিক ল্যান্ডস্কেপ ও মানববর্জিত বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য |
সবুজ থেকে লাল: কেন পাইন গাছগুলো লালচে-তামাটে রূপ ধারণ করেছিল?
পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশেপাশের অন্যান্য গাছপালা (যেমন ওক বা বার্চ) তুলনামূলকভাবে বেঁচে গেলেও পাইন গাছগুলো কেন এত দ্রুত লাল হয়ে মারা গেল? এর পেছনে রয়েছে উদ্ভিদবিজ্ঞানের চমকপ্রদ কোষীয় রহস্য।
উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, পাইন গাছ বা ব্যক্তবীজী চিরসবুজ উদ্ভিদ (Gymnosperms) সাধারণ পর্ণমোচী বা পাতাঝরা গাছের চেয়ে প্রায় চার থেকে দশগুণ বেশি তেজস্ক্রিয়তা-সংবেদনশীল (Radiosensitive)। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
- সুবিশাল জিনোম ও নিউক্লিয়াস: পাইন গাছের কোষের ভেতরে থাকা নিউক্লিয়াস এবং ক্রোমোজোম অত্যন্ত বড় আকারের হয়। ফলে তেজস্ক্রিয় গামা রশ্মি ও বিটা কণা খুব সহজেই পাইন কোষের মূল ডিএনএ অণুকে সরাসরি চিরে টুকরো টুকরো করে ফেলতে পারে।
- সূঁচালো পাতার তেজস্ক্রিয় ফাঁদ: পাইন গাছের পাতাগুলো সূঁচের মতো চিকন এবং এর ওপর থাকে চটচটে রজন বা রেজিন। চুল্লি থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা ও অ্যারোসল বাষ্প সরাসরি পাইনের পাতায় আঠার মতো আটকে যায়।
- ক্লোরোফিল ধ্বংস ও রঞ্জকের উন্মোচন: তীব্র তেজস্ক্রিয়তায় পাতার কোষের ফটোসিন্থেটিক মেমব্রেন পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এর ফলে উদ্ভিদের সবুজ ক্লোরোফিল রঞ্জক মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নষ্ট হয়ে যায়। সবুজ রঙ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর পাতার ভেতরে থাকা লাল ও বাদামী ক্যারোটিনয়েড ও ফ্ল্যাভোনয়েড রঞ্জক পদার্থগুলো উন্মোচিত হয়ে ওঠে। ফলে গাছগুলো আগুনে পুড়ে কালো না হয়েও অদ্ভুত উজ্জ্বল তামাটে লাল বা সোনালী-বাদামী রঙ ধারণ করে।
বিপর্যয়ের প্রথম কয়েক রাতে যারা এই বনের দিকে তাকিয়েছিলেন, তারা এক রোমহর্ষক দৃশ্য দেখেছিলেন। গাছগুলো থেকে নাকি এক অদ্ভুত নীলাভ ও নিওন-সবুজ আলো ঠিকরে বের হচ্ছিল। বিজ্ঞানীরা একে চিহ্নিত করেন চেরেনকভ রেডিয়েশন (Cherenkov Radiation) এবং অতি-উচ্চমাত্রার আয়োনাইজিং রশ্মির প্রভাবে বায়ুমণ্ডলের গ্যাসের জ্বলজ্বলে ফসফরেসেন্স হিসেবে।
রেড ফরেস্টের প্রবেশপথে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক বিকিরণ বিপদ সতর্কতা সাইনবোর্ড (ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স)
কেন একে ‘মোভিং ফরেস্ট’ বলা হয়? পাতালে বন সমাহিতকরণের ইতিহাস
অনেকেই ভাবেন ‘মোভিং ফরেস্ট’ হয়তো কোনো হেঁটে চলা গাছের গল্প। কিন্তু এর পেছনের ঐতিহাসিক সত্যটি যেকোনো কল্পবিজ্ঞানকেও হার মানায়। ১৯৮৬ সালের সেই ভয়াল দুর্ঘটনার পর সোভিয়েত বিজ্ঞানীদের সামনে সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছিল এই লাল বন।
মৃত পাইন গাছগুলো বাতাসে শুকিয়ে গিয়ে পরিণত হয়েছিল কোটি কোটি কুরি তেজস্ক্রিয় বিষে ঠাসা এক বিশালাকার বারুদের স্তূপে। যদি কোনো সামান্য কারণে বনে আগুন লেগে যেত, তবে সেই তেজস্ক্রিয় ধোঁয়া বাতাসের টানে ছড়িয়ে পড়ে পার্শ্ববর্তী প্রিপিয়াত শহর, কিয়েভ এবং সীমান্ত পেরিয়ে পোল্যান্ড ও পশ্চিম ইউরোপে দ্বিতীয় আরেকটি পারমাণবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারত। তাছাড়া সাধারণ বাতাসেও গাছের শুকনো ছাল ও পাতার ধূলিকণা আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছিল।
সোভিয়েত লিকুইডেটরদের সেই নজিরবিহীন অভিযান (১৯৮৬–১৯৮৭)
এই ভয়াবহ ঝুঁকি এড়াতে সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকার এক অবিশ্বাস্য ও চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে: পুরো দশ বর্গকিলোমিটারের বনটিকে মাটির ওপর থেকে কেটে মাটির নিচেই কবর দিতে হবে!
🚜 যেভাবে ঘটেছিল একটি গোটা বনের ভূগর্ভস্থ স্থানান্তর:
- বিশেষ সাঁজোয়া যান ও দূরনিয়ন্ত্রিত বুলডোজার: চরম তেজস্ক্রিয়তার কারণে সাধারণ শ্রমিক সেখানে কাজ করতে পারতেন না। সীসা ও ভারী স্টিলের প্লেট বসানো বিশেষ সামরিক সাঁজোয়া যান এবং রিমোট-কন্ট্রোল্ড বুলডোজার দিয়ে হাজার হাজার মৃত পাইন গাছকে শিকড়সহ উপড়ে ফেলা হয়।
- বিশালাকার ট্রেঞ্চ বা পরিখা খনন: বনের মাটিতে খনন করা হয় শত শত মিটার দীর্ঘ ও কয়েক মিটার গভীর বিশাল বিশাল পরিখা (Trenches)।
- মাটির নিচে কবর: উপড়ে ফেলা লাখ লাখ টন তেজস্ক্রিয় পাইন গাছ বুলডোজার দিয়ে ঠেলে সেই পরিখার ভেতর ফেলে দেওয়া হয় এবং ভারী রোলার দিয়ে পিষে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়।
- বালুর সুরক্ষা চাদর: পরিখাগুলো ভরাট করার পর তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা আটকানোর জন্য ওপর থেকে প্রায় এক মিটার পুরু পরিষ্কার বালু ও কাদার নতুন স্তর বিছিয়ে দেওয়া হয়।
মানুষের চোখের সামনে দৃশ্যমান একটি গোটা অরণ্য মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ভূপৃষ্ঠ থেকে গায়েব হয়ে মাটির গভীরে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। মূলত এই ঐতিহাসিক অভিযানের কারণেই চেরনোবিলের এই অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক গবেষক ও সাংবাদিকদের কাছে পরিচিতি পায় ‘দ্য মুভিং ফরেস্ট’ (The Forest That Moved Underground বা পাতালে চলে যাওয়া বন) হিসেবে!
মাটির নিচের সেই ভূত: যা আজও শান্ত হয়নি
সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ ভেবেছিল গাছগুলোকে মাটির নিচে পুঁতে ফেললেই হয়তো সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা ডেকে আনে আরেক দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত সংকট।
মাটির নিচে সমাহিত সেই পাইন গাছগুলো যখন ধীরে ধীরে পচতে শুরু করে, তখন তাদের ভেতর জমে থাকা মারাত্মক তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ—বিশেষ করে সিজিয়াম-১৩৭ (Cesium-137) এবং স্ট্রনশিয়াম-৯০ (Strontium-90)—মাটির নিচের পানির স্তরে (Groundwater) মিশে যেতে শুরু করে। এই ভূগর্ভস্থ জল চুইয়ে চুইয়ে গিয়ে মেশে প্রিপিয়াত নদীতে, যা পরবর্তীতে ইউক্রেনের প্রধান নদী দিনিপ্রো (Dnieper River)-র মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের পানীয় জলের জলাধারে বিষ ছড়ানোর স্থায়ী ঝুঁকি তৈরি করে। বিজ্ঞানীরা আজও নিয়মিত গভীর নলকূপের মাধ্যমে রেড ফরেস্টের মাটির নিচের জল পরীক্ষা করেন।
২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধ: রাশিয়ান সেনাদের আত্মঘাতী ভুল
চেরনোবিলের রেড ফরেস্ট বিশ্বজুড়ে আবার নতুন করে আতঙ্কের শিরোনামে আসে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, যখন রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করে। বেলারুশ সীমান্ত দিয়ে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ দখলের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ ছিল এই চেরনোবিল এক্সক্লুশন জোন।
যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই রুশ সামরিক বাহিনী চেরনোবিল পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও রেড ফরেস্ট এলাকা দখল করে নেয়। কিন্তু রুশ সামরিক কমান্ডারদের চরম অদূরদর্শিতা ও ঐতিহাসিক অজ্ঞতার কারণে সেখানে ঘটে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা:
- ভারী ট্যাংকের বহর ও তেজস্ক্রিয় ধূলিঝড়: রুশ সেনারা রেড ফরেস্টের নির্ধারিত অ্যাসফল্ট রাস্তা এড়িয়ে মাটির বুক চিরে ভারী সাঁজোয়া যান ও আর্টিলারি ট্যাংক নিয়ে চলাচল করে। ১৯৮৬ সালের পর থেকে মাটির ওপর যে সুরক্ষামূলক ধূলিস্তর জমেছিল, ট্যাংকের চাকার ঘর্ষণে তা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে বাতাসে সুবিশাল তেজস্ক্রিয় ধূলিমেঘ তৈরি করে।
- রেড ফরেস্টে পরিখা বা ট্রেঞ্চ খনন: সবচেয়ে আত্মঘাতী কাণ্ডটি ঘটে যখন রুশ সেনারা ইউক্রেনীয় বাহিনীর সম্ভাব্য পাল্টা আক্রমণ ঠেকাতে এই চরম তেজস্ক্রিয় রেড ফরেস্টের মাটির কয়েক ফুট গভীরে সামরিক পরিখা বা বাংকার (Trenches) খনন করে! তারা সেই তেজস্ক্রিয় কাদার গর্তে দিনরাত অবস্থান নেয়, সেখানে ঘুমায় এবং ধূলিময় পরিবেশে খাবার রান্না করে।
- অ্যাকিউট রেডিয়েশন সিকনেস (ARS): ১৯৮৬ সালে পুঁতে রাখা সেই অতি-উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় আইসোটোপগুলো খননের কারণে সরাসরি উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শত শত রুশ সেনা অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, চরম ক্লান্তি, বমি এবং চুল পড়ে যাওয়ার মতো তেজস্ক্রিয় বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) এবং ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী, অসুস্থ রুশ সেনাদের দ্রুত বেলারুশের বিশেষায়িত রেডিয়েশন চিকিৎসা কেন্দ্রে স্থানান্তর করতে হয়েছিল। এক মাস পর রুশ বাহিনী চেরনোবিল ছেড়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
দাবানলের হুমকি: বাতাসে পারমাণবিক বিষের পুনরাবৃত্তি
রেড ফরেস্টের সামনে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত ঝুঁকি হলো মরু ও বনাঞ্চলের দাবানল (Wildfires)। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে (বিশেষ করে ২০২০ ও ২০২২ সালের গ্রীষ্মে) চেরনোবিলের এই নিষিদ্ধ বনাঞ্চলে বারবার ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়ে।
গাছপালা ও শুকনো পাতা যখন আগুনে পোড়ে, তখন মাটির তেজস্ক্রিয় সিজিয়াম ও স্ট্রনশিয়াম ধোঁয়ার সাথে মিশে বাতাসে কয়েক হাজার ফুট উঁচুতে উঠে যায়। ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে এমন এক বিধ্বংসী দাবানলে রেড ফরেস্টের উল্লেখযোগ্য অংশ পুড়ে গিয়েছিল, যার ফলে কিয়েভের বাতাসে তেজস্ক্রিয়তার সূচক স্বাভাবিকের চেয়ে ১৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং সেই তেজস্ক্রিয় ধোঁয়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বাতাসেও শনাক্ত হয়েছিল।
প্রকৃতির অবিশ্বাস্য রূপান্তর: তেজস্ক্রিয়তার নরকে বন্যজীবনের স্বর্গরাজ্য!
রেড ফরেস্টের সবচেয়ে বড় প্যারাডক্স বা বৈপরীত্য হলো—যে স্থানটিকে মানুষ তেজস্ক্রিয়তার অভিশাপে চিরতরে বর্জন করেছে, সেই স্থানটিই আজ পরিণত হয়েছে বন্যপ্রাণীদের এক পরম স্বর্গরাজ্যে! মানুষের পদচিহ্ন মুছে যাওয়ার পর গত চার দশকে প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে এই ক্ষতস্থান সারিয়ে তুলেছে:
🐺 বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ
মানুষের শিকার, বাড়িঘর ও কলকারখানা না থাকায় এখানে ধূসর নেকড়ে (Grey Wolf), ইউরেশিয়ান লিঙ্কস (Lynx), বাদামী ভালুক, এল্ক ও বুনো শুয়োরের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপের যে কোনো বনের চেয়ে এখানে নেকড়ের ঘনত্ব সাতগুণ বেশি!
🐎 বিরল শেভালস্কি ঘোড়া (Przewalski’s Horse)
বিশ্ব থেকে প্রায় বিলুপ্ত হতে বসা আদিম বুনো ‘শেভালস্কি ঘোড়া’ ১৯৯৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চেরনোবিলে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। আজ তারা তেজস্ক্রিয় রেড ফরেস্টের প্রান্তর জুড়ে দলবেঁধে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বংশবৃদ্ধি করছে।
বিকিরণের সাথে জীবের অভিযোজন: বিজ্ঞানের বিস্ময়
উচ্চমাত্রার রেডিয়েশন নিশ্চিতভাবেই কোষের ক্ষতি করে। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় রেড ফরেস্টের প্রাণীদের মধ্যে কিছু মিউটেশন লক্ষ্য করা গেছে—যেমন সোয়ালো পাখির পালকে সাদা ছোপ, ইঁদুরের চোখে ছানি কিংবা মাকড়সার ত্রুটিপূর্ণ জাল বোনা। কিন্তু সবচেয়ে চমকপ্রদ অভিযোজন দেখা গেছে চেরনোবিলের গেছো ব্যাঙদের (Eastern Tree Frog) মধ্যে!
স্বাভাবিক অবস্থায় এই ব্যাঙগুলো উজ্জ্বল সবুজ রঙের হয়ে থাকে। কিন্তু চেরনোবিলের রেড ফরেস্টে বসবাসকারী ব্যাঙগুলোর ত্বক সম্পূর্ণ কুচকুচে গাঢ় কালো বর্ণ ধারণ করেছে! বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, তেজস্ক্রিয়তার হাত থেকে ডিএনএকে রক্ষা করার জন্য ব্যাঙগুলোর ত্বকে অতিরিক্ত মেলানিন (Melanin) রঞ্জক তৈরি হয়েছে, যা তেজস্ক্রিয়তার ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই নিরপেক্ষ করে দেয়। প্রকৃতি কীভাবে প্রতিকূলতার মাঝেও জীবনকে টিকিয়ে রাখে, এটি তার এক অনন্য জীবন্ত প্রমাণ।
রেড ফরেস্ট সম্পর্কিত সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
❓ ১. রেড ফরেস্ট কি বর্তমানে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও নিরাপদ?
না, একদমই নয়। দূর থেকে নতুন গজিয়ে ওঠা সবুজ বন দেখে স্বাভাবিক মনে হলেও, রেড ফরেস্ট আজও পৃথিবীর সর্বাধিক তেজস্ক্রিয় প্রাকৃতিক স্থানগুলোর একটি। এই বনের মাটি, গাছের গুঁড়ি ও শ্যাওলার ভেতরে মারাত্মক মাত্রার বিকিরণ রয়েছে। এখানে মাত্র কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করলে একজন মানুষের শরীরে সারা বছরের নিরাপদ সীমার চেয়ে শতগুণ বেশি রেডিয়েশন প্রবেশ করতে পারে।
❓ ২. সাধারণ পর্যটকদের কি রেড ফরেস্টে যাওয়ার অনুমতি আছে?
চেরনোবিল এক্সক্লুশন জোনের সাধারণ গাইডেড ট্যুরগুলোতে পর্যটকদের প্রিপিয়াত শহর বা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছাকাছি নির্দিষ্ট অ্যাসফল্ট রাস্তায় চলার অনুমতি দেওয়া হলেও, রেড ফরেস্টের ভেতরে প্রবেশ করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। পর্যটকবাহী গাড়িগুলো রেড ফরেস্ট এলাকা পার হওয়ার সময় জানালা বন্ধ রাখতে হয় এবং গাড়ির গতি বাড়িয়ে দ্রুত এলাকাটি পার হতে হয়।
❓ ৩. এই বনের তেজস্ক্রিয়তা শেষ হতে কত বছর সময় লাগবে?
রেড ফরেস্টে ছড়িয়ে থাকা প্রধান ক্ষতিকর আইসোটোপ সিজিয়াম-১৩৭ ও স্ট্রনশিয়াম-৯০-এর অর্ধায়ু (Half-life) প্রায় ৩০ বছর। অর্থাৎ এদের তেজস্ক্রিয়তা অর্ধেকে নামতে ৩০ বছর লাগে। তবে সেখানে থাকা প্লুটোনিয়াম-২৩৯-এর অর্ধায়ু প্রায় ২৪,১০০ বছর! তাই পুরো রেড ফরেস্ট এলাকা প্রাকৃতিকভাবে সম্পূর্ণ মানববাসের উপযোগী ও নিরাপদ হতে হাজার হাজার বছর সময় লাগবে।
❓ ৪. নতুন যে গাছগুলো জন্মেছে সেগুলো কি তেজস্ক্রিয়?
হ্যাঁ, নতুন গজিয়ে ওঠা প্রতিটি বার্চ, অ্যাস্পেন গাছ এবং মাটির মাশরুম ও ঘাস অত্যন্ত তেজস্ক্রিয়। কারণ গাছের শিকড় ভূগর্ভস্থ দূষিত মাটি ও জল থেকে পুষ্টির সাথে সাথে সিজিয়াম ও স্ট্রনশিয়াম শোষণ করে কাণ্ড ও পাতায় জমা করে। ফলে এই বনের কোনো কাঠ পোড়ানো বা ফলমূল খাওয়া চরম বিষাক্ত ও প্রাণঘাতী।
Comments are closed.