এডিনবার্গ দুর্গ: মৃত আগ্নেয়গিরির উপর দাঁড়িয়ে থাকা আকাশচুম্বী অট্টালিকা
আধুনিক স্থাপত্য ও নির্মাণ প্রযুক্তির কল্যাণে আজ আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অহরহ আকাশচুম্বী অট্টালিকার দেখা মেলে। আকাশ ছোঁয়ার এই অলিখিত প্রতিযোগিতা দেখতে দেখতে আমরা বেশ অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তাই মেঘ ফুঁড়ে ওপরে ওঠা অট্টালিকা আমাদের ক্ষণিক আনন্দ দিতে পারে হয়ত কিন্তু মোহিত করেনা। আজ আপনাদের এক আকাশচুম্বী অট্টালিকার গল্প শোনাব। না, না, এযুগের কোন মামুলি অট্টালিকার গল্প নয়। ইতিহাস, ঐতিহ্য আর আভিজাত্যের কাহিনী দিয়ে ভরা ঐতিহাসিক এডিনবার্গ দূর্গ এর গল্প।
স্কটল্যান্ডের রাজধানী এডিনবার্গের আকাশ ছুঁয়ে প্রায় হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে এই ঐতিহাসিক এডিনবার্গ দূর্গটি। দূর্গটি ১৬৩৩ সাল পর্যন্ত দূর্গটি রাজপ্রাসাদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে এখানে রাজবংশের আধিপত্য লোপ পায় এবং সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত এটি সৈন্য-ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

Source: edinburghcastle.gov.uk
উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধেই এটি স্কটল্যান্ডের জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং তখন থেকে এই দূর্গটি সংরক্ষণের জন্য নানা রকমের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। স্কটল্যান্ড রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ছাড়াও চতুর্দশ শতাব্দীতে ঘটে যাওয়া স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১৭৪৫ সালে জ্যাকোবের উত্থান সহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার স্বাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই এডিনবার্গ দূর্গটি। ২০১৪ সালের একটি গবেষণায় এখানে ১১০০ বছরের পুরোনো ২৬ টি সূরক্ষাব্যূহ পাওয়া যায় যা প্রমাণ করে যে, “এটি নিঃসন্দেহে গ্রেট ব্রিটেনের সবচেয়ে সূরক্ষিত যায়গা এবং শত্রুপক্ষকে আক্রমণের জন্য বিশ্বের যেকোনো স্থানের চেয়ে অধিক সুবিধাজনক”।
এডিনবার্গে যেসকল ভবন রয়েছে তার বেশির ভাগই ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যযুগীয় যুদ্ধে বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া তবে ব্যতিক্রম হলো সেন্ট মার্গারেট চ্যাপেলের ভবন যা দ্বাদশ শতাব্দী থেকে এখন পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ রয়েছে এবং এটি এডিনবার্গের সবচেয়ে প্রাচীন ভবন হিসেবে স্বীকৃত।

Source: Nel cuore della Scozia
এডিনবার্গ দূর্গ এর ভূতত্বঃ
এডিনবার্গ দূর্গটি একটি মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালা মুখের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। যে আগ্নেয়গিরিটি প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন বছর আগে নিম্ন কার্বোনিফেরাস যুগে সক্রিয় হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। সক্রিয় অগ্ন্যুৎপাতের ফলে জাগ্রত হওয়া শৈলস্তর মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে ক্রমে শীতলীভূত হয়ে পলি শিলা স্তরে পরিণত হয়।

Source: WordPress.com
দূর্গটির সর্বোচ্চ শৃঙ্গের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে প্রায় ১৩০ (৪৩০ ফুট) মিটার।এডিনবার্গ দূর্গের উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম এই তিন পার্শ্বই ভূপৃষ্ঠ হতে ৮০ মিটার (২৬০ ফুট) করে উঁচু। তাই স্বাভাবিক ভাবেই শুধু পশ্চিম পাশ দিয়েই একমাত্র এখানে আরোহণ করার পথ খোলা। যদিও প্রতিরক্ষা সুরক্ষার ব্যাপার নিয়ে দূর্গটি অতুলনীয় তবুও কিছু অসুবিধাও আছে এখানে। তারমধ্যে অন্যতম হলো পানির যোগান।

Source: Viaggi – NanoPress
প্রথম স্থাপনাঃ
প্রথম কখন এখানে মানব বসতি গড়ে উঠেছিল ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় এখনো সে ব্যাপারে কোন তথ্য আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। ২য় শতাব্দীতে অঙ্কিত বিখ্যাত টলেমির মানচিত্র অনুযায়ী ১ম শতাব্দীতে রোমান সাম্রাজ্য কর্তৃক ব্রিটেন আক্রমণের সময়ও উত্তর ব্রিটেনের প্রতি রোমান জেনারেল এগ্রিকোলার তেমন কোন আগ্রহের কথা জানা যায়না।টলেমীর মানচিত্র অনুযায়ী উত্তর ব্রিটেনের ভোটাডিনি সীমান্তে “আলুয়ানা” নামক একটি ভূখণ্ডের অস্তিত্বের কথা জানা যায় যার অর্থ “শৈলস্থান” সম্ভবত এটিই বর্তমান এডিনবার্গ দূর্গের পূর্ব নাম হয়ে থাকবে। এটি নিকটবর্তী অন্য একটি জনগোষ্ঠীর পার্বত্য দূর্গের নামও হতে পারে। সে ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত কোন অকাট্য প্রমাণ জোগাড় করা সম্ভব হয়নি।

Source: The Conversation
১৯৯০ সালের একটি ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় গবেষকরা এখানের পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রাচীন যুগে থেকে মানব বসতির প্রমাণ পেয়েছেন। তাদের মতে, এখানে অনেক আগেই মানব বসতি শুরু হয়েছিল হতে পারে তা ব্রোঞ্জ যুগ থেকে অথবা তারও আগের লৌহ যুগ থেকে। তবে যখনই হোক এটি যে স্কটল্যান্ডের সবচেয়ে প্রাচীন বসতি এ ব্যাপারে কারও কোন দ্বিমত নেই।
ইতিহাস, ঐতিহ্যে এডিনবার্গ দূর্গঃ
টলেমীর মানচিত্র থেকে শুরু করে ৬০০ সালের আগ পর্যন্ত কোন ঐতিহাসিক রেকর্ডে এই দূর্গের কোন চিহ্নটি পর্যন্ত দেখা যায়না। প্রাচীন মহাকাব্য ওয়েলস এ ওয়াই গদদ্দিন কবিতায় ‘ডিনএডিন’র উল্লেখ পাওয়া যায় যেখানে “এডিনেরকেল্লা”র কথা বলা হয়েছে। এটি দ্বারা ধারণা করা হয় যে বর্তমানের এডিনবার্গ দূর্গই তখনকার এডিনের কেল্লা হয়ে থাকবে হয়ত।
স্কটিশ স্বাধীনতা যুদ্ধঃ
১২৮৬ সালে শাসক আলেক্সান্ডার-৩ এর মৃত্যুর পর স্কটল্যান্ডের রাজসিংহাসন শাসক বিহীন হয়ে পড়ে। কে হবে ভবিষ্যৎ স্কটল্যান্ডের শাসক এই নিয়ে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে প্রায় বিবাদ উপস্থিত হয়ে পড়ে । স্কটল্যান্ডের সিংহাসনের উত্তরাধিকার বিবাদ মীমাংসার জন্য ইংরেজরা তখন ইংল্যান্ডের এডওয়ার্ড-১ কে বিচারক হিসেবে নিযুক্ত করে। বিবাদ মীমাংসার নামে এই সুযোগে এডিনবার্গে এসে এডওয়ার্ড-১ নিজেকে স্কটল্যান্ডের সামন্তবাদীদের পুরোধা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে থাকে।

Source: Wikiwand
১২৯৬ সালের মার্চ মাসে এডওয়ার্ড-১ হঠাৎ করে স্কটল্যান্ড আক্রমণ করে বসে এবং শুরু হয় প্রথম স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা যুদ্ধ। দ্রুত, মাত্র তিনদিনের গোলাবর্ষনে এডিনবার্গ দূর্গটি ইংরেজদের দখলে চলে আসে।দূর্গ দখল করে এডওয়ার্ড অনেকে স্কটিশ রাজনথি এবং বিপুল পরিমাণের ধন-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ইংল্যান্ডে নিয়ে যায়। এরপর ১৩০০ সালে ৩২৫ জন সৈন্য দিয়ে এডওয়ার্ড এডিনবার্গে বিশাল এক ঘাঁটি স্থাপন করে।
ডেভিড টাওয়ার এবং পঞ্চদশ শতকঃ
এডওয়ার্ডের স্কটল্যান্ডে দখলদারিত্বের পর থেকে শুরু হওয়া স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা যুদ্ধের রেশ চলতে থাকে দীর্ঘ দিন ধরে। ১৩৫৭ সালে বেরউইকের চুক্তির মাধ্যমে এই যুদ্ধ প্রায় সমাপ্তির মুখ দেখে। এরপর দ্বিতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী ডেভিড-২ স্কটল্যান্ডের সিংহাসন পুনরাধিকার করেন এবং এডিনবার্গ দূর্গে নিজের রাজধানী স্থাপন করেন। তিনি ১৩৬৭ সালে এডিনবার্গ দূর্গে নিজের ভবন স্থাপনের কার্যক্রম শুরু করেন কিন্তু ১৩৭০ সালে হঠাৎ তার মৃত্যুতে এই কার্যক্রম ব্যহত হয়। পরবর্তীতে তার উত্তরসূরি রবার্ট-২ ১৩৭০ সালে ডেভিড টাওয়ারের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন।

Source: English Historical Fiction Authors – blogger
ষোড়শ শতাব্দীর নকশাঃ
পরবর্তীতে ৯ সেপ্টেম্বর ১৫১৩ সালের এক যুদ্ধক্ষেত্রে এডিনবার্গ দূর্গের অধিকারী জেমস-৪ এর মৃত্যু হয়। এরপর ধারণা করা হচ্ছিল ইংরেজরা আবার দূর্গে আক্রমন চালাতে পারে। ইংরেজদের আক্রমনের হাত থেকে রক্ষা করতে আবার এডিনবার্গ দূর্গের নতুন নকশা করা হয়। রবার্ট বোর্থিক একজন ফরাসি প্রকৌশলীকে নিয়ে দূর্গের নতুন প্রতিরক্ষা নকশা অনুযায়ী ১৫১৪ সালে দূর্গের চারপাশ দিয়ে দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরি করেন।

Source: Lions and Lilies – WordPress.com
পার্শ্ব শাখা, অর্ধচন্দ্র ব্যাটারি এবং পোর্টকুলিস দ্বার সহ দূর্গটির বেশির ভাগ অংশই রিজেন্টমর্টোন কর্তৃক পুনর্নির্মিত হয়। এসব নির্মাণের অনেক কাজই নির্মান কর্মের পুরোধা উইলিয়াম ম্যাকডোয়ালের তত্ত্বাবধায়নে হয় যিনি ১৫ বছর আগে ডেভিড টাওয়ারের সংস্কার কার্য করেছিলেন। অর্ধচন্দ্র বা হাফমুন ব্যাটারি ভবন যা বর্তমানে এডিনবার্গ দূর্গের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ; নির্মাণের সময় সমসাময়িক ইতিহাসবেত্তারা খুবই অকেজো এবং সেকেলে মনে করতেন।

Source: DART 135 F – blogger
সৈন্য ঘাঁটি ও বন্দিশালা হিসেবে এডিনবার্গ দূর্গঃ
১৬৬০ সালে সংস্কারের পর চার্লস-২ এখানে পূর্নাঙ্গ সৈন্যঘাঁটি স্থাপন করেন। ফলে মধ্যযুগীয় এতো ইতিহাস ঐতিহ্যের সাক্ষী এই দূর্গটি সামান্য একটি সৈন্য ঘাঁটিতে পরিণত হয়ে যায়। তারপর থেকে রাজকীয় কার্যক্রম বন্ধ হলেও এখানে সেনা এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম চলতে থাকে।

Source: Wikimedia Commons
চার্লস-২ তার আসন পুনঃগ্রহন করার পর ১৬৬১ সালে তার পুরনো শত্রু আর্গাইলের মার্কুইসকে এখানে বন্দি করেন। এভাবেই এখানে আরও অনেককে বিভিন্ন অপরাধ বা শত্রুতার জের ধরে বন্দি করা হতে থাকে।তখন থেকে শুরু করে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত সেখানে সৈন্য ঘাঁটি ছিল এখানে।
উনবিংশ শতাব্দী থেকে বর্তমান পর্যন্তঃ
১৮১৪ সালে এডিনবার্গ দূর্গের বন্দিশালার দক্ষিণ দেওয়াল ভেঙ্গে একসাথে ৪৯ জন কয়েদীর পালিয়ে যায় । এরপর কারা কর্তৃপক্ষ বন্দিশালা হিসেবে এডিনবার্গ দূর্গকে অনুপযুক্ত ঘোষণা করে। ১৮১৪ সালে এখান থেকে বন্দিশালার সকল কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়া হয়। এরপর থেকে দূর্গটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে পরিগণিত করা হয় এবং জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।

Source: Wikimedia Commons
১৮১৮ সালে স্যার ওয়াল্টার স্কট কে এডিনবার্গ দূর্গের স্কটল্যান্ডের রাজমুকুট সন্ধানের অনুমতি দেওয়া হয়। যা ১৭০৭ সালে স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের একত্রিত হওয়ার সময় সেটি এই দূর্গে হারিয়ে গিয়েছিল। মুকুট কামরা নামে পরিচিত সিল করা একটি কামরার তালা ভেঙ্গে স্কটল্যান্ডের গৌরবকে তিনি খুঁজে বের করে আনেন এবং পরবর্তীতে তা প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়। এরপরেও কয়েকটি যুদ্ধে এডিনবার্গ দূর্গের ব্যবহার দেখা যায়। ১৯৯৫ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকে এটি একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয় এবং এখন প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য দর্শকরা এক নজর দেখতে ছুটে আসেন হাজারো কাহিনীর কেন্দ্রবিন্দু ইতিহাস বিখ্যাত এডিনবার্গ দূর্গ কে।
buy lamisil no prescription – purchase griseofulvin for sale buy grifulvin v