সিনেমা পর্যালোচনাঃ দ্যা বয় ইন দ্যা স্ট্রাইপড পাজামাস

1

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনী দ্বারা ইহুদীদের উপর অত্যাচার এবং গণহত্যা হলোকাস্ট নামে পরিচিত। এই হলোকাস্টে প্রায় ৬ মিলিয়ন ইহুদী নাৎসি বাহিনী কর্তৃক নিহত হয়। হলোকাস্টের ওপর নির্মিত ছবি “দ্যা বয় ইন দ্যা স্ট্রাইপড পাজামাস”।

ছবিটি নির্মিত হয় আইরিশ উপন্যাসিক জন বয়নের উপন্যাস “দ্যা বয় ইন দ্যা স্ট্রাইপড পাজামাস” ওপর ভিত্তি করে। ঐতিহাসিক এ ড্রামা ছবিটি পরিচালনা করেন মার্ক হ্যারমান। মুক্তি পায় ২০০৮ সালে। আট বছরের দুটি শিশুর চোখে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, ইহুদি গণহত্যা, প্রিজন ক্যাম্পে বন্দীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন, গ্যাস চেম্বারসহ আরও অনেক বিষয় বেশ নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে এই সিনেমায়।

ব্রুনো চরিত্রে আসা বাটারফিল্ড

ছবিটি শুরু হয় ব্রুনো নামে এক ছোট ছেলের বন্ধুদের সাথে খেলার দৃশ্যের মাধ্যমে। ব্রুনো চরিত্রে অভিনয় করে আসা বাটারফিল্ড। খেলা শেষে বাসায় এসে সে জানতে পারে তার বাবার প্রমোশনের কথা। তার বাবা রালফ(ডেভিড থিউলিস) একজন নাৎসি অফিসার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তাকে একটি প্রিজন ক্যাম্পের প্রধান করে গ্রামের দিকে পাঠানো হয়। এর আগে ব্রুনোরা সপরিবারে বার্লিনে বসবাস করতো। ব্রুনোর মা এলসা চরিত্রে অভিনয় করেন ভেরা ফারমিগান এবং বোন গ্রেটেল চরিত্রে এম্বার বিয়াট্রি। শৈশবের বন্ধুদের ছেড়ে যেতে ব্রুনোর খারাপ লাগে। কিন্তু ব্রুনোর মা এলসা তাকে আশ্বস্ত করে নতুন জায়গাতেও তার অনেক বন্ধু হবে। কিন্তু পরবর্তীতে ধারণাটি ভুল প্রমাণিত হয়। শহর ছেড়ে এমন এক পল্লী এলাকায় ব্রুনোকে থাকতে হয় যেখানে বন্ধুতো দূরের কথা কোন স্কুলই নেই। ক্রমেই একাকীত্ব এবং বিষণ্ণতা চেপে বসে ব্রুনোকে। ব্রুনোর বাবা তাদের জন্য একজন গৃহ শিক্ষক নিয়োগ দেয়। যার নাম লিস্টজ। গৃহ শিক্ষক ব্রুনো এবং তার বোনকে ইতিহাস শিক্ষা দেয়। মূলত কৌশলে লিস্টজ ইহুদি বিদ্বেষ এবং জাতীয়তাবাদী প্রচারণা চালাতে থাকে। এই ইহুদি বিদ্বেষ এবং জাতীয়তাবাদ দ্বারা গ্রেটেল চরম ভাবে প্রভাবিত হয়। ব্রুনোর কাছে পুরো বিষয়টিই চরম বিরক্তিকর মনে হয়। গৃহ শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষা পেয়ে গ্রেটেল ক্রমেই ধর্মান্ধ হয়ে ওঠে এবং সে নাৎসি বাহিনীর কার্যক্রমকে সমর্থন যোগাতে থাকে। তার রুম নাৎসি বাহিনীর প্রধান হিটলার সহ বিভিন্ন পোস্টারে ছেয়ে যায়। এই ইহুদি বিদ্বেষকে ব্রুনো মেনে নিতে পারে না। একদিন খেলতে গিয়ে আহত হলে পাভেল নামে যুদ্ধবন্দী ইহুদি ক্রীতদাস ওর চিকিৎসা করলে ব্রুনো বেশ অবাক হয়। এতদিন ধরে ডোরা কাটা পোশাক পড়া পাভেলকে সে জানতো একজন আলু উৎপাদনকারী চাষি হিসেবে। পরে পাভেল জানায় এখানে আসার আগে সে একজন চিকিৎসক হিসেবে কাজ করতো। ব্রুনো রোমাঞ্চকর বই পড়তে ভালোবাসতো। একদিন কৌতুহলবশত ব্রুনো তার পেছনের বাগান থেকে না না উপায়ে বের হয়ে কাঁটাতার বেষ্টিত এক অদ্ভুত জায়গায় এসে পৌঁছায়। এখানে সে শ্মুয়েলনামে তার বয়সী এক ইহুদি শিশুকে দেখতে পায়। শ্মুয়েলচরিত্রে অভিনয় করে, জ্যাক স্ক্যানলন। ক্রমেই তারা একে অপরের বন্ধু হয়ে ওঠে।

শ্মুয়েল চরিত্রে জ্যাক স্ক্যানলন

আলাপচারিতার মাঝে ব্রুনো জানতে পারে শ্মুয়েল একজন ইহুদি এবং শুধুমাত্র একজন ইহুদি হবার কারণেই তাকে এখানে আটকে রাখা হয়েছে। শ্মুয়েলের বন্ধু সুলভ আচরণ ব্রুনোকে মুগ্ধ করে। এবং তার গৃহ শিক্ষকের প্রতি তার এক প্রকার বিতৃষ্ণা জন্মে, যিনি সবসময় ইহুদি বিদ্বেষ ছড়িয়ে থাকেন। শ্মুয়েলের পড়নে স্ট্রাইপড পাজামা দেখে ব্রুনোর মনে কৌতূহল জাগে এবং তাকে এ পাজামা পড়ার কারণ জিজ্ঞেস করে। শ্মুয়েল জানায় এখানে সবাইকেই এ ধরনের পোশাক পড়তে হয়। ব্যাপারটা ব্রুনোর কাছে মজার মনে হয়। বলাবাহুল্য, নাৎসিবাহিনীর প্রতিটি ক্যাম্পেই বন্দীদের এ ধরণের পোশাক পড়তে হতো এবং তাদের মাথা থাকতো কামানো। শ্মুয়েল থাকে বেশ ক্ষুধার্ত। সে ব্রুনোর কাছে খাবার চায়। পরবর্তীতে দেখা করতে আসার সময় ব্রুনো শ্মুয়েলের জন্য খাবার নিয়ে আসে। ক্রমেই তাদের বন্ধুত্ব জোড়াল হয়।

ব্রুনোর বোন গ্রেটেল চরিত্রে এম্বার বিয়াট্রি

একদিন ব্রুনোর মা এলসা টের পান বাড়ির পেছনের দিক থেকে বিকট গন্ধ আসছে। সেই সাথে চিমনি থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। তিনি জানতে পারেন এগুলো ইহুদি মৃতদেহ পোড়ানো গন্ধ। বেশ মর্মাহত হন তিনি। স্বামীর সাথে বাক বিতণ্ডা করেন। কিছুদিন পর রাতের খাবার খাওয়ার সময় ব্রুনো অভিযোগ তোলে তার গৃহশিক্ষক লিস্টজ তাকে অ্যাডভেঞ্চার বই পড়তে দেয় না। শুধু ইতিহাস শেখায়। ব্রুনোর কাছে যা চরম বিরক্তিকর। নাৎসি সেনা অফিসার কোটলার কথা প্রসঙ্গে বলেন, ইতিহাস তার প্রিয় বিষয় ছিল। কিন্তু তার বাবা ইতিহাস পছন্দ করতেন না। তার বাবা একজন অ্যাকাডেমিশিয়ান ছিলেন। যুদ্ধ শুরু হলে যিনি সুইজারল্যান্ডে চলে যান। এ কথা শোনার পর রালফ কোটলারকে বলেন, তার বাবা সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা উচিত। কোটলার বেশ বিব্রত হন এতে। এর মাঝে ইহুদি ক্রীতদাস পাভেল ওয়াইনের গ্লাস ফেলে দিলে কোটলার তার লাঠি দিয়ে পাভেলকে আঘাত করে। পাভেলের মৃত্যু হয়। যদিও সিনেমায় মৃত্যু দৃশ্য দেখানো হয় না। পরদিন মারিয়া নামে অন্য গৃহকর্মী মেঝে থেকে রক্ত পরিষ্কার করে ফেলেন।

ছবির একটি বিশেষ দৃশ্যে ব্রুনো এবং শ্মুয়েল

পরবর্তীতে ব্রুনো পাভেলের জায়গায় শ্মুয়েলকে কাজ করতে দেখে। ব্রুনো তার বন্ধুকে নিজের ঘরে কাজ করতে দেখে অবাক হয়। শ্মুয়েল জানায় গ্লাস পরিষ্কারের জন্য ছোট এবং চটপটে আঙুল দরকার তাই শ্মুয়েলকে স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। ব্রুনো শ্মুয়েলকে খেতে দেয়। তাদের এই আলাপচারিতা কোটলার দেখতে পারলে ব্রুনো শ্মুয়েলকে আগে থেকে চিনতে পারে কিনা জিজ্ঞেস করে। হতবিহ্বল ব্রুনো ভয়ে অস্বীকার করে। কোটলার শ্মুয়েলকে প্রহার করে। ব্রুনো মনে মনে অনুতপ্ত হয়। সে তার কাছে ক্ষমা চাইতে গেলে জানতে পারে শ্মুয়েল চলে গেছে। এরপর প্রতিদিন ব্রুনো শ্মুয়েলের দেখা পাওয়ার আশায় সেই জায়গায় যায়। কিন্তু শ্মুয়েলের দেখা মেলে না। ব্রুনো বিচলিত হয়। ঘটনাক্রমে আবার একদিন আঘাতপ্রাপ্ত চোখ নিয়ে শ্মুয়েল হাজির হয়। শ্মুয়েল ব্রুনোকে ক্ষমা করে দেয় এবং তাদের বন্ধুত্ব নতুন করে শুরু হয়।

ব্রুনোর বাবা নাৎসি অফিসার রালফ চরিত্রে ডেভিড থিউলিস

এদিকে ব্রুনোর দাদি বার্লিনে বোমা হামলায় নিহত হলে তার বাবা সিদ্ধান্ত নেয় ব্রুনো এবং তার বোন গ্রেটেলকে কোন আত্মীয়ের কাছে রেখে আসতে। এরমাঝে একদিন ব্রুনো শ্মুয়েলের কাছে গিয়ে জানতে পারে তার বাবাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ব্রুনো শ্মুয়েলকে সাহায্য করবে বলে আশ্বাস দেয়। একদিন ব্রুনো মাটি খুঁড়ে কাঁটাতারের ওপাশে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে চলে যায়। সেখানে গিয়ে সে ইহুদি ছদ্মবেশ ধারণ করার লক্ষ্যে বন্দী শিবিরের পোশাক পড়ে নেয়। ভেতরে গিয়ে ব্রুনো বন্দীদের দুরবস্থা দেখে বেশ অবাক হয়। তারা দুজন মিলে শ্মুয়েলের বাবাকে খুঁজতে তাকে। এক ঘরে তারা যখন শ্মুয়েলের বাবাকে খুঁজছিল তখন একদল সলোকমান্ডার এসে তাদের গ্যাস চেম্বারের দিকে নিয়ে যাওয়া শুরু করে। ওদিকে ব্রুনোর অনুপস্থিতির কথা তার মা এবং বোন টের পায়। তার ব্রুনোকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে। ব্রুনোর মা এলসা রালফকে এ কথা জানায়। রালফ তখন গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিংএ ব্যস্ত ছিল। মুহূর্তের মধ্যে রালফসহ অন্যান্য নাৎসি অফিসারেরা ব্রুনোকে খোঁজার তৎপরতা চালায়। একসময় সবাই বুঝতে পারে ব্রুনো সেই ক্যাম্পের ভেতরে চলে গেছে। তারা দ্রুত ক্যাম্পের দিকে ছুটতে থাকে। এদিকে মেঘ ঘন করে বৃষ্টি নামে। ইহুদি বন্দিদের তার মাঝেই নিয়ে যাওয়া হয় গ্যাস চেম্বারের দিকে। গোসল শেষ করিয়ে গ্যাস চেম্বারে সবাইকে ঢোকানো হয়। এরপর বিষাক্ত গ্যাস ছেড়ে দেয়া হয়। ছবির শেষ দৃশ্যে দেখা যায় গ্যাস চেম্বারে মানুষের আর্তনাদ, এর মাঝে ব্রুনো এবং শ্মুয়েল দুজন দুজনের হাত ধরে আছে। ঠিক তার কিছু পরেই ব্রুনোর বাবা রালফ ক্যাম্পে পৌঁছায়। কিন্তু ততক্ষণে গ্যাস চেম্বার স্তব্ধ, নীরব।

ব্রুনোর মা এলসা চরিত্রে ভেরা ফারমিগা

ছবিটি বেশ আবেগি। অনেক বিষয় চমৎকার ভাবে ফুটে উঠেছে। প্রথম দেখাতেই দর্শকদের চোখ ভিজে উঠবে। সেই সাথে জানা যাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার কথা। ছবিটির প্রধান বৈশিষ্ট্য এটি মনের মাঝে অসাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ ঘটায়। সবকিছু ছাপিয়ে একজন নাৎসি অফিসারের ছেলের সাথে একজন যুদ্ধবন্দী ইহুদি ছেলের গভীর বন্ধুত্ব এবং অন্তিম পরিণতি মনকে নাড়া দেয়। ছবির পরতে পরতে লুকিয়ে আছা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের না বলা অনেক কথা। ছবির মাধ্যমে সে সময়ের নাৎসি বর্বরতার কিছু চিত্র পাওয়া যায়। এছাড়া গৃহ শিক্ষক ইতিহাসকে যখন ভিন্নভাবে তুলে ধরছিলেন তখন গ্রেটেলকে এর দ্বারা চরমভাবে প্রভাবিত হতে দেখা যায়। পরবর্তীতে এর ফলে তার মধ্যে ইহুদি-বিদ্বেষ এবং জাতীয়তাবাদী চেতনা লক্ষ্য করা যায়। বিষয়টি মনে রাখার মত। এছাড়া হলোকাস্টের বিষয়টিও সুন্দরভাবে ফুটে

গ্যাস চেম্বারে বন্দী ইহুদীরা। ছবির শেষ দৃশ্য থেকে নেয়া।

উঠেছে সিনেমায়। শেষ দৃশ্যে গ্যাস চেম্বারে বন্দীদের আর্তনাদ চোখের পাতা ভিজিয়ে দেয়। সে সময় নাৎসি অফিসারদের বাড়িতে বন্দী ইহুদিদের ক্রীতদাস হিসেবে কাজ করতে দেখা যায়। পাভেল নামে এক চরিত্রের দেখা মেলে সিনেমায় যিনি আগে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করতেন, এবং যুদ্ধের সময় প্রিজন ক্যাম্প প্রধান, ব্রুনোর বাবা রালফের বাসায় দাস হিসেবে কাজ করেন। নাৎসি বর্বরতার আরও দেখা পাওয়া যায় যখন সামান্য অপরাধে নাৎসি অফিসার কোটলার পাভেলকে বেশ মারধর করে এবং শ্মুয়েলকেও প্রহার করে। এছাড়া সেসময় ইহুদিদের পোড়ানো হতো, চিমনির মাধ্যমে যে ধোঁয়া বের হতো। ছবিতে এই চিত্রায়নও যুদ্ধের ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দেয়। এছাড়া নাৎসি অফিসারের স্ত্রী হয়েও এলসার ইহুদিদের প্রতি মানবতা-বোধ দেখতে পাওয়া যায়। পুরো ছবিতে ব্রুনো এবং শ্মুয়েল চরিত্রে আসা বাটারফিল্ড এবং জ্যাক স্ক্যানলনের অনবদ্য অভিনয় মুগ্ধ করার মতো। তবে সিনেমায় কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের সেই ভয়ার্ত পরিবেশের মাঝেও একজন ইহুদি বন্দি শিশুর সাথে একজন নাৎসি অফিসারের ছেলের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার সম্ভাবনা কত খানি তা প্রশ্নের বিষয়। তবে ছবির শেষ দৃশ্যে গ্যাস চেম্বারে দুজন অবুঝ শিশুর হাতে হাত ধরে থাকা এবং চারপাশে বন্দীদের আর্তনাদ মনে দাগ কাটার মতো। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, চিত্রনাট্য, পরিচালনা, কাহিনী, সবকিছু মিলিয়ে “দ্যা বয় ইন দ্যা স্ট্রাইপড পাজামাস” দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ওপর নির্মিত অন্যতম সেরা ছবি।

৯৪ মিনিট ব্যাপ্তির সিনেমাটি প্রায় ১২ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়। ছবিটি হলিউডের অন্যতম ব্যবসাসফল ছবি।

Leave A Reply
1 Comment
  1. Cdbiqy says

    semaglutide 14 mg drug – buy DDAVP buy DDAVP

sativa was turned on.mrleaked.net www.omgbeeg.com

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More