পানামা খাল : বিশ্ববাণিজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ রুট
সমগ্র পৃথিবীর তিন ভাগ জল আর একভাগ স্থল। তবে এই স্থল ও জলভাগের বণ্টন সর্বদা সুষমভাবে হয় না বা মানুষের চাহিদামত হয় না। একদিকে যেমন জলভাগের উপর সেতু তৈরি করা হয় । অপরদিকে স্থলভাগ কে কেটে জলভাগে রূপ দেয়া হয়। এইসব জলভাগকে কৃত্রিম জলভাগ হিসেবেই গণনা করা হয়। অধিকাংশ সময়েই অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এই ধরনের প্রকল্পকে গ্রহণ করা হয়। এধরনের বৃহৎ প্রকল্পের অন্যতম প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল সুয়েজ খাল ও পানামা খাল। তবে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পানামা খালের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সুয়েজ খালের চেয়ে অনেক উপরে। পানামা খালকে কেন্দ্র করে শুধু অর্থনৈতিক কারণই আবর্তিত হয়নি বরং অনেকাংশে বিশ্ব রাজনীতিও একে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। তাই অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক দিয়ে পানামা খালের গুরুত্ব অত্যন্ত সুউচ্চে।
পানামা খাল:
পানামা প্রজাতন্ত্রের বুক চিরে বয়ে চলা কৃত্রিম খালটি জাহাজ চলাচলের জন্য ১৯০৪ সালে খনন করা হয়। যেটি সমগ্র বিশ্বের কাছে পানামা খাল হিসেবেই সমধিক পরিচিত। পানামা খাল আমেরিকা মহাদেশের স্থলভাগকে আলাদা করেছে। একইসাথে প্রশান্ত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগর কে একত্র করেছে। ১৯০৪ সালে এটির খনন কাজ শুরু হয় এবং ১৯১৪ সালে এর কাজ সমাপ্ত হয়। এটি খননে দায়িত্ব পালন করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর দৈর্ঘ্য ৬৫ কি.মি এবং প্রস্থ ৩০-৯০ মিটার পর্যন্ত। তবে গভীর জলভাগ থেকে এর দৈর্ঘ্য হিসেব করলে এর দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় প্রায় ৮২ কি.মি। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮৫ ফুট উঁচু ভূপৃষ্ঠ অতিক্রম করে পানামা খাল প্রবাহিত হয়েছে এবং অপর পাশের বিশাল জলরাশিকে একত্রিত করেছে। এত উঁচু দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কারণে বহু চ্যালেঞ্জ নিয়ে এটি নির্মাণ করা হয়েছে এবং বর্তমান সময় পর্যন্ত এর রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত জটিল। এমনকি এখান দিয়ে জাহাজ পারাপার করার জন্যও অনুসরণ করা হয় বিশেষ প্রক্রিয়া। পানামা খাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা আমেরিকার সাথে ইউরোপ,অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার বাণিজ্যকে নতুন রূপ দান করেছে।পানামা খালের কল্যাণে উত্তর আমেরিকার এক উপকূলের জাহাজ দক্ষিণ আমেরিকার অন্য উপকূলে যাওয়ার ক্ষেত্রে ৬৫০০ কিমি পথ কম পাড়ি দিতে হয়। আমেরিকা যাওয়ার ক্ষেত্রে এশিয়া,ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার জাহাজ সমূহকেও প্রায় ৩৫০০ কিমি পথ কম অতিক্রম করতে হয়।
পানামা খালের ইতিহাস:
আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকেই এ অঞ্চলে পর্তুগীজ,স্প্যানিশ,ফরাসী,ইংরেজ ও ডাচরা গমন করতে থাকে পাশাপাশি বাণিজ্যও সম্প্রসারণ করতে থাকে। ফলে এ অঞ্চলে যখন ইউরোপীয়দের বাণিজ্য গড়ে উঠে তখন এ-অঞ্চলে চলাচলের জন্য ও মালামাল পরিবহনের জন্য দক্ষিণ আমেরিকার বহু পথ ঘুরে উত্তর আমেরিকার উপকূলে যেতে হত। তাই এই দীর্ঘ পথকে সংক্ষিপ্ত করার জন্য চিন্তা করা শুরু হয়। সর্বপ্রথম ষোড়শ শতকে স্প্যানিশ অভিযাত্রী ভাস্কো নুয়েঞ্জ ডি বালবোয়াইন এ বিষয়ে মতপ্রকাশ করেন যে প্রশান্ত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে সংযোগ সাধন করা উচিত। কিন্তু তৎকালীন স্প্যানিশ রাজা তার এই প্রস্তাব কে উড়িয়ে দেন। তবে তার পরবর্তী রাজা পঞ্চম চার্লস তার এই প্রস্তাব কে বিবেচনা করার জন্য ১৫৩৪ সালে একটি কমিটি গঠন করেন। কমিটি এই প্রস্তাব কে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন পেশ করে। এই প্রতিবেদনে তারা উল্লেখ করেন যে এই অঞ্চলে একটি জাহাজ চলাচল করতে পারে এমন খাল খনন করা অসম্ভব।ফলে খাল খনন করার পরিকল্পনা ঐ-জায়গায়ই স্থগিত হয়ে যায়।
এরপর কেটে যায় বহুবছর । উনিশ শতকের শেষের দিকে এই অঞ্চলটি ফ্রান্সের নজরে আসে এবং ফ্রান্স খাল খননের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু এটি ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং কাজ কেননা এই অঞ্চলটি সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮৫ ফুট উঁচু তাছাড়া তখন পানামার এই অঞ্চলটি অত্যন্ত দুর্গম ও বন-জঙ্গলে পরিপূর্ণ।সকল প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ১৮৮১ সালে ফ্রান্স পানামা খালের খনন কাজ শুরু করে। কিন্তু কারিগরি দক্ষতার অভাব,প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা, শ্রমিকদের উচ্চ-মৃত্যুহার প্রভৃতি কারণে ফ্রান্স খাল খনন কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়।এই খাল খনন করতে গিয়ে ফ্রান্সের প্রায় বিশ হাজার শ্রমিকের মৃত্যু হয়।
এরপর আরও কিছুদিন অতিবাহিত হয়। এরপর এই খাল খননের জন্য এগিয়ে আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাদের উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষ কারিগর দিয়ে এটি নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কিন্তু বিপত্তি বাধে অন্য জায়গায়। তৎকালীন সময়ে এ অঞ্চলটি কলম্বিয়ার অধীনে ছিল। ফলে কলম্বিয়া-মার্কিনীদের মধ্যে রাজনৈতিক বোঝাপড়া না হওয়ায় এই কাজ আটকে যায়। ফলে ১৯০৩ সালে কলম্বিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদদে এক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় এবং এতে পানামা কলম্বিয়া আলাদা হয়ে স্বাধীনতা লাভ করে। তারপর ১৯০৪ সালেই পানামা সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে খাল খননের অনুমতি প্রধান করে। ফলে ১৯০৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে খাল খনন করা শুরু হয় এবং ১০ বছর খনন কাজ চলার পর ১৯১৪ সালে এটি সম্পন্ন হয়। এই খাল খনন করতে গিয়ে মার্কিনীদের সকল উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয় এবং বিরল রোগের জন্য প্রায় ৫৬০০ শ্রমিকের অকাল মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হয়।
কিভাবে পানামা খাল দিয়ে জাহাজ চলে?:
পানামা খাল যেহেতু সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮৫ ফুট উঁচু তাই অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে যে এত উপরে কিভাবে পানি ধরে রাখা হয়? আবার কিভাবেই এর উপর দিয়ে জাহাজ চলাচল করে? এখানকার পানি ধরে রাখা থেকে শুরু করে জাহাজ চলাচল পর্যন্ত সকল প্রক্রিয়াই কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। পানামা খালে মোট তিন জোড়া জল কপাট রয়েছে যে গুলো পানামা খালকে সমুদ্রপৃষ্ঠ ধাপে ধাপে ৮৫ ফুট পর্যন্ত উপরে তুলে দিয়েছে।
জলকপাটগুলো দুইটি ধাতব কব্জার দ্বারা তৈরি। প্রতিটি কব্জা ৭ ফুট মোটা এবং অবস্থান অনুযায়ী ৪৭ ফুট থেকে ৮২ ফুট পর্যন্ত উঁচু। জাহাজ চলাচলের সময় এসব কব্জা খুলে/বন্ধ করে পানির স্তর জাহাজ চলাচল উপযোগী করা হয়। পানামা খালে গাট্টন লেক ও গাইলার্ডকাট নামক দুইটি চ্যানেলে রয়েছে এই চ্যানেলেই মূলত এই জলকপাট সমূহ কাজ করে। পানামা খালে ঢুকার পূর্বেই জাহাজ সমুহকে ছাড়পত্র গ্রহণ করতে হয়। কারণ এই খাল দিয়ে বর্তমানে একই সময়ে মাত্র দুইটি জাহাজ চলাচল করতে পারে যদিও ২০১৪ সালের আগে পর্যন্ত এই খাল দিয়ে মাত্র একটি জাহাজ চলতে পারত। চ্যানেল দিয়ে জাহাজ পারাপারের জন্য চ্যানেলের উভয় পাশে অত্যন্ত শক্তিশালী ক্রেন কাজ করে।
তাছাড়াও পানি অপসারণ ও যোগান দিয়ে উঁচু স্থানে পানির স্তর সমান করার জন্য কাজ করে অত্যন্ত শক্তিশালী কয়েকটি পাম্প। চ্যানেলের প্রস্থ ১১০ ফুট হওয়ার করনে ১১০ ফুটের কম প্রশস্ত জাহাজ কেবল মাত্র প্রবেশ করতে পারে।তবে ১১০ ফুটের বেশী চওড়া জাহাজের পরিমাণ খুব কম।
পানামা খালের গুরুত্ব:
পানামা খাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব-পশ্চিম উপকূলে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ৮০০০ কিমি পথ কমিয়ে দিয়েছে। একইভাবে উত্তর আমেরিকার উপকূল থেকে দক্ষিণ আমেরিকার অপর উপকূলে যাওয়ার ক্ষেত্রে ৩৫০০ পথ কমিয়ে দিয়েছে। এই খাল দিয়ে বছরে প্রায় ৬০০০ জাহাজ চলাচল করে এবং দৈনিক গড়ে ৫০/৬০টি জাহাজ চলাচল করে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-গামী প্রায় ৫৫% জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করে। সমগ্র বিশ্ববাণিজ্যের ৫% সংঘটিত হয় এই পথে। পানামা খালের মাধ্যমে পানামা প্রজাতন্ত্র বছরে ৭০-৮০ কোটি মার্কিন ডলার রাজস্ব আয় করে যা পানামার জাতীয় আয়ের এক-তৃতীয়াংশ।
পানামা খাল নির্মাণের পর থেকে এর সকল রক্ষণাবেক্ষণের ও শুল্ক উত্তোলন সকল কিছুর দায়িত্ব ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। পানামা খালটি দুইটি অংশে বিভক্ত ছিল একটি অংশের দায়িত্ব পানামার হাতে থাকলেও বাকি অংশের দায়িত্ব ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। কিন্তু কার্যত সম্পূর্ণ নীতিনির্ধারণী দায়িত্বই ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। চুক্তি অনুযায়ী পানামা খালের রাজস্ব পানামার কোষাগারে জমা হওয়ার কথা থাকলেও পানামা তার রাজস্বের সামান্য অংশই পেত।ফলে ১৯৬০ সালে পানামাতে মার্কিন বিরোধী আন্দোলন দেখা দেয়। ফলে মার্কিনীরা পানামার সাথে চুক্তি করে ১৯৭৯ সালের মধ্যে ৬০% মালিকানা পানামার হাতে হস্তান্তর করার বিষয়ে একমত হয়। একইসাথে ১৯৭৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে পানামা খালকে আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে ঘোষণা করা হয় যাতে করে পানামা এই নৌপথের জাহাজ চলাচলের উপর ইচ্ছাকৃত কোন হস্তক্ষেপ করতে না পারে। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত পানামা কমিশনের অধীনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পানামা যৌথভাবে এটি নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু ১৯৯৯ সালে পানামা খালের পূর্ণ মালিকানা পানামার কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে পানামা খালের একমাত্র মালিক পানামা রাষ্ট্র। তারপরও পরোক্ষভাবে পানামা খালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একধরনের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ রয়ে গেছে। আর তা থাকার পিছনে কারণ হল মার্কিনীদের সামরিক ও বাণিজ্যিক সকল জাহাজ ও নৌযান পানামা খালের উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল।
তথ্যসূত্রঃ
http://www.kalerkantho.com/print-edition/oboshore/2015/07/04/240972