ধরুন আপনি এখন গুগলে কিছু একটা সার্চ করলেন। হয়তো কোনো রেসিপি, হয়তো কোনো খবর, অথবা কোনো পুরনো বন্ধুর নাম। গুগল এক সেকেন্ডের মধ্যে কোটি কোটি রেজাল্ট আপনার সামনে হাজির করে দিল। আপনি ভাবলেন, বাহ, ইন্টারনেটে তো সব কিছুই আছে।
কিন্তু আসলে আপনি ইন্টারনেটের কতটুকু দেখলেন জানেন? মোটামুটি চার থেকে পাঁচ শতাংশ।
বাকি পঁচানব্বই শতাংশ? সেটা আপনার গুগলে নেই। আপনার চোখে পড়ে না। এই বিশাল অংশটার নাম হলো ডিপ ওয়েব এবং ডার্ক ওয়েব। আর এই দুটো জিনিসকে অনেকে গুলিয়ে ফেলেন। আজকে সেটাই পরিষ্কার করব। পাশাপাশি জানব ডার্ক ওয়েব আসলে কী, কীভাবে কাজ করে, সেখানে কী হয়, এবং সত্যিকারের বিপদটা ঠিক কোথায়।
ইন্টারনেটের তিনটি স্তর
পুরো বিষয়টা বোঝার জন্য ইন্টারনেটকে একটা বিশাল সমুদ্র হিসেবে কল্পনা করুন।
সমুদ্রের উপরের অংশ যেটা আমরা খালি চোখে দেখতে পাই, সেটাই হলো সার্ফেস ওয়েব। গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব, নিউজ সাইট, ব্লগ, এই সব কিছু এখানেই। যে কেউ যেকোনো সাধারণ ব্রাউজার দিয়ে এখানে ঢুকতে পারে। সার্চ ইঞ্জিন এই জায়গাটাকে ইন্ডেক্স করে রাখে।
সমুদ্রের মাঝের স্তর, অর্থাৎ যেটা একটু গভীরে কিন্তু একেবারে তলায় নয়, সেটা হলো ডিপ ওয়েব। এখানে থাকে ব্যাংকের ইন্টারনাল সিস্টেম, হাসপাতালের রোগীর তথ্য, কর্পোরেট ইমেইল সার্ভার, পে-ওয়ালের পেছনের কন্টেন্ট। এগুলো সার্চ ইঞ্জিনে আসে না, তবে অবৈধ কিছু না। শুধু পাসওয়ার্ড বা বিশেষ অ্যাক্সেস লাগে।
আর সমুদ্রের একেবারে তলদেশ? সেটাই ডার্ক ওয়েব। এখানে ঢুকতে সাধারণ ব্রাউজার কাজ করে না। বিশেষ সফটওয়্যার লাগে, বিশেষ কনফিগারেশন লাগে। এবং এই জায়গাটাই আমাদের আজকের মূল আলোচনার বিষয়।
ডার্ক ওয়েব কীভাবে কাজ করে?
ডার্ক ওয়েবে ঢোকার জন্য সবচেয়ে পরিচিত টুল হলো টর ব্রাউজার, যেটার পুরো নাম The Onion Router। নামটা শুনলে মনে হতে পারে এটা কোনো সবজিওয়ালার ওয়েবসাইট, কিন্তু আসলে এই নামের পেছনে একটা চমৎকার প্রযুক্তিগত কারণ আছে।
পেঁয়াজের যেমন অনেকগুলো স্তর থাকে, এই ব্রাউজারটাও ঠিক তেমনিভাবে আপনার ইন্টারনেট ট্র্যাফিককে একাধিক স্তরে এনক্রিপ্ট করে পাঠায়। আপনি যখন কিছু সার্চ করেন, সেই তথ্য সরাসরি গন্তব্যে যায় না। বরং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা হাজারো কম্পিউটারের মধ্য দিয়ে ঘুরে ঘুরে যায়। ফলে কেউ সহজে বুঝতে পারে না আপনি কোথা থেকে কী দেখছেন।
ডার্ক ওয়েবের ওয়েবসাইটগুলোর ঠিকানাও আলাদা। সাধারণ সাইটের শেষে থাকে .com বা .org। ডার্ক ওয়েবের সাইটের শেষে থাকে .onion। এই ঠিকানাগুলো দেখতে অনেকটা এরকম: facebookcorewwwi.onion। হ্যাঁ, ফেসবুকেরও একটা অফিশিয়াল ডার্ক ওয়েব ভার্সন আছে, যেটা মূলত সেইসব দেশের মানুষদের জন্য যেখানে ফেসবুক সরকারিভাবে ব্লক।
এই প্রযুক্তিটা কিন্তু প্রথমে অপরাধীদের জন্য বানানো হয়নি। মার্কিন নৌবাহিনীর গবেষকরা ১৯৯০-এর দশকে এটা তৈরি করেছিলেন সরকারি গোয়েন্দা তথ্য সুরক্ষিত রাখতে এবং বিদেশে কর্মরত এজেন্টদের নিরাপদ যোগাযোগের জন্য।

সেখানে আসলে কী থাকে?
ডার্ক ওয়েব মানেই কালো বাজার, এই ধারণাটা পুরোপুরি সত্য নয়।
ডার্ক ওয়েবে অনেক বৈধ এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজও হয়। যেমন ধরুন, যেসব দেশে সরকার সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানকার সাংবাদিকরা ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করেন সোর্সের পরিচয় গোপন রেখে তথ্য পেতে। হুইসেলব্লোয়াররা দুর্নীতির তথ্য ফাঁস করেন এখান থেকে। সিরিয়া বা ইরানের মতো দেশে সাধারণ নাগরিকরা সেন্সরশিপ এড়িয়ে মুক্তভাবে কথা বলতে ব্যবহার করেন। এমনকি বিবিসি, নিউইয়র্ক টাইমস এর মতো নামকরা মিডিয়াও ডার্ক ওয়েবে নিজেদের মিরর সাইট রাখে।
কিন্তু এই ভালো দিকটার পাশাপাশি অন্ধকার দিকটাও আছে, এবং সেটা বেশ ভয়ঙ্কর।
ডার্ক ওয়েবের অন্ধকার কোণ
২০১১ সালে Silk Road নামে একটি মার্কেটপ্লেস চালু হয়েছিল ডার্ক ওয়েবে। এটাকে অনেকে বলে থাকেন ডার্ক ওয়েবের অ্যামাজন। কারণ এখানেও রেটিং সিস্টেম ছিল, সেলার ও কাস্টমার রিভিউ ছিল, কাস্টমার সার্ভিস ছিল। শুধু পার্থক্য একটাই, এখানে বিক্রি হতো মাদকদ্রব্য, জাল পাসপোর্ট, নকল মুদ্রা, আর হ্যাক করা অ্যাকাউন্টের তথ্য। পুরো লেনদেন চলত বিটকয়েনে।
২০১৩ সালে এফবিআই Silk Road বন্ধ করে দেয়, এর প্রতিষ্ঠাতা Ross Ulbricht-কে গ্রেফতার করে। কিন্তু Silk Road বন্ধ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই জন্ম নিল Silk Road 2.0, তারপর AlphaBay, তারপর আরও অনেক কিছু। একটা বন্ধ হলে আরেকটা খোলে। এটা যেন এক হাইড্রার মাথার মতো, কাটলে আরও দুটো গজায়।
আজকে ডার্ক ওয়েবের মার্কেটগুলোতে পাওয়া যায় বিভিন্ন দেশের পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র, চুরি করা ক্রেডিট কার্ডের তথ্য, র্যানসমওয়্যার ও হ্যাকিং টুল, চোরাই অস্ত্র, বিভিন্ন সরকারি ও কর্পোরেট ডেটাবেজের তথ্য এবং সাইবার ক্রাইম সার্ভিস, যেটাকে বলে Hacking-as-a-Service।
সবচেয়ে ভয়াবহ যে বিষয়টা সেটা হলো, চুরি যাওয়া ব্যক্তিগত তথ্য এখানে অত্যন্ত সস্তায় বিক্রি হয়। একটা সম্পূর্ণ পরিচয় প্যাকেজ, অর্থাৎ কারো নাম, ঠিকানা, জন্মতারিখ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর সব মিলিয়ে মাত্র কয়েক ডলারে পাওয়া যায়। এটাকে বলে “Fullz।”
বাংলাদেশের সাথে সংযোগ আছে?
এই প্রশ্নটা অনেকের মাথায় আসতে পারে। আমরা তো ছোট দেশ, আমাদের সাথে ডার্ক ওয়েবের কী সম্পর্ক?
আসলে সম্পর্ক আছে, এবং বেশ সরাসরি সম্পর্ক।
২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৮১ মিলিয়ন ডলার চুরির ঘটনা মনে আছে? সেই সাইবার হামলার পরিকল্পনা এবং যোগাযোগের একটা বড় অংশ ডার্ক ওয়েবের এনক্রিপ্টেড নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে হয়েছিল বলে তদন্তকারীরা মনে করেন। এটা এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাইবার ব্যাংক ডাকাতির ঘটনাগুলোর একটি।
এ ছাড়াও, বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্য ফাঁস হওয়ার ঘটনা বিভিন্ন সময় ঘটেছে। সেসব তথ্য পরে ডার্ক ওয়েবের মার্কেটে বিক্রি হয়েছে কিনা তার পূর্ণ নিশ্চয়তা না থাকলেও সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আরেকটা বিষয় হলো, বাংলাদেশে ডিজিটাল প্রতারণা বাড়ছে। অনলাইনে বিভিন্ন সিম রেজিস্ট্রেশন, ভোটার আইডি তথ্য বিক্রির অভিযোগ মাঝে মাঝেই উঠে আসে। এগুলোর একটা বড় অংশ ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমেই ছড়ায়।
একটা ভুল ধারণা ভাঙা দরকার
ডার্ক ওয়েব মানেই খুনের ভাড়া নেওয়া যায়, এরকম একটা ধারণা বিভিন্ন সিনেমা বা থ্রিলার গল্পের কারণে তৈরি হয়েছে।
সত্যিটা হলো, এই ধরনের বেশিরভাগ সাইটই আসলে স্ক্যাম। মানুষকে ভয় দেখিয়ে বা লোভ দেখিয়ে টাকা নেওয়াই এগুলোর আসল উদ্দেশ্য। অনেক গবেষক ও সাংবাদিক এই ধরনের সাইটে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখেছেন যে, এগুলোর বেশিরভাগই পরিষেবা দেয় না। তারা শুধু বিটকয়েন নেয় এবং গায়েব হয়ে যায়।
তবে এর মানে এই নয় যে ডার্ক ওয়েব নিরীহ। মাদক, অস্ত্র, এবং ডেটা বিক্রির বিষয়টা একদম বাস্তব এবং সেখানে সত্যিকারের অপরাধ হচ্ছে।
ডার্ক ওয়েবে ঢুকলে কি ধরা পড়বেন?
এটা অনেকের মনেই আসে। টর ব্রাউজার ডাউনলোড করে ডার্ক ওয়েব ব্রাউজ করা বাংলাদেশে আইনত নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে কোনো অবৈধ কাজে যুক্ত হওয়া অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
কিন্তু সমস্যা হলো, ডার্ক ওয়েবে অপরাধীরা সব সময় নতুন নতুন পদ্ধতিতে তাদের পরিচয় লুকিয়ে রাখে। একটা ভুল করলে, যেমন ভিপিএন ছাড়া টর ব্যবহার করলে বা ব্যক্তিগত তথ্য কোথাও দিলে, আপনার আইপি এড্রেস বের হয়ে যেতে পারে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও এখন অনেক বেশি দক্ষ হয়েছে। এফবিআই, ইউরোপোল নিয়মিত বড় বড় ডার্ক ওয়েব অপারেশন চালায়। ২০২১ সালে DarkMarket নামে বিশ্বের তখনকার সবচেয়ে বড় ডার্ক ওয়েব মার্কেটপ্লেসটি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং এর অ্যাডমিনকে গ্রেফতার করা হয়। এতে ১৭০ মিলিয়নেরও বেশি ইউরো মূল্যের লেনদেনের তথ্য উদ্ধার হয়।
সাধারণ মানুষের কি কোনো ঝুঁকি আছে?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বলতে চাই।
আপনি কোনোদিন ডার্ক ওয়েবে না গেলেও ডার্ক ওয়েব আপনার কাছে আসতে পারে।
কীভাবে? ধরুন কোনো একটি অ্যাপ বা ওয়েবসাইট হ্যাক হলো যেখানে আপনার অ্যাকাউন্ট আছে। সেই ডেটা চলে যেতে পারে ডার্ক ওয়েবের কোনো মার্কেটে। আপনার ইমেইল, ফোন নম্বর, এমনকি ব্যাংক তথ্যও।
এটা পরীক্ষা করার একটা সহজ উপায় আছে। haveibeenpwned.com এই সাইটে গিয়ে আপনার ইমেইল দিলে জানতে পারবেন আপনার তথ্য এ পর্যন্ত কোনো ডেটা ব্রিচের শিকার হয়েছে কিনা। অনেকে নিজেও জানেন না যে তাদের তথ্য বছরের পর বছর ধরে অনলাইনে ঘুরছে।
নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে যা করা উচিত সেগুলো আসলে খুব সহজ। প্রতিটি সাইটে আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখুন। অচেনা লিংকে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকুন। এবং নিয়মিত আপনার গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড বদলান।
শেষ কথা
ডার্ক ওয়েব নিয়ে কৌতূহল থাকাটা স্বাভাবিক। মানুষ স্বভাবতই অজানার প্রতি আকৃষ্ট হয়, বিশেষত যখন সেটা নিয়ে রহস্যের গন্ধ থাকে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ডার্ক ওয়েবের সবচেয়ে বড় বিপদটা সিনেমার মতো নাটকীয় নয়। এটা অনেক বেশি বাস্তব এবং অনেক বেশি কাছের। আপনার ডেটা, আপনার পরিচয়, আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, এগুলো কোনো একটা কর্পোরেট ডেটা ব্রিচের কারণে ডার্ক ওয়েবে চলে যেতে পারে এবং আপনি টেরও পাবেন না।
ইন্টারনেট একটা বিশাল জায়গা। এর বেশিরভাগটাই আমরা দেখি না। আর যেটা দেখি না, সেটা সম্পর্কে সচেতন থাকাটাই এই ডিজিটাল যুগে নিজেকে নিরাপদ রাখার প্রথম ধাপ।
Comments are closed.