ক্রিপ্টোকারেন্সি থেকে ব্লকচেইন: আসলে কীভাবে কাজ করে?
২০০৯ সালের কথা।
পৃথিবীজুড়ে তখন অর্থনৈতিক মন্দা চলছে। আমেরিকার বড় বড় ব্যাংক ডুবে গেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। সরকার ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে কোটি কোটি ডলার ঢালছে, যে ডলার এসেছে সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা থেকে।
এই পরিস্থিতিতে ইন্টারনেটে একটি অজানা মানুষ একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেন। নাম দিলেন সাতোশি নাকামোতো। পরিচয়? অজানা। দেশ? অজানা। বয়স? অজানা।
সেই গবেষণাপত্রে তিনি বললেন, ব্যাংক ছাড়া, সরকার ছাড়া, কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়া মানুষ সরাসরি একে অপরকে টাকা পাঠাতে পারবে। কেউ নিয়ন্ত্রণ করবে না, কেউ আটকাতে পারবে না।
সেই প্রস্তাবের নাম ছিল বিটকয়েন।
আর যে প্রযুক্তির উপর দাঁড়িয়ে এই স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তার নাম ব্লকচেইন।
সেই থেকে প্রায় দেড় দশক কেটে গেছে। বিটকয়েনের দাম কখনো শূন্যের কোঠায় নেমেছে, কখনো লক্ষ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মানুষ কোটিপতি হয়েছেন, আবার সর্বস্বান্তও হয়েছেন। খবরের কাগজে প্রতিদিন ক্রিপ্টোর নাম আসছে।
কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ এখনো জানেন না আসলে এটা কী। কীভাবে কাজ করে। কেন এটা নিয়ে এত হইচই।
আজকে সেটাই বোঝানোর চেষ্টা করব। কোনো প্রযুক্তিগত জটিলতা নেই, কোনো কোড নেই। শুধু গল্প আর উদাহরণ।
প্রথমে বুঝি, ব্যাংক আসলে কী করে
ক্রিপ্টোকারেন্সি বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে এটা কোন সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছে।
ধরুন আপনি ঢাকায় আছেন, আপনার বন্ধু আছেন লন্ডনে। আপনি তাকে পাঁচ হাজার টাকা পাঠাতে চান।
আপনি কী করবেন? ব্যাংকে যাবেন, অথবা বিকাশ বা ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন ব্যবহার করবেন। তারা মাঝখানে থেকে কাজটা করে দেবে।
কিন্তু এই মাঝখানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু সমস্যা আছে।
প্রথমত, তারা ফি নেয়। কখনো কখনো বেশ ভালো পরিমাণ ফি। আন্তর্জাতিক লেনদেনে পাঁচ থেকে দশ শতাংশ পর্যন্ত কেটে নেওয়া অস্বাভাবিক নয়।
দ্বিতীয়ত, তারা সময় নেয়। ব্যাংক থেকে ব্যাংকে টাকা যেতে দুই থেকে পাঁচ দিন লাগতে পারে।
তৃতীয়ত, তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যেকোনো কারণে আপনার অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দিতে পারে। লেনদেন আটকে দিতে পারে।
চতুর্থত, তারা ভুল করতে পারে। ব্যাংক দেউলিয়া হতে পারে, হ্যাক হতে পারে, ভুল লেনদেন হতে পারে।
সাতোশি নাকামোতো এই চারটি সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিলেন। তার প্রশ্ন ছিল, মাঝখানে কাউকে না রেখে কি দুইজন মানুষ সরাসরি লেনদেন করতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি যে সমাধান বের করলেন সেটাই ব্লকচেইন।
বিশ্বাসের সমস্যা: কেন মাঝখানে কেউ লাগে?
একটু ভাবুন। আপনি কেন ব্যাংককে বিশ্বাস করেন?
কারণ ব্যাংক একটি রেকর্ড রাখে। আপনার অ্যাকাউন্টে কত টাকা আছে, কখন কত টাকা এসেছে, কখন কত গেছে। এই হিসাবের বইটা ব্যাংকের কাছে আছে।
আপনি যখন কাউকে টাকা পাঠান, ব্যাংক সেই হিসাবের বইতে লেখে, অমুকের অ্যাকাউন্ট থেকে এত টাকা কমল, তমুকের অ্যাকাউন্টে এত টাকা বাড়ল।
এই হিসাবের বইটাকে বলে লেজার। এই লেজার ব্যাংকের কাছে থাকে বলে আমরা ব্যাংককে বিশ্বাস করি।
কিন্তু এখানেই সমস্যা। এই লেজার একটাই জায়গায় আছে, ব্যাংকের কাছে। যদি ব্যাংক দুর্নীতিবাজ হয়? যদি হ্যাকাররা সেই লেজার পরিবর্তন করে দেয়? যদি সরকার বলে ওই লেজার জব্দ করো?

সাতোশি নাকামোতো ভাবলেন, এই লেজারটা যদি একটা জায়গায় না রেখে লক্ষ লক্ষ জায়গায় রাখা যায়? সবার কাছে একই কপি থাকে? একটা পরিবর্তন করতে হলে সবার কপি একসাথে পরিবর্তন করতে হবে, যেটা প্রায় অসম্ভব?
এই ধারণাটাই ব্লকচেইনের মূল ভিত্তি।
ব্লকচেইন কী, একটা সহজ উদাহরণ দিয়ে বুঝি
কল্পনা করুন আপনার মহল্লায় একটা পুকুর আছে। সেই পুকুর কার, কে মাছ ধরতে পারবে, এই নিয়ে বিবাদ এড়াতে মহল্লার সবাই মিলে একটা সিদ্ধান্ত নিল।
প্রতিটি লেনদেন একটা খাতায় লেখা হবে। কিন্তু সেই খাতা একজনের কাছে থাকবে না। মহল্লার প্রতিটি বাড়িতে একটা করে কপি থাকবে। একটা নতুন লেনদেন লেখার আগে মহল্লার বেশিরভাগ মানুষ সম্মত হতে হবে যে এটা সত্যি।
যদি কেউ চুপিচুপি একটা কপি বদলে দেয়, বাকি সবার কপির সাথে মিলবে না। তখন সেই পরিবর্তন বাতিল হয়ে যাবে।
এই পুরো ব্যবস্থাটাই ব্লকচেইনের মূল ধারণা।
এখন একটু প্রযুক্তিগতভাবে বলি। ব্লকচেইনে প্রতিটি লেনদেন লেখা হয় একটি ব্লকে। সেই ব্লকে থাকে কে কাকে কত টাকা পাঠাল সেই তথ্য, সময়, এবং একটি বিশেষ কোড।
সেই কোড তৈরি হয় আগের ব্লকের তথ্য দিয়ে। মানে প্রতিটি ব্লক আগের ব্লকের সাথে জুড়ে আছে। এভাবে ব্লকের পর ব্লক জুড়ে একটা শিকলের মতো তৈরি হয়।
সেটাই ব্লকচেইন, ব্লকের শিকল।
এই শিকলের একটা ব্লক পরিবর্তন করতে হলে তার পরের সব ব্লক পরিবর্তন করতে হবে। আর যেহেতু লক্ষ লক্ষ কম্পিউটারে এই শিকলের কপি আছে, সবগুলো একসাথে পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব।
এই কারণেই ব্লকচেইনকে বলা হয় ট্যাম্পার প্রুফ, অর্থাৎ যেটা সহজে নষ্ট করা যায় না।
বিটকয়েন কীভাবে তৈরি হয়: মাইনিংয়ের গল্প
এবার একটা প্রশ্ন আসে। এই ব্লকচেইন কে চালায়? কার কম্পিউটারে থাকে এই লেজার?
উত্তর হলো, পৃথিবীর যেকোনো মানুষ এই নেটওয়ার্কে যোগ দিতে পারেন। যারা যোগ দেন তাদের বলে নোড।
কিন্তু এই নোডগুলো কেন এই কাজ করবে? তাদের লাভ কী?
এখানেই আসে মাইনিংয়ের গল্প।
প্রতিটি নতুন ব্লক তৈরির আগে একটা কঠিন গণিতের ধাঁধা সমাধান করতে হয়। পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ কম্পিউটার সেই ধাঁধা সমাধান করার চেষ্টা করে। যে প্রথম সমাধান করতে পারবে সে নতুন ব্লকটা ব্লকচেইনে যোগ করার অধিকার পাবে।
পুরস্কার হিসেবে সে পাবে কিছু বিটকয়েন।
এই প্রক্রিয়াটাই মাইনিং। যেভাবে সোনার খনিতে কষ্ট করে সোনা তোলা হয়, সেভাবে কম্পিউটারের শক্তি খরচ করে বিটকয়েন তোলা হয়।
এখানে একটা চমৎকার ব্যবস্থা আছে। ধাঁধাটা এত কঠিন যে কোনো একটা কম্পিউটার সহজে সমাধান করতে পারে না। লক্ষ লক্ষ কম্পিউটার মিলে চেষ্টা করে। এতে করে কোনো একটা কম্পিউটার বা গোষ্ঠী পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
তবে এই মাইনিং প্রক্রিয়ার একটা বড় সমালোচনা আছে। এটা প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ করে। বিটকয়েন মাইনিংয়ে প্রতি বছর যে পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হয়, সেটা অনেক ছোট দেশের বার্ষিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের চেয়েও বেশি। পরিবেশের জন্য এটা একটা বড় সমস্যা।
ইথেরিয়াম এবং স্মার্ট কন্ট্র্যাক্ট: ব্লকচেইনের দ্বিতীয় বিপ্লব
বিটকয়েন শুধু টাকা পাঠানোর জন্য। কিন্তু ২০১৫ সালে এলো ইথেরিয়াম, যেটা ব্লকচেইনকে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রায় নিয়ে গেল।
ইথেরিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা ভিটালিক বুটেরিন, যিনি এই প্রজেক্ট শুরু করেছিলেন মাত্র উনিশ বছর বয়সে, তিনি একটি প্রশ্ন করলেন। ব্লকচেইনে শুধু টাকার তথ্য না রেখে যদি প্রোগ্রাম রাখা যায়?
সেই প্রোগ্রামকে বলে স্মার্ট কন্ট্র্যাক্ট।
উদাহরণ দিয়ে বোঝাই। ধরুন আপনি একটা বাড়ি কিনতে চান। সাধারণত এই প্রক্রিয়ায় লাগে উকিল, দলিল লেখক, ব্যাংক, নিবন্ধন অফিস। প্রতিটি ধাপে সময় লাগে, টাকা লাগে, ঝামেলা লাগে।
স্মার্ট কন্ট্র্যাক্ট দিয়ে এটা অনেক সহজ হতে পারে। চুক্তির শর্তগুলো কোডে লেখা থাকবে। আপনি টাকা পাঠালেন, কোড স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করল সব শর্ত পূরণ হয়েছে কিনা, এবং বাড়ির মালিকানা আপনার নামে চলে গেল। কোনো মধ্যস্থতাকারী লাগল না।
আরেকটা উদাহরণ। ধরুন আপনি একজন লেখক। আপনার একটা গান আছে। যতবার সেই গান বাজবে, আপনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রয়্যালটি পাবেন। কোনো রেকর্ড লেবেলের দরকার নেই, কোনো মধ্যস্থতাকারীর দরকার নেই।
এই স্মার্ট কন্ট্র্যাক্টের ধারণা থেকেই পরে জন্ম নিয়েছে ডিফাই, এনএফটি, ডাও সহ অনেক নতুন ধারণা।
এনএফটি: ডিজিটাল মালিকানার বিপ্লব নাকি বুজরুকি?
২০২১ সালে হঠাৎ একটা শব্দ সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ল। এনএফটি।
নন ফাঞ্জিবল টোকেন। নামটা শুনলেই মাথা ঘুরে, কিন্তু ধারণাটা আসলে সহজ।
ফাঞ্জিবল মানে হলো বিনিময়যোগ্য। একটা একশো টাকার নোট আরেকটা একশো টাকার নোটের সমান। আপনি যেকোনো একটা নিলেই হয়, মূল্য একই।
নন ফাঞ্জিবল মানে হলো অপ্রতিস্থাপনযোগ্য। মোনালিসার একটাই আসল ছবি আছে। সেটার মতো হুবহু আরেকটা ছবি আঁকলে সেটা আসল হবে না।
এনএফটি হলো ডিজিটাল দুনিয়ায় এই একক মালিকানার প্রমাণ। একটি ছবি, একটি গান, একটি ভিডিও, যেকোনো ডিজিটাল সম্পদের একক মালিক আপনি এটা ব্লকচেইনে রেকর্ড করা থাকে।
২০২১ সালে বিপলে নামের একজন ডিজিটাল শিল্পী তার একটি ছবি এনএফটি হিসেবে নিলামে বিক্রি করলেন। দাম উঠল ৬৯ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় সাতশো কোটি টাকার বেশি।
ডিজিটাল একটা ছবির জন্য এত দাম দেখে পৃথিবী হতবাক হয়ে গেল।
তারপর এনএফটির বুম এলো। সবাই এনএফটি বানাতে শুরু করল, কিনতে শুরু করল। দাম লাখ থেকে কোটি ডলারে উঠল।
তারপর বুম শেষ হলো। বেশিরভাগ এনএফটির দাম শূন্যের কোঠায় নেমে এলো।
এটা কি এনএফটির ধারণাটা ভুল প্রমাণ করে? না। ধারণাটা ঠিকই আছে। ডিজিটাল মালিকানার প্রমাণ একটি বাস্তব প্রয়োজন। সমস্যা হলো মানুষ লোভে পড়ে অযোগ্য জিনিসকে মূল্যবান বানাতে চেয়েছিল।
ক্রিপ্টোকারেন্সির ধরনগুলো: শুধু বিটকয়েন নয়
অনেকে মনে করেন ক্রিপ্টো মানেই বিটকয়েন। কিন্তু আজকে হাজার হাজার ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে।
বিটকয়েন হলো প্রথম এবং সবচেয়ে বড়। এটাকে ডিজিটাল সোনা বলা হয়। সংখ্যা সীমিত, মোট একুশ মিলিয়নের বেশি বিটকয়েন কখনো তৈরি হবে না। এই সীমাবদ্ধতাই এটাকে মূল্যবান করে তোলে।
ইথেরিয়াম হলো দ্বিতীয় বৃহত্তম। এটা শুধু টাকা নয়, এটা একটা প্ল্যাটফর্ম। এর উপর দাঁড়িয়ে অ্যাপ বানানো যায়, স্মার্ট কন্ট্র্যাক্ট চালানো যায়।
স্টেবলকয়েন হলো একটি আলাদা ধরনের ক্রিপ্টো যার মূল্য সাধারণত ডলারের সাথে বাঁধা থাকে। টিথার বা ইউএসডিসি এই ধরনের কয়েন। এগুলোর দাম উঠানামা করে না, ফলে ব্যবহারিক কাজে বেশি সুবিধাজনক।
আর আছে অগণিত আলটকয়েন, যেগুলো বিভিন্ন উদ্দেশ্যে তৈরি। কিছু সত্যিকারের প্রয়োজন মেটায়, কিছু শুধু ফটকাবাজির জন্য।
আর আছে মিমকয়েন। ডোজকয়েন শুরু হয়েছিল রসিকতা হিসেবে, একটি কুকুরের মিম ছবি দিয়ে। কিন্তু একসময় এর মোট মূল্য পঞ্চাশ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পৃথিবীর অনেক বড় কোম্পানির চেয়েও বেশি।
এটা বলে দেয় ক্রিপ্টোর দুনিয়াটা কতটা অদ্ভুত এবং কতটা অনিশ্চিত।
ক্রিপ্টোর বাস্তব সমস্যাগুলো
ক্রিপ্টোকারেন্সির পক্ষে অনেক কথা বলা হয়। কিন্তু সমস্যাগুলোও কম নয়।
প্রথম সমস্যা হলো দামের অস্থিরতা। বিটকয়েন একদিন পঞ্চাশ শতাংশ বাড়তে পারে, আবার পঞ্চাশ শতাংশ কমতে পারে। কোনো স্থিতিশীলতা নেই। এই কারণে এটাকে মুদ্রা হিসেবে দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করা কঠিন। আপনি যদি বিটকয়েনে বেতন পান, সকালে যা মূল্য ছিল বিকেলে তা নাও থাকতে পারে।
দ্বিতীয় সমস্যা হলো জটিলতা। ক্রিপ্টো ব্যবহার করতে হলে ওয়ালেট বুঝতে হবে, প্রাইভেট কি বুঝতে হবে, গ্যাস ফি বুঝতে হবে। ভুল করলে টাকা চিরতরে হারিয়ে যাবে। একজন মানুষ তার ওয়ালেটের পাসওয়ার্ড ভুলে গিয়ে তিনশো মিলিয়ন ডলারের বিটকয়েন চিরতরে হারিয়েছেন।
তৃতীয় সমস্যা হলো অপরাধের ব্যবহার। ক্রিপ্টোর অনামিকতার সুযোগ নিয়ে মাদক ব্যবসা, র্যানসমওয়্যার, মানি লন্ডারিং হচ্ছে। এটা সরকারগুলোর বড় মাথাব্যথার কারণ।
চতুর্থ সমস্যা হলো স্ক্যাম। ক্রিপ্টোর দুনিয়ায় প্রতারণা অসাধারণ পরিমাণে হয়। পাম্প অ্যান্ড ডাম্প, রাগ পুল, পঞ্জি স্কিম, নানা ধরনের প্রতারণায় প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার মানুষ হারাচ্ছেন। বাংলাদেশেও এই ধরনের প্রতারণার খবর প্রতিনিয়ত আসছে।
বাংলাদেশে ক্রিপ্টো: কী অবস্থা?
বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচা এবং লেনদেন আইনত নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৭ সালে একটি সার্কুলারে স্পষ্ট করেছে যে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেন করলে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে শাস্তি হতে পারে।
তবু অনেকে ভিপিএন ব্যবহার করে বিদেশি এক্সচেঞ্জে ট্রেড করেন। এটা ঝুঁকিপূর্ণ, শুধু আইনগতভাবে নয়, আর্থিকভাবেও।
ব্লকচেইন প্রযুক্তিকে অবশ্য বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহারের কথা ভাবছে। ভূমি নিবন্ধন, সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল পরিচয় যাচাই এই ক্ষেত্রে ব্লকচেইন প্রযুক্তি বেশ কার্যকর হতে পারে।
ব্লকচেইনের ভবিষ্যৎ: শুধু টাকা নয়
এটা বোঝা দরকার যে ব্লকচেইন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি এক জিনিস নয়।
ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো ব্লকচেইনের একটি ব্যবহার। কিন্তু ব্লকচেইন প্রযুক্তি আরও অনেক কাজে আসতে পারে।
সাপ্লাই চেইনে ব্লকচেইন ব্যবহার করলে একটি পণ্য কোথা থেকে এসেছে, কোথায় কোথায় গেছে সেটা সম্পূর্ণ স্বচ্ছভাবে ট্র্যাক করা যায়। ওষুধের নকল রোধ করতে, খাদ্যের উৎস নিশ্চিত করতে এটা ব্যবহার হচ্ছে।

স্বাস্থ্যসেবায় রোগীর সম্পূর্ণ চিকিৎসা ইতিহাস ব্লকচেইনে রাখলে যেকোনো ডাক্তার যেকোনো জায়গা থেকে সেটা দেখতে পারবেন, এবং রোগী নিজে নিয়ন্ত্রণ করবেন কে দেখতে পাবে।
নির্বাচন ব্যবস্থায় ব্লকচেইন ব্যবহার করলে ভোট জালিয়াতি প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। প্রতিটি ভোট রেকর্ড হবে, বদলানো যাবে না, গণনায় ভুল হবে না।
শিক্ষায় সার্টিফিকেট যাচাইয়ে ব্লকচেইন ব্যবহার করলে জাল সার্টিফিকেটের সমস্যা দূর হবে।
শেষ কথা: বিপ্লব নাকি বুদবুদ?
ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে দুটো চরম মত আছে।
একদল বলেন এটা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আর্থিক বিপ্লব। ব্যাংক ব্যবস্থা, সরকারি নিয়ন্ত্রণ সব কিছু পাল্টে যাবে। সাধারণ মানুষ আর্থিক স্বাধীনতা পাবে।
আরেকদল বলেন এটা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফটকাবাজি। কোনো বাস্তব মূল্য নেই, শুধু মানুষের বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে আছে। একদিন সব ধসে পড়বে।
সত্যিটা হলো দুটোর মাঝামাঝি কোথাও।
ক্রিপ্টোকারেন্সি হয়তো পুরোপুরি ব্যাংক ব্যবস্থা প্রতিস্থাপন করবে না। কিন্তু ব্লকচেইন প্রযুক্তি পৃথিবীকে বদলে দেবে, এটা প্রায় নিশ্চিত। শুধু প্রশ্ন হলো কোন কোন ক্ষেত্রে, কতটুকু।
আর বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে একটাই কথা। যেটা বোঝেন না সেখানে টাকা দেবেন না। ক্রিপ্টোর দুনিয়ায় প্রতিদিন মানুষ কোটিপতি হচ্ছেন, আবার সর্বস্বান্তও হচ্ছেন। এখানে সাফল্যের কোনো নিশ্চয়তা নেই।
কিন্তু এই প্রযুক্তিটা বোঝা দরকার। কারণ আগামী দশ বিশ বছরে ব্লকচেইন প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অনেক কিছু পরিবর্তন করবে, চাই বা না চাই।
সাতোশি নাকামোতো ২০১০ সালের পর থেকে আর কোনো বার্তা দেননি। তার পরিচয় আজও রহস্য। কিন্তু তিনি যে বীজ বুনে গেছেন সেটা এখন একটা বিশাল গাছ হয়ে উঠেছে, এবং সেই গাছের শেষ রূপ কেমন হবে সেটা এখনো কেউ জানে না।
Comments are closed.