কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান সহজ ভাষায়: বিড়াল কি জীবিত না মৃত?

ধরুন আপনাকে কেউ জিজ্ঞেস করল, একটা বিড়াল কি একই সময়ে জীবিত এবং মৃত দুটোই হতে পারে?

আপনি হয়তো বলবেন, এটা কেমন আজগুবি প্রশ্ন? বিড়াল হয় বেঁচে আছে, নয়তো মরে গেছে। দুটো একসাথে কীভাবে সম্ভব?

কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের একটি শাখা বলছে, এই অসম্ভব ব্যাপারটাই সত্যি। শুধু সত্যি না, এটাই মহাবিশ্বের মূল নিয়ম।

সেই শাখার নাম কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান।

এই নামটা শুনলেই অনেকের মনে ভয় ঢোকে। মনে হয় এটা বোধহয় শুধু বিজ্ঞানীদের জন্য, খুব কঠিন গণিত আর অদ্ভুত সব সূত্র দিয়ে ভরা। সাধারণ মানুষের এটা বোঝার কথা না।

কিন্তু আজকে আমি সেই ভয়টা কাটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব। কোনো গণিত নেই, কোনো জটিল সূত্র নেই। শুধু গল্প আর উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করব কোয়ান্টাম দুনিয়াটা আসলে কেমন।

এবং সবচেয়ে মজার প্রশ্নটা দিয়েই শুরু করব। সেই বিড়ালের গল্প দিয়ে।

আগে বুঝি সাধারণ দুনিয়ার নিয়ম

কোয়ান্টাম দুনিয়া বোঝার আগে একটু ভাবি আমরা প্রতিদিন যে দুনিয়ায় বাস করি সেটা কেমন।

আপনি এখন যেখানে বসে আছেন, সেটা একটি নির্দিষ্ট জায়গা। আপনি একই সময়ে দুই জায়গায় থাকতে পারবেন না। আপনার হাতের চায়ের কাপটা হয় গরম, নয়তো ঠান্ডা। দুটো একসাথে হতে পারে না। আকাশে একটা বল ছুড়লে সেটা একটা নির্দিষ্ট পথে যাবে, আপনি আগে থেকেই হিসাব করে বলতে পারবেন কোথায় পড়বে।

এই দুনিয়াটা বোঝা সহজ। কারণ এখানে সব কিছু নিয়মকানুন মেনে চলে। আইজ্যাক নিউটন তিনশো বছর আগে এই নিয়মগুলো লিখে গেছেন এবং সেগুলো আজও কাজ করে।

কিন্তু সমস্যা হলো, এই নিয়মগুলো শুধু বড় জিনিসের জন্য কাজ করে। বল, গাড়ি, গ্রহ, তারা, এগুলোর জন্য নিউটনের নিয়ম ঠিকঠাক চলে।

কিন্তু যখন আমরা অনেক ছোট জিনিসের দিকে যাই, পরমাণুর দিকে, পরমাণুর ভেতরের কণার দিকে, তখন হঠাৎ সব নিয়ম উল্টেপাল্টে যায়।

সেই ছোট দুনিয়ার নিয়মই হলো কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান।

পরমাণু কতটা ছোট, একটু অনুভব করি

কোয়ান্টাম দুনিয়া মানে পরমাণুর দুনিয়া। তাই একটু বোঝা দরকার পরমাণু জিনিসটা আসলে কতটা ছোট।

আপনার হাতের বুড়ো আঙুলের নখের মাথায় যতটুকু নখ আছে, সেখানে যদি পরমাণু সাজিয়ে রাখা হয়, তাহলে প্রায় এক মিলিয়ন পরমাণু পাশাপাশি বসবে। মানে দশ লক্ষটা।

এত ছোট কিছু আমরা সরাসরি দেখতে পারি না। সবচেয়ে শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপ দিয়েও পরমাণুর ভেতরের কণাগুলো সরাসরি দেখা যায় না।

বিজ্ঞানীরা পরোক্ষভাবে, বিভিন্ন পরীক্ষা করে, এই কণাগুলোর আচরণ বোঝার চেষ্টা করেছেন। আর যা বুঝেছেন তাতে তারা নিজেরাই প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি।

ইলেকট্রনের অদ্ভুত খেলা: একই সাথে দুই জায়গায়

পরমাণুর ভেতরে থাকে ইলেকট্রন নামের একটি কণা। এই ইলেকট্রন নিয়ে বিজ্ঞানীরা একটি পরীক্ষা করলেন।

পরীক্ষাটার নাম ডাবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট। একটু কল্পনা করুন।

ধরুন একটা দেয়াল আছে। সেই দেয়ালে দুটো সরু ফুটো আছে, পাশাপাশি। দেয়ালের ওপারে একটা স্ক্রিন আছে যেটা ইলেকট্রন এসে লাগলে দাগ রেখে যায়।

এখন একটা একটা করে ইলেকট্রন ছোড়া হলো সেই দেয়ালের দিকে।

আপনি কী ভাবছেন? ইলেকট্রন হয় বাঁয়ের ফুটো দিয়ে যাবে, নয়তো ডানের ফুটো দিয়ে যাবে। তাই না? কারণ একটা কণা তো একই সময়ে দুই ফুটো দিয়ে যেতে পারে না।

কিন্তু স্ক্রিনে যে দাগ পড়ল সেটা দেখে বিজ্ঞানীরা হতবাক হয়ে গেলেন। দাগগুলো এমন প্যাটার্নে পড়েছে যেটা তখনই সম্ভব যখন প্রতিটি ইলেকট্রন একই সময়ে দুটো ফুটো দিয়েই গেছে।

দুটি সরু ফুটো দিয়ে একসাথে যাওয়া উজ্জ্বল ইলেকট্রন এবং স্ক্রিনে ইন্টারফারেন্স প্যাটার্ন, নীল ও সায়ান রঙের কণার পথ
একটাই কণা, দুটো ফুটো — ডাবল স্লিট পরীক্ষা বদলে দিয়েছিল পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাস

 

মানে একটা ইলেকট্রন একই সাথে দুই জায়গায় ছিল।

এটা কি সম্ভব? আমাদের সাধারণ বুদ্ধি বলে না। কিন্তু পরীক্ষা বলছে হ্যাঁ।

বিজ্ঞানীরা তখন ভাবলেন, চলো দেখি ইলেকট্রন আসলে কোন ফুটো দিয়ে যাচ্ছে। তারা একটা ডিটেক্টর লাগিয়ে দিলেন ফুটোর কাছে। লক্ষ্য করবেন কোন ফুটো দিয়ে ইলেকট্রন গেল।

এবার কী হলো জানেন?

স্ক্রিনের প্যাটার্ন বদলে গেল। আগের সেই অদ্ভুত প্যাটার্নটা আর নেই। এবার ইলেকট্রন যেন সাধারণ কণার মতো আচরণ করল, হয় এক ফুটো নয়তো অন্য ফুটো দিয়ে গেল।

যখনই কেউ দেখতে গেল ইলেকট্রন কোথায়, ইলেকট্রন তার অদ্ভুত আচরণ বন্ধ করে দিল।

এটাকে বলে অবজার্ভার ইফেক্ট। দেখার কাজটাই বদলে দিল যা দেখা হচ্ছে।

এই মুহূর্তে যদি মাথা ঘুরতে শুরু করে, সেটা স্বাভাবিক। দুনিয়ার সেরা পদার্থবিজ্ঞানীরাও এই ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছেন।

সুপারপজিশন: যখন একটা জিনিস অনেক জায়গায় একসাথে থাকে

এবার একটু কঠিন শব্দ আসবে, সুপারপজিশন। কিন্তু মানেটা আসলে সহজ।

সুপারপজিশন মানে হলো কোয়ান্টাম কণারা একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় থাকে না যতক্ষণ না কেউ সেটা মাপছে বা দেখছে। তারা একই সাথে অনেকগুলো সম্ভাব্য অবস্থায় থাকতে পারে।

বাস্তব উদাহরণ দিই। ধরুন আপনি একটা মুদ্রা উপরে ছুড়লেন। সেটা উড়ছে। এই মুহূর্তে সেটা কি হেড নাকি টেল?

আপনি বলবেন জানি না, পড়লে দেখা যাবে।

কোয়ান্টাম দুনিয়ায় মুদ্রাটা শুধু অজানা নয়, বরং পড়ার আগ পর্যন্ত এটা একই সাথে হেড এবং টেল দুটোই। পড়ে দেখার মুহূর্তেই এটা হয় হেড নয়তো টেল হয়।

এই ধারণাটাই সুপারপজিশন।

কোয়ান্টাম কণারা পর্যবেক্ষণ করার আগ পর্যন্ত একই সাথে অনেক সম্ভাবনায় থাকে। দেখার মুহূর্তে তারা একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় চলে আসে। বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে বলেন ওয়েভ ফাংশন কোলাপস।

এই ধারণাটা প্রথম শুনলে মাথায় ঢোকে না। এটা কি সত্যিই সম্ভব? একটা জিনিস কি সত্যিই দেখার আগে অনির্দিষ্ট থাকে?

বিজ্ঞানীরা বলছেন হ্যাঁ। আর এই হ্যাঁ প্রমাণ করতে গিয়েই এরউইন শ্রোডিঙার তার বিখ্যাত বিড়ালের গল্পটা বললেন।

শ্রোডিঙারের বিড়াল: মিথ্যা পরিচয়ে বিখ্যাত

এরউইন শ্রোডিঙার ছিলেন অস্ট্রিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী। ১৯৩৫ সালে তিনি একটি চিন্তার পরীক্ষা প্রস্তাব করলেন।

মজার ব্যাপার হলো, শ্রোডিঙার এই পরীক্ষাটা প্রস্তাব করেছিলেন কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের একটি ব্যাখ্যাকে হাস্যকর প্রমাণ করতে। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন এই ব্যাখ্যাটা কতটা অযৌক্তিক।

কিন্তু উল্টো হলো। তার সেই পরীক্ষাটাই বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক চিন্তার পরীক্ষা হয়ে গেল।

পরীক্ষাটা এরকম। কল্পনা করুন একটি বদ্ধ বাক্স। তার ভেতরে আছে একটি জীবন্ত বিড়াল। সেই বাক্সে আরও আছে একটি তেজস্ক্রিয় পদার্থ, একটি গাইগার কাউন্টার, একটি হাতুড়ি এবং একটি বিষের শিশি।

ব্যবস্থাটা এমন যে, এক ঘণ্টার মধ্যে পঞ্চাশ শতাংশ সম্ভাবনা আছে তেজস্ক্রিয় পদার্থটি একটি কণা ছাড়বে। যদি কণা বের হয়, গাইগার কাউন্টার সেটা ধরবে, হাতুড়ি নামবে, বিষের শিশি ভাঙবে, এবং বিড়াল মারা যাবে।

যদি কণা না বের হয়, বিড়াল বেঁচে থাকবে।

এক ঘণ্টা পর বাক্সটা না খুলে বলুন, বিড়াল কি বেঁচে আছে নাকি মৃত?

আপনি বলবেন, জানি না। পঞ্চাশ পঞ্চাশ চান্স।

অন্ধকার গবেষণাগারে রহস্যময় আলো ছড়ানো বন্ধ ধাতব বাক্স, উপরে উজ্জ্বল প্রশ্নচিহ্ন
বাক্স বন্ধ থাকা পর্যন্ত বিড়াল জীবিত ও মৃত দুটোই — খুললেই বাস্তবতা নির্ধারণ হবে

 

কিন্তু কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা বলছে আরও একটু ভিন্ন কথা। তেজস্ক্রিয় কণাটি যেহেতু একটি কোয়ান্টাম কণা, সেটা বাক্স খোলার আগ পর্যন্ত সুপারপজিশনে আছে, একই সাথে ছেড়েছে এবং ছাড়েনি দুটো অবস্থায়।

তাহলে বিড়ালও একই সাথে জীবিত এবং মৃত।

বাক্স খোলার মুহূর্তে, দেখার মুহূর্তে, ওয়েভ ফাংশন কোলাপস হয়। বিড়াল হয় জীবিত নয়তো মৃত হয়ে যায়।

শ্রোডিঙার এই গল্পটা বলেছিলেন বলতে গেলে মজা করে, এই বলতে যে দেখো, তোমাদের কোয়ান্টাম তত্ত্ব যদি ঠিক হয়, তাহলে এই হাস্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এই উদাহরণটাকেই ব্যবহার করা শুরু করলেন কোয়ান্টাম সুপারপজিশন বোঝাতে।

আজকে এটি পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত বিড়াল।

হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা: জানলে হারাই, হারালে জানি

কোয়ান্টাম দুনিয়ার আরেকটি অদ্ভুত নিয়মের কথা বলি।

ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ ছিলেন জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি একটি নীতি প্রস্তাব করলেন যেটা আজকে অনিশ্চয়তার নীতি নামে পরিচিত।

নীতিটা হলো এই, আপনি কোনো কণার অবস্থান এবং গতি একই সময়ে সঠিকভাবে জানতে পারবেন না। যত নিখুঁতভাবে অবস্থান জানবেন, তত কম জানবেন গতি। যত নিখুঁতভাবে গতি জানবেন, তত কম জানবেন অবস্থান।

এটা আমাদের মাপার যন্ত্রের সীমাবদ্ধতা নয়। এটা মহাবিশ্বের মূল নিয়ম।

সহজ উদাহরণ দিই। ধরুন একটা ঘরে অন্ধকারে একটি মশা উড়ছে। আপনি মশাটাকে খুঁজে পেতে টর্চ জ্বাললেন। আলো পড়লে মশাটা দেখা গেল, কিন্তু আলোর ধাক্কায় সে উড়ে গেল অন্যদিকে।

কোয়ান্টাম দুনিয়ায় ব্যাপারটা ঠিক এরকম। কোনো কণাকে দেখতে হলে তাকে আলো বা অন্য কিছু দিয়ে স্পর্শ করতে হয়। সেই স্পর্শেই কণার অবস্থা বদলে যায়।

এই নীতিটা আসলে বলছে, কোয়ান্টাম দুনিয়ায় একটা মৌলিক অনিশ্চয়তা আছে যেটা কোনোভাবেই দূর করা সম্ভব না। আমাদের মাপার চেষ্টা নিজেই যা মাপছি তাকে বদলে দেয়।

মাথা ঘুরছে? চলতে থাকুন, আরও অবাক হবেন।

কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট: আইনস্টাইন যাকে বলেছিলেন ভুতুড়ে

কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে রহস্যময় ঘটনার নাম কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট।

বাংলায় বলা যায় কোয়ান্টাম জড়িয়ে পড়া।

কল্পনা করুন দুটো কণা একসাথে তৈরি হলো। এরপর তাদের আলাদা করে একটাকে পাঠানো হলো ঢাকায়, আরেকটাকে পাঠানো হলো লন্ডনে।

এখন ঢাকার কণাটার একটা বৈশিষ্ট্য মাপা হলো। ধরুন দেখা গেল সেটা উপরের দিকে ঘুরছে।

একই মুহূর্তে লন্ডনের কণাটা মাপা হলো। দেখা গেল সেটা নিচের দিকে ঘুরছে। সবসময়। ব্যতিক্রম নেই।

মানে একটা কণার অবস্থা জানলেই অন্যটার অবস্থা জানা যাচ্ছে, যদিও তারা পৃথিবীর দুই প্রান্তে।

কিন্তু এখানেই আসল রহস্য। মাপার আগে কোনো কণাই নির্দিষ্ট অবস্থায় ছিল না, দুটোই সুপারপজিশনে ছিল। ঢাকারটা মাপার মুহূর্তে উপর হওয়ার সাথে সাথেই লন্ডনেরটা নিচ হয়ে গেল।

কীভাবে? কোনো সংকেত পৌঁছাল না। আলোর গতিতেও না। যেন দুটো কণার মধ্যে কোনো যোগাযোগ আছে যেটা দূরত্বকে পরোয়া করে না।

আলবার্ট আইনস্টাইন এই ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেননি। তিনি বললেন এটা spooky action at a distance, দূর থেকে ভুতুড়ে প্রভাব। তিনি বিশ্বাস করতেন এর পেছনে কোনো ব্যাখ্যা আছে যেটা আমরা এখনো জানি না।

কিন্তু পরীক্ষার পর পরীক্ষা প্রমাণ করেছে এনট্যাঙ্গেলমেন্ট সত্যি। এটা ঘটে। কেন ঘটে সেটা আজও পুরোপুরি বোঝা যায়নি।

কোয়ান্টাম টানেলিং: দেয়াল ভেদ করে যাওয়া

আরেকটি অবিশ্বাস্য ঘটনার কথা বলি।

ধরুন আপনি একটি বল পাহাড়ের দিকে ছুড়লেন। বলটার যদি যথেষ্ট শক্তি না থাকে পাহাড় ডিঙানোর, সেটা পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসবে। এটা পদার্থবিজ্ঞানের স্বাভাবিক নিয়ম।

কিন্তু কোয়ান্টাম দুনিয়ায় কণারা মাঝে মাঝে সেই পাহাড় পার হয়ে চলে যায়, যথেষ্ট শক্তি না থাকলেও।

যেন দেয়াল দিয়ে ভেদ করে চলে গেল।

এটাকে বলে কোয়ান্টাম টানেলিং।

আপনি ভাবছেন এটা কি শুধু তত্ত্ব? না। এই ঘটনাটা বাস্তবে ঘটে এবং আমাদের জীবনে এর প্রভাব আছে।

সূর্য যেভাবে জ্বলছে সেটার পেছনে কোয়ান্টাম টানেলিং আছে। সূর্যের কেন্দ্রে হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো একসাথে মিলিত হওয়ার জন্য তাদের স্বাভাবিক শক্তির চেয়ে অনেক বেশি শক্তি দরকার। কিন্তু কোয়ান্টাম টানেলিংয়ের কারণে তারা সেই বাধা পেরিয়ে মিলিত হতে পারে। মানে সূর্য জ্বলছে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের কারণে।

আপনার ডিএনএতেও কোয়ান্টাম টানেলিং হয়। আধুনিক ইলেকট্রনিক্সের ট্রানজিস্টরেও এই ঘটনা ঘটে।

কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান শুধু তত্ত্ব নয়, এটা আমাদের প্রতিদিনের বাস্তব জীবনের অংশ।

বিজ্ঞানীরা নিজেরাও দ্বিমতে: কোপেনহেগেন বনাম মাল্টিভার্স

কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষাগুলো বিজ্ঞানীরা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু এই ঘটনাগুলোর মানে কী সেটা নিয়ে তারা একমত নন।

দুটো প্রধান মত আছে।

প্রথম মতটাকে বলে কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা। এটা বলে, কোয়ান্টাম কণারা দেখার আগে পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট অবস্থায় নেই। দেখার মুহূর্তে তারা একটি অবস্থায় আসে। কেন এটা হয় সেটা জিজ্ঞেস করার দরকার নেই, এটাই নিয়ম।

অনেকটা যেন বলছে, প্রশ্ন করো না, মেনে নাও।

অসীম অন্ধকার মহাকাশে স্বচ্ছ বুদবুদের মতো সমান্তরাল মহাবিশ্ব, প্রতিটিতে সামান্য আলাদা দৃশ্য, বেগুনি ও সোনালি আভা
আপনি যে সিদ্ধান্ত নিলেন না সেটা হয়তো অন্য একটি মহাবিশ্বে আপনিই নিয়েছেন

 

দ্বিতীয় মতটা আরও অবিশ্বাস্য। এটাকে বলে মেনি ওয়ার্ল্ডস ইন্টারপ্রিটেশন বা বহু জগতের ব্যাখ্যা।

এই মত বলছে, প্রতিবার যখন একটি কোয়ান্টাম ঘটনা ঘটে, মহাবিশ্ব দুটো ভাগে ভাগ হয়ে যায়। একটি মহাবিশ্বে একটি ফল হয়, অন্য মহাবিশ্বে অন্য ফল হয়।

মানে শ্রোডিঙারের বিড়ালের ক্ষেত্রে, একটি মহাবিশ্বে বিড়াল বেঁচে থাকে, আরেকটি মহাবিশ্বে বিড়াল মারা যায়। আর দুটো মহাবিশ্বই সমান বাস্তব।

আপনি যে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, প্রতিটি মুহূর্তে অন্য একটি মহাবিশ্ব তৈরি হচ্ছে যেখানে আপনি অন্য সিদ্ধান্তটা নিয়েছেন।

এটা শুনতে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো। কিন্তু এটা একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব এবং অনেক বিজ্ঞানী এটা সত্যি মনে করেন।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার: ভবিষ্যতের হাতিয়ার

কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান কাজে লাগিয়ে এখন তৈরি হচ্ছে কোয়ান্টাম কম্পিউটার। আর এটা হতে পারে মানব সভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লব।

সাধারণ কম্পিউটার কাজ করে বিট দিয়ে। প্রতিটি বিট হয় শূন্য নয়তো এক।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার কাজ করে কিউবিট দিয়ে। কিউবিট সুপারপজিশনের কারণে একই সাথে শূন্য এবং এক দুটোই হতে পারে।

এতে কী সুবিধা? একটা সাধারণ কম্পিউটার যে সমস্যা সমাধান করতে হাজার বছর নেবে, একটা কোয়ান্টাম কম্পিউটার সেটা করতে পারবে কয়েক সেকেন্ডে।

ক্যান্সারের ওষুধ আবিষ্কার, জলবায়ু পরিবর্তনের মডেল তৈরি, নতুন পদার্থ আবিষ্কার, এই সব ক্ষেত্রে কোয়ান্টাম কম্পিউটার বিপ্লব আনতে পারে।

গুগল, আইবিএম, মাইক্রোসফট সহ পৃথিবীর সব বড় প্রযুক্তি কোম্পানি এখন কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে কাজ করছে। বাংলাদেশ সহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতিতে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি এখন অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

শেষ কথা: অজানাই সবচেয়ে সুন্দর

কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান পড়তে পড়তে একটা কথা বারবার মনে আসে।

আমরা ভাবি দুনিয়াটা আমরা বুঝে গেছি। কোথায় কী হয় জানি, কেন হয় জানি। বিজ্ঞান সব ব্যাখ্যা দিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান এসে বলল, তোমরা এখনো কিছুই জানো না। মহাবিশ্বের মূল স্তরে গিয়ে দেখো, সেখানে এমন সব নিয়ম আছে যেগুলো তোমাদের সাধারণ বুদ্ধির সাথে মেলে না।

রিচার্ড ফাইনম্যান, যিনি ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী, তিনি বলেছিলেন, কোয়ান্টাম মেকানিক্স যদি কেউ বলে সে বোঝে, তার মানে সে আসলে বোঝেনি।

এই কথাটা হতাশার নয়, বরং অনুপ্রেরণার। এটা বলছে মহাবিশ্ব এখনো তার সব রহস্য খুলে দেয়নি। এখনো অনেক কিছু জানার বাকি আছে।

আর সেই বিড়ালের প্রশ্নে ফিরে আসি। বাক্স না খোলা পর্যন্ত বিড়াল কি জীবিত না মৃত?

উত্তর হলো দুটোই এবং কোনোটাই না। বাক্স খুললেই জানা যাবে।

মহাবিশ্বটাও হয়তো অনেকটা সেই বন্ধ বাক্সের মতো। আমরা প্রতিদিন একটু একটু করে বাক্সের ঢাকনা তুলছি। প্রতিটি নতুন আবিষ্কারে চমকে উঠছি।

আর এই চমকে ওঠার অনুভূতিটাই বোধহয় বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় আনন্দ।

Comments are closed.