মানবপ্রেমী আমিরাহ : বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরী প্রিন্সেস!

পুরো নাম আমিরাহ বিন ঈদান বিন নায়েফ আল তাওয়িল আল আতীবী। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি সৌদি ধনকুবের ও সৌদি রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স আল ওয়ালিদ বিন তালালের সাবেক স্ত্রী।  ইসলামী অনুশাসন কঠোরতার সাথে পালনকারী দেশ সৌদি আরবে আমিরাহ এক ট্রেড মার্ক। সৌদি আরবে বসবাসকারী সৌদি রাজপরিবারের সাবেক পুত্রবধূ নিজেকে পর্দার ভেতরে আবদ্ধ রাখেন নাই। সৌদি রাজবধূ হওয়ার পর তিনি আবায়া বা হিজাব পড়তে অস্বীকার করেন, তার জীবনধারা পুরোপুরি পশ্চিমা মেয়েদের মত। অপূর্ব এই সুন্দরী সারা বিশ্বে নারী অধিকারের পক্ষে লড়াই চালানো অন্যতম এক সৈনিক। প্রিন্সেস আমিরাহ তার সৌন্দর্যে মোহিত করেছেন সৌদি প্রিন্স থেকে সারা বিশ্বের যুবকদের। তাকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরী প্রিন্সেস।

প্রিন্সেস আমিরাহ
প্রিন্সেস আমিরাহ Source: Al Arabiya

প্রাথমিক জীবন

প্রিন্সেস আমিরাহ আল তাওয়িল ৬ নভেম্বর ১৯৮৩ সালে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে জন্মগ্রহণ করেন।

তার পিতা ছিলেন ঈদান বিন নায়েফ আল তাওয়িল আল আতীবী। প্রিন্সেস আমিরাহ’র বাবা ছিলেন সৌদি রাজপরিবারের একজন সদস্য। তিনি তার মায়ের সাথে নানা বাড়িতে বড় হয়েছেন। বাবা মা বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়ার পর তার মা তাকে নিয়ে তার নানার বাড়ি যান।

আমিরাহ যুক্তরাষ্ট্রের কানেক্টিকাটের ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন এবং তিনি সেখান থেকে বিজনেস এ্যাডমিনেস্ট্রেশন এ গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেন।

প্রেম ও বিয়ে

প্রিন্সেস আমিরাহ’র বয়স যখন আঠার, তখন তার থেকে ২৮ বছরের বড় প্রিন্স আল ওয়ালিদের ১০ মিনিটের একটি সাক্ষাতকার নেওয়ার দায়িত্ব পড়ে।  প্রিন্স আলওয়ালিদের সাক্ষাতকারটি প্রিন্সেস আমিরাহ’র স্কুল পেপার হিসেবে ছিল। কিন্তু ১০ মিনিটের এই সাক্ষাতকারটি রূপ নেয় ২ ঘণ্টায়। এই সাক্ষাতকারটি তাদের সম্পর্কের সূচনা করে। প্রিন্স আল ওয়ালিদ ২৮ বছরের বড় হওয়া সত্ত্বেও তারা একে অপরের প্রেমে পড়েন।  দীর্ঘ নয় মাস সম্পর্কের পর তারা বিয়ে করেন। প্রিন্সেস আমিরাহ ছিলেন প্রিন্স আলওয়ালিদের তৃতীয় স্ত্রী।

প্রিন্সেস আমিরাহ ও প্রিন্স আল ওয়ালিদ
প্রিন্সেস আমিরাহ ও প্রিন্স আল ওয়ালিদ

সামাজিক উন্নয়নে প্রিন্সেস আমিরাহ

প্রিন্স ওয়ালিদ একজন উদার মনের মানুষ, তিনি তার স্ত্রী কে সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করার জন্য উৎসাহিত করতেন। ১৯৮০ সাল থেকে প্রিন্স আল ওয়ালিদ মানুষদের সাহায্য সহযোগিতা করতেন কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন একটি ফাউন্ডেশন এর মাধ্যমে বৃহৎ আকারে সারা বিশ্বে মানুষদের সাহায্য করতে। অবশেষে ২০০৯ সালে প্রিন্সেস আমিরাহ’র একান্ত ইচ্ছায় ও প্রিন্সের স্বপ্ন থেকে আল ওয়ালিদ বিন তালাল ফাউন্ডেশন সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। প্রিন্সেস আমিরাহ এই ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত হন। এই ফাউন্ডেশনের উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের অভাব অনটন দূর করা, নারীর ক্ষমতায়নের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং আরবের নিকটবর্তী দেশগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দ্রুত ত্রাণ সরবরাহ করা। আরব বিশ্ব ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া তৈরি করাও ছিল এই ফাউন্ডেশনের উদ্দেশ্য। এই ফাউন্ডেশন হাভার্ড ইউনিভার্সিটি, জর্জ টাউন ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুত এবং আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব কায়রোতে গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করেন। প্রিন্সেস আমিরাহ ২০১১ সালে ইংল্যান্ডের প্রিন্স ফিলিপের উপস্থিতিতে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে  প্রিন্স আল ওয়ালিদ বিন তালাল সেন্টার অব ইসলামিক স্টাডিজ প্রতিষ্ঠা করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রিন্স ফিলিপ তাকে মানবতার জন্য অসাধারণ কাজ করায় ৮০০ তম বার্ষিকী পদক প্রদান করেন।

২০১১ সালে তিনি বুরকিনা ফাসোতে প্রতিষ্ঠিত আল ওয়ালিদ বিন তালাল ভিলেজ অরফানেজ এর প্রতি নজর দেন। এই অরফানেজটি ২০০৬ সালে তার স্বামী প্রিন্স আল ওয়ালিদ বিন তালাল প্রথম সফরের পর থেকে প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং তখন থেকেই এখানে গরীব মানুষদের বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগিতা করা হচ্ছে এবং এর উন্নয়ন করা হচ্ছে। প্রিন্সেস আমিরাহ ২০০৬ সালে পাকিস্তানে বন্যা দুর্গতের দেখতে এবং তাদের ত্রাণ দেওয়ার জন্য পাকিস্তান ভ্রমণ করেন। এছাড়া তিনি একই বছর সোমালিয়াতে শিক্ষাক্ষেত্রে সহায়তা এবং ত্রাণ কাজের জন্য সেখানে ভ্রমণ করেন।

সামাজিক উন্নয়নে প্রিন্সেস আমিরাহ
সামাজিক উন্নয়নে প্রিন্সেস আমিরাহ
Source: House of Saud, Saudi Royal Family Website

২০১৫ সালে মানবতার কাজের জন্য আল ওয়ালিদ বিন তালাল ফাউন্ডেশনের তিনটি প্রতিষ্ঠান চালু করা হয়, তার মধ্যে একটি সৌদি আরবে, একটি লেবাননে এবং অপরটি সারা বিশ্বের জন্য। এই ফাউন্ডেশনটি স্থানীয় ভাবে এবং বিশ্বব্যাপী মানুষের অবাধ স্বাধীনতা, গ্রহণযোগ্যতা, সম অধিকার এবং সম সুযোগের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে সমাজ উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

২০১৩ সালে প্রিন্সেস তার নিজ উদ্যোগে আরবের যুবকদের জন্য ভালো কিছু তৈরি করার লক্ষ্যে ও তাদের কর্ম সংস্থানের জন্য এবং মিডিয়া ও বিনোদন শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে টাইম এন্টারটেইনমেন্ট নামে একটি হোল্ডিং কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি একই সাথে তাসামি সোশাল ইনিশিয়েটিভ সেন্টারে সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান হন এবং তিনি এই সেন্টারের মাধ্যমে আরবের যুবকদের ছোট কিন্তু টেকসই ব্যবসা তৈরির জন্য সাহায্য করেন।

নারীর ক্ষমতায়নে আমিরাহ

প্রিন্সেস আমিরাহ একবার বলেছিলেন, “আমি সেই ধরণের মেয়ে হতে চাই না, যে মেয়েটি কিছু করে না।” প্রিন্সেস আমিরাহ বলতে গেলে সৌদি আরবের সবচেয়ে সাহসী নারী। ইসলামী কঠোর অনুশাসন মেনে চলা সৌদি আরবে মেয়েদের ঘর থেকে বাইরে বের হওয়ার জন্য একজন পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি প্রয়োজন হয় সেখানে তিনি ব্যক্তিগত ভাবে বিভিন্ন কাজের সাথে নিজেকে নিযুক্ত করেন কোন আইনের ধার না মেনে। তিনি নিজেকে অন্য সকল নারীদের মত পর্দার মধ্যে রাখেন নি, তিনি চলাফেরা করেন একজন পশ্চিমা নারীদের মত করে। তার এই ধরণের চলাফেরাটা ছিল নারীদের স্বাধীনতা, অধিকার ও ক্ষমতায়নের জন্য।

প্রিন্সেস আমিরাহ
প্রিন্সেস আমিরাহ
Source: youtube.com

প্রিন্সেস আমিরাহ দীর্ঘ তিন দশক ধরে নারী অধিকারের জন্য আন্দোলনের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন কিন্তু তার এই কাজটি খুব বেশী সহজ না। এটি এমন একটি আন্দোলন যেটা শুধুমাত্র একটি সরকারের বিরুদ্ধে নয়, এই আন্দোলন আরব বিশ্বের হাজার বছরের সংস্কৃতি এবং ধর্মের বিরুদ্ধে আন্দোলন।

প্রিন্স আল ওয়ালিদ বিন তালাল ফাউন্ডেশনের সাথে যুক্ত হওয়ার পর থেকে তিনি নারীদের জন্য নাগরিক অধিকার হিসেবে বিবাহ বিচ্ছেদের পর নারীরা যেন তার নিজ সন্তানকে নিজের কাছে রেখে লালন পালন করতে পারেন। এই বিষয়ে একজন তার নিজ সন্তানকে নিজের কাছে না পেয়ে কতটা কষ্ট পান তিনি তা স্বচক্ষে দেখেছেন। কারণ তার মা নিজেও ডিভোর্স প্রাপ্ত একজন মহিলা ছিলেন।

প্রিন্সেস আমিরাহ সৌদি আরবের  নারীদের জন্য গাড়ী চালানোর অধিকার দেওয়ার জন্যও আন্দোলন করেন। তার নিজ দেশের সড়কে একদিন তিনি প্রথম সৌদি নারী হিসেবে গাড়ী চালানোর আশা ব্যক্ত করেছিলেন। তার এই আন্দোলনটি আলোর মুখ দেখেছে। বিগত বছর সৌদি আরবে নারীদের গাড়ী চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তিনি এটিকে তার বিজয় হিসেবে দেখছেন। তিনি মনে করেন নাগরিক অধিকার, শিক্ষা, চাকরি ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সুযোগ এর চেয়ে এই অধিকারটির গুরুত্ব অনেক বেশী। প্রিন্সেস আমিরাহ বিশ্বব্যাপী নারীদের অধিকারের জন্য বিল ক্লিনটন থেকে শুরু করে জর্ডানের রাণী এবং ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যদের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। তার বিষয়ে বিল ক্লিনটন ও হিলারি ক্লিনটনের মেয়ে চেলসি ক্লিনটন বলেন,”দেখুন, তিনি একজন ডিভোর্স প্রাপ্ত নারী। কিন্তু তিনি কি করছেন এখন? তিনি একজন স্বাধীনচেতা নারী যিনি তার দেশ ও নারীদের জন্য ভালো কিছু করার চেষ্টা করছেন। তিনি একজন অনুকরণীয় নারী।”

প্রিন্স ওয়ালিদ বাধ্য হয়ে প্রিন্সেস আমিরাহ ডিভোর্স দেন
প্রিন্স ওয়ালিদ বাধ্য হয়ে প্রিন্সেস আমিরাহ ডিভোর্স দেন
Source: Divorce Debbie

বিবাহ বিচ্ছেদ

প্রিন্সেস আমিরাহ আল তাওয়িলের নারীবাদী এ সকল কাজ সৌদি আরবের রাজপরিবার এবং সরকারের পছন্দ হয় নাই। তিনি অনেক রক্ষণশীল মনের মানুষ ও প্রতিষ্ঠান হতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হন যার মধ্যে হুমকিও ছিল। কিন্তু তিনি তার কাজ বন্ধ না করে যখন একজন সক্রিয় মানবতাবাদী হয়ে কাজ শুরু করেন তখন প্রথম চাপ আসে প্রিন্স আল ওয়ালিদের উপর বড় ভাই প্রিন্স খালেদ এর থেকে। প্রিন্স আল ওয়ালিদকে প্রিন্স খালেদ হুশিয়ার করে বলেন, তিনি যদি তার এই সব প্রচারমাধ্যমের কাজ বন্ধ না করেন তাহলে তাকে পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই শাস্তি প্রদান করা হবে। মূলত প্রিন্সেস আমিরাহ’র কাজ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে এ হুমকি প্রদান করা হয়। প্রিন্সেস আমিরাহ সৌদি ও ইসলামী অনুশাসন না মানার কারণে প্রিন্স ওয়ালিদকে চাপ দেওয়া হয়। ফলে, প্রিন্স ওয়ালিদ বাধ্য হয়ে প্রিন্সেস আমিরাহ কে ২০১৩ সালের নভেম্বর ডিভোর্স দেন কিন্তু তারা এখনও বন্ধু হিসেবে আছেন এবং একসাথে মানবতার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

অ্যাওয়ার্ড

প্রিন্স আল ওয়ালিদ বিন তালাল ফাউন্ডেশনের অংশ হিসেবে তাকে আইটিপি এর পক্ষ থেকে এ্যারাবিয়ান বিজনেস অ্যাচিভমেন্ট এ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে ” হিউমেরিটিয়ান এ্যাওয়ার্ডে ” ভূষিত করা হয়।

২০১০ সালে আমিরাহ " হিউমেরিটিয়ান এ্যাওয়ার্ডে " ভূষিত হন
২০১০ সালে আমিরাহ ” হিউমেরিটিয়ান এ্যাওয়ার্ডে ” ভূষিত হন
Source: Arabian Business

২০১২ সালে তিনি আরবের ক্ষমতাধর ১০০ নারীর মধ্যে  চতুর্থ স্থানে ছিলেন। এছাড়াও ” ওমেন পার্সোনালিটি অব দ্যা ইয়ার  এ্যাওয়ার্ড ” পান।

তথ্যসূত্র:

১. https://www.thefamouspeople.com/profiles/princess-ameerah-al-taweel-33879.php

২. https://www.glamour.com/story/ameerah-al-taweel-the-power-princess-of-womens-rights

Leave A Reply