হিটলার – যে নামে কেঁপেছিল বিশ্ব (প্রথম পর্ব)

 

বিশ্ব ইতিহাসের সেরা খল নায়ক হিসেবে যারা গন্য, হিটলার তাদের মধ্যেও অন্যতম। কিন্তু কেন? ঠিক কী কারনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মানিকে পুনর্গঠিত করে বিশ্বমঞ্চে যার নায়ক হওয়ার কথা তাকে খলনায়ক হতে হয়েছিল! ফ্যাসিবাদের জনক এডলফ হিটলারের জীবনের আদ্যোপান্ত আলোকপাত করে আমরা সেই প্রশ্নের উত্তর গুলো খুঁজে নেবার চেষ্টা করব।

১৯৩৪-১৯৪৫ সাল পর্যন্তএডলফ হিটলার নাৎসি জার্মানির নেতা ছিলেন। ইতিহাস তাকে ফ্যাসিবাদের প্রবর্তক এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করে। ২য় বিশ্বযুদ্ধে তার নেতৃত্বে৬০ লক্ষ ইহুদী সহ সর্বমোট প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়।

হিটলারের পরিচয়ঃ

এডলফ হিটলার (এপ্রিল ২০,  ১৮৮৯ – এপ্রিল ৩০, ১৯৪৫) ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জার্মানির চ্যান্সেলর  এবং নাৎসি বাহিনী বা ন্যাশনাল স্যোস্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টির কুখ্যাত স্বৈরশাসক ছিলেন। যুদ্ধে হেরে যাওয়ার প্রাক্কালে হিটলার ৩০ শে এপ্রিল বার্লিনের একটি বাংকারে স্ত্রী ইভাব্রাউন সহ আত্মহত্যা করেন।

এডলফ হিটলার (এপ্রিল ২০, ১৮৮৯ – এপ্রিল ৩০, ১৯৪৫)
Source: nasional sosialis indonesia – blogger

জন্মঃ

এডলফ হিটলার ২০শে এপ্রিল ১৮৮৯ সালে অস্ট্রিয়ার ব্রুনোঅ্যাম ইন এ জন্মগ্রহন করেন।

পরিবারঃ

আলোইস হিটলার এবং ক্লারা পোলজ এর ৬ সন্তানের মধ্যে হিটলার ছিলেন ৪র্থ । তার কঠোর পিতার সাথে হিটলারের কখনো বনিবনা হতনা যে কারনে পরবর্তীতে আলেইস হিটলার তার পুত্রের চারুকলায় ভর্তি ও চিত্রশিল্পী হিসেবে পেশা গড়ার সিদ্ধান্তে দ্বিমত পোষন করেন। ১৯০০ সালে হঠাত করে ছোটভাই এবং প্রিয় বন্ধু এডমুন্ড এর মৃত্যুর পর হিটলার ভীষণ একাকী ও আস্তে আস্তে অন্তর্মুখী হয়ে পড়েন। 

প্রাথমিক জীবন ও চারুশিল্পঃ

অস্ট্রিয়াতে জন্মগ্রহণকারী হিটলারের ছোটবেলা থেকেই জার্মান জাতীয়তাবাদের প্রতি আলাদা একটা টান ছিল এই টানই পরবর্তী জীবনে তার সকল কর্মকান্ডের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল।

১৯০৩ সালে হঠাৎ হিটলারের বাবা মারা যান এবং তার দুই বছর পর হিটলারের মা তাকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নেন। ১৯০৭ সালে মায়ের মৃত্যুর পর হিটলার জীবিকার সন্ধানে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় পাড়ি জমান এবং সেখানে একজন সাধারণ দিনমজুর ও জলরঙের চিত্রশিল্পী হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকেন। হিটলার সেখানে চারুকলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুই দুই বার ভর্তির আবেদন করেও প্রত্যাখ্যাত হন। সামান্য অনাথ ভাতা ও পোস্টকার্ড বিক্রির যৎসামান্য টাকা দিয়ে হিটলারের অন্নের ব্যবস্থা হলেও বাসস্থানের ব্যবস্থা হত না, ফলে তাকে রাস্তায় রাস্তায় রাত কাটাতে হত। সম্ভবত তৎকালীন ইহুদী অধ্যুষিত ভিয়েনায় এভাবে দুর্বিসহ দিন কাটানোর স্মৃতিগুলোই পরবর্তীতে তাকে ইহুদী বিদ্বেষী করে তুলতে বাধ্য করেছিল।

হিটলার এর পেন্টিং
Source: Facepunch

১৯১৩ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে হিটলার জার্মানির মিউনিখে পাড়ি জমান এবং জার্মান সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগদানের আবেদন করে। ১৯১৪ সালে তিনি জার্মান সেনাবাহিনীতে যোগদান করার ডাক পান যদিও তিনি তখন পর্যন্ত অস্ট্রিয়ার নাগরিক ছিলেন। যুদ্ধে বেশিরভাগ সময়ই হিটলার অগ্রভাগ পরিহার করে পশ্চাদভাগে অবস্থান করলেও হিটলার বেশিরভাগ যুদ্ধ ক্ষেত্রেই উপস্থিত ছিলেন এবং সোম নামক এক যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি আহত হন। অসীম সাহসিকতার সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও আহত হওয়ায় তাকে ‘আইরন ক্রস ফার্স্ট ক্লাস’ খেতাব ও ‘ব্ল্যাকওউন্ডব্যজ’ দেওয়া হয়।

নাৎসি বাহিনীর নেতা হিসেবে হিটলার Source: http://2.bp.blogspot.com

যুদ্ধে জার্মানির হেরে যাওয়ার সংবাদে হিটলার প্রচণ্ড রকম মুষড়ে পড়েন। যুদ্ধ ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা তার মাঝে জার্মান জাতীয়তাবাদ তীব্রভাবে জাগ্রত করে এবং ১৯১৮ সালে জার্মানির আত্মসমর্পনের ঘটনায় তিনি বিস্মিত হন। অন্যান্য জার্মান জাতীয়তাবাদীদের মত তার মনেও প্রবল বিশ্বাস জন্মে যে মার্ক্সসবাদী এবং বেসামরিক নেতৃবৃন্দের জার্মান সেনাবাহিনীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতার কারনেই জার্মানিকে এমন শোচনীয় পরাজয় বরন করতে হয়েছে। রাইন ভূমিকে সেনামুক্ত করার কথা ও জার্মানিকে যুদ্ধ শুরুর অপরাধে দোষ স্বীকার করতে বাধ্য করে জার্মানির উপর জোর পূর্বক চাপিয়ে দেওয়া ভার্সাই চুক্তির ধারাগুলো দেখে তিনি অবাক-বিস্মিত ও মনে মনে রাগান্বিত হন।

হিটলার ও নাৎসি বাহিনীঃ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে হিটলার আবার মিউনিখে ফিরে আসেন ও জার্মান সেনাবাহিনীতে নিয়মিত চাকুরী করতে থাকে। একজন বুদ্ধিদীপ্ত সেনা কর্মকর্তা হিসেবে হিটলার জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টির (DAP) কার্যক্রম সমূহ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন এবং ইহুদী বিদ্বেষ, জাতীয়তাবাদ  ও মার্ক্সবাদ বিরোধী চিন্তাধারা গুলো পার্টির প্রতিষ্ঠাতা নেতা এন্টোন ড্রেক্সলারের কাছ থেকে রপ্ত করতে থাকেন। ১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বরে হিটলার DAP তে যোগদান করেন যা তখন তার নাম পরিবর্তন করে National sozialistische Deutsche Arbeiter partei (NSDAP) নাৎসি নাম ধারন করে।

নাৎসি কর্মকর্তাদের সাথে হিটলার
Source: Business Insider

নতুন নাম ধারনকারী নাৎসি পার্টির স্বস্তিকা চিহ্নিত প্রতীক ও ব্যানার হিটলার নিজ হাতে নকশা করেন এবং কালো রঙের উপর সাদা বৃত্তের মাঝে এটি স্থাপন করেন। তিনি জার্মানির উপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া ভার্সাই চুক্তি, বিরোধী রাজনৈতিক দল, মার্ক্সবাদী এবং ইহুদী বিদ্বেষী বক্তব্য দিয়েদ্রুত খ্যাতি অর্জন করতে থাকেন। ১৯২১ সালে নাৎসির প্রতিষ্ঠাতা ড্রেক্সলার কে সরিয়ে দিয়ে হিটলার নিজে নাৎসি পার্টির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।

হিটলারের দেওয়া তেজোদ্যীপ্ত ভাষণ গুলো দ্রুত শ্রোতাদের নজর কাড়তে থাকে। এসময় বিরোধীদের সকল প্রকার আক্রমন থেকে হিটলারকে নাৎসি পার্টির সংসদীয় বিভাগ (SA) এর প্রধান ক্যাপ্টেন আর্নেস্ট রহম সহ পূর্বের কিছু অনুসারীরা রক্ষা করতে থাকেন।

বিয়ার হলের বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানঃ

৮ই নভেম্বর ১৯২৩ সালে হিটলার এবং SA বাহিনীর কিছু নেতৃবৃন্দ ব্রাভিয়ান প্রধানমন্ত্রী গুস্তাভখার এর ব্যাপারে মিউনিখের বিয়ার হলে এক আলোচনায় বসেন। সেখানে হিটলার জাতীয় অভ্যুত্থানের ঘোষণা দেন এবং একটি নতুন সরকার গঠন করেন।

বিয়ার হলে হিটলারের বক্তব্য প্রদান
Source: eonimages.com

একটি ক্ষুদ্র আন্দোলন ও কয়েকজনের মৃত্যর পর ‘বিয়ার হল অভ্যুত্থান’ নামে পরিচিত সেনা অভ্যুত্থান টি ব্যর্থতার পর্যবসিত হয়।রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে হিটলারকে গ্রেফতার ও সাজা হিসেবে ৯ মাসের কারদণ্ড দেওয়া হয়।

 হিটলারের বই ‘মাইন ক্যাম্ফ’ ঃ

১৯২৪ সালে ৯ মাস কারাবন্দী থাকার সময়ে হিটলার তার সহকারী রুডল্‌ফহেস কে দিয়ে তার প্রথম জীবনের ঘটনা ও রাজনৈতিক ইস্তেহার সমন্বিত বই মাইন ক্যাম্ফ (আমার সংগ্রাম) লিখান। মাইন ক্যাম্ফ বা আমার সংগ্রাম নামক হিটলারের আত্মজীবনীমূলক বইটির প্রথম খন্ড প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালে এবং দ্বিতীয় খন্ড ১৯২৭ সালে। এটি ১১টি ভাষায় ভাষান্তরিত করা হয় যা ১৯৩৯ সালে ৫০ লক্ষাধিক কপি বিক্রি হয়। তীব্র জাত্যভিমান ও জাতীয়তাবোধ সম্পন্ন বইটিতে হিটোলারের জার্মানিকে জার্মান (এক জাতি এক দেশ) জাতির জন্য প্রতিষ্ঠা করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট ভাবে ফুটে ওঠে।

হিটলারের বই ‘মাইন ক্যাম্ফ’
Source: Girls Ask Guys

বইটির প্রথম খন্ডে হিটলার প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা, ইহুদী বিদ্বেষ, শ্রেষ্ঠ জাতিস্বত্ত্বার বিষয় সমূহ এবং ফ্রান্সের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ ও জার্মানির পূর্বাংশ রাশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত করার ঘোষণা দেন। অযোক্তিক আকাশকুসুম ও গাঁজাখুরি কল্পনা এবং ব্যকরনগত ভুল থাকার পরও ‘মাইন ক্যাম্ফ’ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত জার্মান জাতির কাছে আশার আলোকবর্তিকা হিসেবে স্থান করে নেয়।

ক্ষমতায় আরোহণঃ

১৯৩০ সালের বিশ্বমন্দা ও বেকারত্ব হিটলারের জন্য একটি রাজনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। কারন এমন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে জার্মানরা দলে দলে সংসদীয় গণতন্ত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে চরমপন্থার দিকে ঝুঁকতে থাকে। ১৯৩২ সালে হিটলার ৮৪ বছর বয়সী পল ভন হিনডেনবার্গের বিপরীতে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনে লড়েন এবং ৩৬ শতাংশের ও বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচনের সব পর্যায়ে দ্বিতীয় হন। এই নির্বাচনী ফলাফল হিটলারকে জার্মান রাজনীতির এক অন্যতম পুরোধা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। হিনডেনবার্গ রাজনৈতিক সমতা আনয়নের জন্য হিটলারকে জার্মানির চ্যান্সেলর পদে নিযুক্ত করেন।

জার্মানির চ্যান্সেলর পদে হিটলার
Source: United States Holocaust Memorial Museum

হিটলার তার চ্যান্সেলর পদকে শুধুমাত্র একটি বৈধ স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সীলমোহর হিসেবে ব্যবহার করেন। সংসদে সন্দেহজনক অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর তিনি রাইখ্‌শ ট্যাগ অগ্নি আইন জারি করেন এবং মৌলিক অধিকার খর্ব করে রাজনৈতিক বিরোধীদের বিচার বহির্ভূত আটক করতে থাকেন। এরপর হিটলার সংবিধানে সংশোধনী এনে তার মন্ত্রীসভার মাধ্যমে সম্পূর্ণ আইনসম্মতভাবে চার বছর ধরে ক্ষমতা ধরে রাখার নীল নকশা ও করতে থাকেন।

সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় (আইনগত ও নির্বাহী) ক্ষমতা গ্রহণের পর হিটলার ও তার রাজনৈতিক সহকর্মীরা তাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের একে একে চাপের মুখে ফেলতে থাকেন। জুনের শেষের দিকে ভীতি প্রদর্শন করে জোরপূর্বক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেন। ১৪ই জুন, ১৯৩৩ সালে নাৎসি দলকে জার্মানির একমাত্র বৈধ দল হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং একই বছরের অক্টোবরে হিটলার জাতিপুঞ্জ থেকে জার্মানির সদস্যপদ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।

১৯৩৪ সালের আগস্টে হিনডেনবার্গের মৃত্যুর একদিন পূর্বে হিটলারের মন্ত্রীসভা রাষ্ট্রপতির পদ বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা চ্যান্সেলরের সাথে একীভূত করে একটি আইন পাশ করে। এই আইনের পর থেকে হিটলার একই সাথে সরকার প্রধান, একমাত্র বৈধ দলের সর্বোচ্চ নেতা এবংজার্মানির চ্যান্সেলরের পদে অধিষ্ঠিত হন। সরকার প্রধান হিসেবে হিটলার সেনাবাহিনীরও সর্বাধিনায়ক হন।

নিরামিশভোজী হিটলারঃ

নিরামিশভোজী হিটলার
Source: Action Meinhof – WordPress.com

হিটলার নিজের তৈরি খাদ্যতালিকা মেনে চলতেন যেখানে মদ্য ও আমিষ বিশেষ করে মাংশ নিষিদ্ধ ছিল। তার খাদ্যতালিকায় ধর্মের ছাপ দেখা যায় এবং তিনি উচ্চতর জাতিস্বত্ত্বায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি জার্মানদের তাদের শরীর ভেজাল ও বিষমুক্ত রাখার উপদেশ দিতেন এবং দেশব্যাপী ধুমপান বিরোধী প্রচারণা চালাতেন।

 

পরবর্তী পর্ব