শাড়ির ইতিহাস: জড়িয়ে রাখা হাজার বছরের গল্প (প্রারম্ভিক ধারণা)

শাড়ি—এই একটি শব্দেই যেন লুকিয়ে আছে বাঙালির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি আর ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস। যুগের পর যুগ ধরে শাড়ি শুধু একটি পরিধেয় বস্ত্র নয়, হয়ে উঠেছে নারীর সৌন্দর্য, শালীনতা আর ঐতিহ্যের প্রতীক। সম্ভবত মানবসভ্যতার ইতিহাসে ব্যবহৃত সবচেয়ে প্রাচীন পোশাকগুলোর একটি এই শাড়ি, যার আবেদন হাজার বছর পেরিয়েও আজ অম্লান।

শাড়ির উৎপত্তি ও প্রাচীন ইতিহাস

শাড়ির জন্মকাল ঠিক কবে—সে প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর ইতিহাস দিতে পারেনি। তবে আবহমান বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে শাড়ির অবস্থান যে কতটা গভীরে প্রোথিত, তার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন যুগের শিল্পকলা, সাহিত্য আর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে। ‘শাড়ি’ শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত ‘শাটী’ থেকে, যার অর্থ পরিধেয় বস্ত্র। ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রাচীন ভারতের পোশাকচর্চা প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন, তখনকার নারীরা আংটি, দুল, হারসহ পায়ের গোছা পর্যন্ত শাড়ি পরিধান করতেন এবং উপরের অংশে জড়ানো থাকত আধনা বা আধখানা কাপড়। পাহাড়পুরের পাল আমলের ভাস্কর্যগুলো সেই ধারণাকেই আরও দৃঢ় করে।

প্রাচীন ভারতে শাড়ি ও বয়নশিল্প

অষ্টম শতাব্দীতেই যে শাড়ি নারীদের দৈনন্দিন পোশাক হিসেবে প্রচলিত ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় এসব ভাস্কর্য ও পোড়ামাটির ফলকে। আদিকালে দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে সেলাই করা কাপড়ের চল ছিল না। সেলাইবিহীন, অখণ্ড কাপড় পরাই ছিল সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে স্বীকৃত। পুরুষদের ক্ষেত্রে তা পরিচিত ছিল ধুতি নামে, আর নারীদের জন্য সেই একই ধারার বস্ত্রই পরিচিত হয় শাড়ি নামে। বয়নশিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে শাড়ির অস্তিত্বও আরও বিস্তৃত হয়।

সাহিত্য ও শিল্পকলায় শাড়ির উপস্থিতি

গুপ্ত যুগের বিখ্যাত কবি কালীদাস তাঁর ‘কুমারসম্ভব’ কাব্যে শাড়ির উল্লেখ করেছেন। একই সময়ে ইলোরা ও অজন্তা গুহার চিত্রাবলি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকেই শাড়ি ছিল নারীর পরিচিত পোশাক। বাংলার পাহাড়পুর ও ময়নামতির পোড়ামাটির ফলকগুলো থেকেও জানা যায়, প্রায় হাজার বছর আগে পূর্ববঙ্গে শাড়ির প্রচলন ছিল ব্যাপক।

শাড়ির ইতিহাস

মোগল আমলে শাড়ির রাজকীয় রূপ

দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতের নারীরা শাড়িকেই নিজেদের প্রধান পরিধেয় হিসেবে আঁকড়ে ধরেছেন দীর্ঘকাল ধরে। মোগল আমলে এসে শাড়ির জগতে যোগ হয় নতুন মাত্রা। সম্রাট আকবর ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মোগল দরবারকে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়াস চালান, যার প্রভাব পড়ে পোশাকেও। শাড়িতে যুক্ত হয় মোগলাই আভিজাত্য, সূক্ষ্ম নকশা আর রাজকীয় সৌন্দর্য। মসলিন শাড়ির কদর তখন এতটাই ছিল যে, জেনানা মহলের জন্য বিশেষভাবে সরকারি কর্মচারী নিয়োগ করে মসলিন সংগ্রহ করা হতো। ধারণা করা হয়, এই সময়েই শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজ পরার রীতির সূচনা, যদিও তখন শাড়ি পরা হতো এক প্যাঁচেই।

ঔপনিবেশিক যুগ ও শাড়ির পরিবর্তন

উনিশ শতকের চল্লিশ দশক থেকে শুরু হওয়া ভিক্টোরিয়ান যুগ শাড়ির ইতিহাসে আরেকটি বড় পরিবর্তন এনে দেয়। ব্রিটিশ শাসনের প্রভাবে পোশাকে শালীনতা ও শরীর ঢাকা রাখার প্রবণতা জোরদার হয়। ফলে শাড়ির সঙ্গে যুক্ত হয় ফুলহাতা ব্লাউজ ও পেটিকোট। এই নতুন ধরন বাঙালি নারীর চিরাচরিত শাড়ি পরার রীতিকে আমূল বদলে দেয়।

ঠাকুর পরিবার ও আধুনিক শাড়ির যাত্রা

ভারত বিভাগের আগে বাংলায় আধুনিক শাড়ি পরার স্টাইল ছড়িয়ে পড়ে মূলত ঠাকুর পরিবারের হাত ধরে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী দেবী শাড়ি পরার নতুন ভঙ্গি জনপ্রিয় করে তোলেন। ভারত বিভাগের পর পাকিস্তান আমলেও শাড়ির জনপ্রিয়তা কমেনি। তখন তাঁতের সুতি শাড়িই ছিল নারীদের প্রথম পছন্দ, সঙ্গে ছিল টিস্যু কাপড়ের ব্যবহার।

শাড়ির ইতিহাস

স্বাধীনতা-পরবর্তী দশকগুলোতে শাড়ির বিবর্তন

ষাটের দশকে শাড়ির রূপে আসে আধুনিকতার ছোঁয়া। ফ্যাশন ও স্টাইল নিয়ে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয় এই সময়েই। সুতির পাশাপাশি সিল্কের শাড়িও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সত্তরের দশক যেন হয়ে ওঠে স্বাধীন সাজের যুগ—যেমন খুশি তেমন সাজো। কনট্রাস্ট ব্লাউজ, গোল গলা আর লম্বা হাতার ডিজাইন তখনকার ট্রেন্ড। আশির দশকের আগ থেকেই শাড়ির কাপড় ও বুননে বৈচিত্র্য আরও স্পষ্ট হয়—মসলিন, জামদানী, জর্জেট, কাতান আর সুতির ওপর নতুন ধরনের কাজ শুরু হয়।

আধুনিক সময়ে শাড়ির নকশা ও বৈচিত্র্য

নব্বই দশক ও পরবর্তী সময়ে শাড়ির ডিজাইনে যুক্ত হয় ব্লক প্রিন্ট, হ্যান্ডপেইন্ট, বাটিক, স্প্রে কাজ, সিকোয়েন্স ও ডলার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এতে যোগ হয় অ্যাপ্লিক, কারচুপি আর নানান ফ্লোরাল মোটিফ। এভাবেই শাড়ি যুগে যুগে বদলেছে, রূপ পাল্টেছে, কিন্তু হারায়নি তার মূল সত্তা।

হাজার বছরের পথচলায় শাড়ি আজও বাঙালির জীবনে অটুট—একটি পোশাক নয়, বরং ইতিহাস, আবেগ আর পরিচয়ের এক অনন্য দলিল।

তথ্যসুত্রঃ   The Origin Of The Saree,  উইকি 

Leave A Reply
sativa was turned on.mrleaked.net www.omgbeeg.com

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More