প্রযুক্তির এই যুগে কি হতে পারে আপনার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার?

আমরা সবাই বাবা মার কাছে ১০ কিলোমিটার হেটে স্কুলে যাবার গল্প শুনেই বড় হয়েছি, তাই না! এখনকার দিনে এটি শুনতে অবাক লাগলেও তখন এটিই ছিল বাস্তবতা। বাবা মার গল্পটা এমন হলেও দাদুর গল্পটা আরও উদ্ভট। তিনি নাকি পড়াশোনা কি এটি শুনতেই পান নি যথেষ্ট বড় হবার আগে!

অথচ আমরা এখন বাড়ির পাশের স্কুলেই দিব্যি পড়ালেখা করে যাচ্ছি। স্কুলে যেতে ভাল না লাগলে স্কুলটাকেই বাসায় এনে পড়ছি!

দিন বদলাচ্ছে, সাথে বদলাচ্ছে আমাদের কাজকর্মও। ঠিক ১৫০ বছর আগেই আমেরিকানদের দুই-তৃতীয়াংশ ছিল কৃষক। দিন বদলের হাওয়ায়, ঠিক ২০০০ সালের দিকেই চাকুরীর বাজারে সর্বোচ্চ ছিল ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। আর এখন চাকুরীর সিংহভাগই চলে গিয়েছে সেবা খাতে।

বেশিদূর যেতে হবে না। বিশাল বড় উদাহরণ আছে হাতের নাগালেই। তিন বছর আগেই ঢাকার চিত্র ছিল আজ থেকে অনেকটাই ভিন্ন। এত বিশাল জনসংখ্যার এই ঢাকা শহরে যানবাহনের ক্ষেত্রে চলত যথেচ্ছাচার। কিন্তু এখন রাইড শেয়ারিং এসে পরিস্থিতি অনেকটাই সন্তোষজনক। সহজ,পাঠাও আর উবারের মতো সার্ভিস গুলোর মাধ্যমে অনেক মানুষের জীবন হয়েছে সচ্ছল। চাকুরীর অভাব মিটেছে খানিকটা।

মোবাইলের মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং
মোবাইলের মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং                                                                                                                        Source: flickr.com

৫০ বছর আগে বাংলাদেশের মানুষ যে কাজ করত তার গুটিকয়েক কাজ এখন টিকে থাকলেও পরিবর্তন হয়েছে প্রায় বেশিরভাগ কাজই। যে কাজগুলোও বা আছে তা নিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। ধীরে ধীরে এ পরিবর্তনগুলো আরো দ্রুততর হচ্ছে। আজ তাই এই কাজের পরিবর্তন নিয়েই লিখছি।

প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে জীবনযাত্রার পরিবর্তন জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে। আমাদের জীবিকার জন্য কাজের ধরন পরিবর্তন হচ্ছে বেশ হঠাৎ করেই। হাফিংটন পোস্টে প্রকাশিত একটি আর্টিকেল অনুসারে আগামী ২০ বছরের মধ্যেই এমন কিছু কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে যা নিয়ে কিনা আমাদের কেউ এখনো কোন আন্দাজ করতেই পারি নি।

যেমন ধরুন, কাপড়ের ব্যবসাতেই আসি। এখন আমরা ভালো কাপড় খুঁজে পেতে নির্ভর করে আছি ফ্যাক্টরিগুলোর আর খুচরা ব্যবসায়ীদের মন মর্জিমাফিক। কিংবা জুতার ক্ষেত্রেও বাটা কিংবা এপেক্স নতুন কোন ডিজাইন বাজারে আনল কিনা, তার জন্য চাতক পাখির মত চেয়ে থাকি। থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি যদি কোনমতে হাতে চলে আসে, এই দুটি শিল্পই কিন্তু একদম নিভে যাবে। যে যার মনমত কাপড়, জুতা প্রিন্ট করে পড়তে থাকবে।

এতে করে বিশাল পরিমাণে মানুষের কাজ পরিবর্তন হয়ে যাবে এক নিমিষে। তখন দরকার হবে থ্রিডি প্রিন্টারের কোম্পানি আর তাতে কর্মসংস্থান হবে প্রচুর মানুষের। থ্রিডি প্রিন্টারের জন্য কাঁচামালের ব্যবসা বেশ ফুলে ফেঁপে উঠবে।

থ্রিডি প্রযুক্তিতে তৈরি জুতো
থ্রিডি প্রযুক্তিতে তৈরি জুতো                                                                                        source: www.huffingtonpost.com

আপনার মাথায় নিশ্চিত এখন ঢুকে গেছে রোবটের কথা। রোবট এলেই নাকি পৃথিবী থেকে মানুষ বিলুপ্ত হবে এমনটা বলতে চান কিছু সন্দেহবাদী মানুষ। কিন্তু বাস্তবে বিলুপ্ত হবে কিনা অতশত জানি না ভাই, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে যে পরিবর্তন আনবে তা নিশ্চিত। কিছু রোবট আসবে যেমন: মাছ ধরা রোবট, মাইনার রোবট, কৃষক রোবট, পরীক্ষার হলে গার্ড দেয়া রোবট, প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে শিক্ষক রোবট, যোদ্ধা রোবট কিংবা রাজমিস্ত্রি রোবট।

তখন আবার মানুষের কাজ হবে প্রতিবছরে রোবট বানাতে থাকা, রোবটের চিকিৎসা করা, রোবটের ট্রেনিং দেয়া, রোবটের ফ্যাশনসম্মত পোশাক তৈরি করা ইত্যাদি।

তৈরি করুন রোবট
তৈরি করুন রোবট                                                        source: www.musicamerolo.wordpress.com

মানুষের স্বাদ পরিবর্তন হচ্ছে দিনকে দিন। রেস্টুরেন্টে গিয়ে সময় নষ্ট না করে তারা এখন সব কিছু বাসায় বসেই পেতে চায়। সব ব্যবসার ক্ষেত্রেই হোম ডেলিভারি এখন জনপ্রিয়। অনেক মানুষ কাজ করেন এ পেশায়। কিন্তু এটি থাকবে কতদিন। ভাই রে ভাই, আসছে ড্রাইভারবিহীন গাড়ির যুগ। ডেলিভারির চাকরি হয়তো আর থাকবেই না। ড্রাইভারবিহীন গাড়ির কথায় যখন চলেই আসলাম, এই গাড়িই হয়তো প্রচুর কাজের সুযোগ করে দিবে। প্রচুর ইঞ্জিনিয়ার কিংবা দেখাশোনার লোকের দরকার হবে তখন। জরুরি অবস্থার জন্য সাপোর্ট টিম রেডি রাখতে হবে সব সময়।

চিকিৎসক পেশার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কিছুটা জটিল। মানুষ ছাড়া অন্য কাউকে এ ব্যাপারে বিশ্বাস করা যায় না। আবার, মানুষের পরিবর্তে অনলাইন সিস্টেমের মাধ্যমে চিকিৎসা দেবার সম্ভাবনাও অমূলক নয়। তবে এটি অনুমান করা যায়, ভবিষ্যৎ এ দক্ষ চিকিৎসকদের মূল্য সহজে কমছে না।

এতক্ষণ তো বললাম সব যাওয়া আসার কথা। এখন বলি যা শুধু আসতেই থাকবে। প্রযুক্তি বিষয়ক কাজের বিজয়রথ যে এত তাড়াতাড়ি থামবে তা বলার কোন উপায় নেই। আরে ভাই, আজকাল আপনার টয়লেটে থাকাকালীন সময় পরিমাপের জন্যও একটা এপ ইন্সটল করতে হয়। তাইতো এপ ডেভেলপারদের আসছে জয়জয়কার।

“ইন্টারনেট অফ থিংগস” শব্দটা পরিচিত লাগে??

কোথায় যেন শুনছি শুনছি এমন লাগে তাই না!!

সব কিছুই একসাথে যুক্ত হতে চলেছে। এজন্য দরকার নতুন নতুন সিস্টেম তৈরি করা। সৃজনশীল কাজের মূল্য থাকবে তাই সবচেয়ে বেশি।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবপত্তর এখন অনেকটাই অটোমেটিক। কিন্তু আসছে দিনে হয়ত মানুষের ব্যবহার কমে যাবে বেশ খানিকটা। শুধু ‘তথ্য বিশ্লেষক’ হিসেবে মানুষ থাকবে অগ্রগণ্য। তার মানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ফুল-টাইম কাজ করা মানুষের সংখ্যা কমে যাবে, থাকবে শুধু একজন মডারেটর। বাকি সবাই কাজ করবে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে। তার মানে ম্যানেজারের কাজটা হয়ত সমান গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। নেতৃত্বগুণ বেশ দামী হিসেবে পরিগণিত হতে থাকবে।

বাংলাদেশের পপুলেশন পিরামিড লক্ষ্য করলে দেখা যাবে বর্তমানে আমাদের তরুণদের সংখ্যাই বেশি। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতেই বয়স্কদের সংখ্যা বেড়ে যাবে ঠিক যেমনটা এখন হয়েছে ইউকে তে। তো যা হয় আর কি, বয়স্কদের দেখাশোনার জন্যও তো লোক লাগবে। নতুন একটি পেশা আসতে যাচ্ছে যাকে বলা যেতে পারে (care givers) সংগপ্রদানকারী। চিন্তা করে দেখুন তো আমাদের মাঝে  সম্পদের অধিকারী কারা। পৃথিবীর ৬০ ভাগেরও বেশি ব্যক্তিগত সম্পদ ষাটোর্ধ ব্যক্তিদের দখলে। এটি বলার কারণ হল বয়স্ক মানুষকে সংগ দেয়ার এই কাজে কত টাকা বিনিয়োগ হবে তা আমাদের কল্পনাতীত।

বয়স্কদের প্রয়োজন পরিচর্যা
বয়স্কদের প্রয়োজন পরিচর্যা                                                            source: www.bing.com

একটা বড় কাজের ক্ষেত্র তৈরি হবে পরিবেশ বিষয়ের উপর। পৃথিবীর পরিবেশ বিপর্যয় হচ্ছে বেশ তাড়াতাড়ি। আমাদের কোন বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। ‘লোরাক্স’ মুভির শুরুতে যেমনটা দেখেছিলাম আমাদের হয়তো বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে হবে তেমনি করেই। পরবর্তী বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হতে পারে পরিবেশের উপরে।

পরিবর্তনগুলো হচ্ছে ধাপে ধাপে। আজ যা ঘটছে আমেরিকা, ইউরোপে ঠিক তাই বা কাছাকাছি কিছু ঘটতে যাচ্ছে কাল ভারতবর্ষে। গার্মেন্টস ব্যবসা থেকেই উদাহরণ দেয়া যাক। আজ থেকে দুইশত বছর আগে বর্তমানের গার্মেন্টস ব্যবসা ছিল ইংল্যান্ড, স্পেনের দিকে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তাদের ব্যবসার ধরন পালটে গেছে। কাপড় তৈরি হয় এখন বাংলাদেশ, পাকিস্তানের মত দেশগুলোতে। পঞ্চাশ বছরের মাঝে এই ব্যবসা আফ্রিকায় স্থানান্তরিত হবার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাই এটি বলা যায় যে, বাইরের দুনিয়ায় খেয়াল রাখা দরকার আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই। আগে থেকেই সাবধান হলে হয়ত ক্যারিয়ারে আমরা এগিয়ে যাব অন্যদের থেকে।

সব ধরনের পরিবর্তনই কিছুটা আঁচ করা গেলেও এটা অনেকটাই হঠাৎ করেই আসে। কারণটা হল নতুন নতুন প্রযুক্তি। কল কারখানার যুগের শুরুতেই দেখা গিয়েছে মানুষ কিভাবে পরিবর্তনকে গ্রহণ করে নেয়। দিনে দিনে ব্যবসায়িক মডেল গুলো হয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তি নির্ভর। যে প্রযুক্তি বোঝে না তার ব্যবসায় নামছে ধ্বস।

উপরে অনেক গুলো উদাহরণ দেয়ার চেষ্টা করলাম। প্রত্যেকটাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, দক্ষ কর্মীর চাহিদা সবসময়ই থাকবে। কিন্তু অদক্ষ কর্মীর কাজের সুযোগ বেশ কমে যাবে। এখানে দক্ষতার বিষয়টা নির্ভর করবে শিক্ষার ওপর। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, অশিক্ষাই দারিদ্রের মূল কারণ হিসেবে পরিগণিত হতে যাচ্ছে। কঠোর পরিশ্রম আর এখন যথেষ্ট নয়। এখন নিজেকে সমসাময়িক পৃথিবীর সাথে চলনসই করে গড়ে তুলতে আমাদের প্রয়োজন “শিক্ষা”।

আর হ্যাঁ, শিক্ষকতা পেশার দ্বার কিন্তু খুলে যাবে অনেকটা। নতুন নতুন বিষয় আসবে আর বাচ্চাদের তা শেখাতে শিক্ষকতার প্রয়োজন কিন্তু থাকবে আজীবন।

Leave A Reply