আলফ্রেড ডি স্টেফানো : একজন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তী দুর্ভাগা ফুটবলার

0

সর্বকালের সেরা কে? খুবই সহজ সরল একটি প্রশ্ন, কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তরে ফুটবল বিশ্ব বিভক্ত হয়ে যায় কয়েক ভাগে। কারো চোখে ম্যারাডোনা সেরা তো কারো চোখে পেলে। কেউবা আবার বেছে নেন ম্যারাডোনার উত্তরসূরি মেসিকে। কিন্তু সর্বকালের সেরা নির্ণয়ের কি নির্দিষ্ট কোন মাপকাঠি আছে? নাকি এটি শুধুই ব্যক্তিগত মতামত?

বিভিন্ন প্লেয়ারের মধ্যে তুলনা করাটা কোন সহজ কাজ নয়, বিশেষ করে যখন তাদের খেলার ধরণ ভিন্ন হয়। আর সেই প্লেয়ার রা যদি ভিন্ন জেনারেশনের হয় তাহলে তো কাজটা আরও কঠিন। শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে না গেলেও, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় ফুটবল মাঠের সবচেয়ে ইনফ্লুয়েন্সিয়াল প্লেয়ার ছিলেন আলফ্রেড ডি স্টেফানো। অনেকেই তাকে সর্বকালের সেরাও মনে করেন। কেনো মনে করেন সেটাই আজকের কলামে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

দুর্ভাগ্যক্রমে ফুটবল ইতিহাসের এই কিংবদন্তি কোন বিশ্বকাপ খেলতে পারেন নি। তাই জাতীয় দলের হয়ে অর্জনের খাতাটা প্রায় শূন্যই বলা চলে। কিন্তু ক্লাব ফুটবল কে সম্পূর্ণভাবে নিজের করে নিয়েছিলেন তিনি। খেলোয়াড় এবং কোচ হিসেবে ঝুড়িতে পুরেছেন ট্রফির পর ট্রফি। ক্লাব ফুটবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় দের নামের লিস্ট করতে গেলে তার নামই থাকবে সবার উপরের দিকে।

ডি স্টেফানোর সাথে ম্যারাডোনা ও মেসি Source: cnn.com

তিনি জন্মগ্রহণ করেন আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সে ১৯২৬ সালের ৪ জুলাই। খেলোয়াড়ি জীবন শুরু করেন রিভার প্লেটে। অল্প বয়সেই বুঝিয়ে দেন ফুটবল বিশ্বে নতুন এক তারকার আগমন ঘটেছে। ৪ বছর সেখানে খেলে ৬৬ ম্যাচে করেছিলেন ৪৯ গোল। তারপর যোগ দেন মিলোনারিয়োসে ১৯৪৯ সালে। সেখানেও ৪ বছর খেলে নিজের প্রতিভার ছাপ রেখে গেছেন। ১০১ ম্যাচে ৯০ গোলই তার প্রমাণ দেয়। এই অতিমানবীয় পারফর্মেন্স চোখ এড়ায়নি বড় ক্লাব গুলোর। ফলস্বরুপ ১৯৫৩ তে যোগ দেন স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদে। বাকিটা ইতিহাস। নিজেকে এবং রিয়াল মাদ্রিদকে ফুটবল জগতে চিনিয়েছিলেন নতুন ভাবে। এক দশক ইউরোপে করেছিলো একক রাজত্ব।

স্পেনের এই ক্লাবের হয়ে খেলেছেন দীর্ঘ ১১ বছর। সম্ভাব্য সবকিছুই জিতেছেন এই সময়ে। ভেঙ্গে গড়েছেন একের পর এক রেকর্ড। নিজে জিতেছেন বিশ্বসেরার খেতাব। পরিসংখ্যান টা নিয়ে গেছেন ঈর্ষনীয় পর্যায়ে।

রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে জিতেছেন ৮ টি লিগ শিরোপা, ৫ টি ইউরোপিয়ান কাপ (চ্যাম্পিয়নস লিগ), ১ টি স্প্যানিশ কাপ সহ আরও অনেক শিরোপা। নিজের করে নিয়েছেন অগণিত ব্যক্তিগত পুরষ্কার। বইয়ে দিয়েছিলেন গোলের বন্যা, ফুটবল কে চিনিয়েছিলেন নতুন ভাবে। এই সময়ে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে লা লিগায় করেছিলেন ২৬২ ম্যাচে ২১৬ গোল। ফলস্বরূপ ঘরে তুলেছিলেন ৮ টি লিগ শিরোপা এবং নিজে হয়েছিলেন লিগের সেরা খেলোয়াড়। ছিলেন এল ক্লাসিকোর সর্বোচ্চ গোলদাতা। ইউরোপিয়ান লিগ টা কে যেনও ডাল ভাত বানিয়ে ফেলেছিলেন। পুরো ফুটবল বিশ্ব মুখিয়ে থাকতো শুধু মাত্র ডি স্টেফানোর রিয়াল মাদ্রিদের খেলা দেখার জন্য। অল্প সময়ের মধ্যে ৫ টি ইউরোপিয়ান কাপ তারই প্রমাণ। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ গুলোতে একাই রেজাল্ট বের করে এনেছেন । দলের প্রয়োজনে গোল করে বিপদ থেকে দল উদ্ধার করেছেন বহুবার। টানা পাঁচ ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালে গোল করে রেকর্ড করেছেন। ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালে সবচেয়ে বেশী গোল করার রেকর্ড টাও তার ঝুলিতেই। ১৯৬০ এর ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালে ফ্রাঙ্কফুর্টের বিরুদ্ধে খেলা টি ক্লাব ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যে ম্যাচে হ্যাট্রিক করে দল কে এনে দেন মহা গুরুত্বপূর্ণ শিরোপা। নিঃসন্দেহে রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় তিনি।

রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে জিতা ৫ টি ইউরোপিয়ান কাপের সাথে ডি স্টেফানো
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে জিতা ৫ টি ইউরোপিয়ান কাপের সাথে ডি স্টেফানো Source: daily mail

ক্লাবের হয়ে অর্জনের খাতাটা যেমন পরিপূর্ণ, তেমনি ব্যক্তিগত পুরষ্কারের লিস্ট টাও নেহাত ছোট নয়।

এক নজরে দেখে নেয়া যাক তার ব্যক্তিগত অর্জন গুলো:

  • আর্জেন্টাইন প্রিমেরা ডিভিশন টপ স্কোরার (১৯৪৭)
  • ক্যাম্পিয়ানো প্রফেশনাল টপ স্কোরার (১৯৫১,১৯৫২)
  • পিচিচি ট্রফি (১৯৫৪,১৯৫৬,১৯৫৭,১৯৫৮,১৯৫৯)
  • ব্যালন ডি অর (১৯৫৭,১৯৫৯)
  • ইউরোপিয়ান কাপ টপ স্কোরার (১৯৫৮,১৯৬২)
  • স্প্যানিশ প্লেয়ার অফ দ্যা ইয়ার (১৯৫৭,১৯৫৯,১৯৬০,১৯৬৪)
  • ফিফা অর্ডার অফ মেরিট (১৯৯৪)
  • সুপার ব্যালন ডি অর (১৯৮৯)
  • ওয়ার্ল্ড সকার ওয়ার্ল্ড ইলেভেন (১৯৬০,১৯৬১,১৯৭২,১৯৬৩,১৯৬৪)
  • ওয়ার্ল্ড টিম অফ দ্যা টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি (১৯৯৮)
  • ফিফা ১০০ লিস্ট (ফোর্থ, ২০০৪)
  • গোল্ডেন প্লেয়ার অফ স্পেন (২০০৪)
  • উয়েফা প্রেসিডেন্টস এওয়ার্ড (২০০৭)
  • ওয়ার্ল্ড সকার গ্রেটেস্ট ইলেভেন অফ অল টাইম (২০১৩)
১৯৬০ এর ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালের প্রথম গোলটি করছেন ডি স্টেফানো
১৯৬০ এর ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালের প্রথম গোলটি করছেন ডি স্টেফানো Source: Pinterest

একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে জিতেছেন সুপার ব্যালন ডি অর।

ডি স্টেফানো এমন একজন খেলোয়াড় যার শ্রেষ্ঠত্ব পরিমাপের জন্য কোন পরিসংখ্যানের প্রয়োজন হয় না। ডিফেন্স, পাসিং, ভিশন, স্কিল, গতি, এটাক সব কিছুর পরিপূর্ণ সমন্বয় ছিলেন এই ফুটবলার।

তার সম্পর্কে মিগুয়েল ম্যুনেজ বলেন, “আলফ্রেডো ডি স্টেফানোর বিশেষত্ব হচ্ছে, সে দলে থাকা মানে প্রত্যেক পজিশনে দুইজন করে খেলোয়াড় থাকা”।

এক ইন্টারভিউ তে ফুটবল সম্রাট পেলে বলেন, “মানুষ পেলে ম্যারাডোনা নিয়ে বিতর্ক করে, কিন্তু সবার সেরা হচ্ছে ডি স্টেফানো। অনেক বেশী পরিপূর্ণ”।

পর্তুগাল লিজেন্ড ইউসেবিও তার সম্পর্কে বলেন, “ডি স্টেফানো হচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে পরিপূর্ণ  প্লেয়ার”।

রিয়াল মাদ্রিদ এবং সান্তোসের ম্যাচের পর পেলে এবং ডি স্টেফানো
রিয়াল মাদ্রিদ এবং সান্তোসের ম্যাচের পর পেলে এবং ডি স্টেফানো Source: daily mail

ডন আলফ্রেডো সম্পর্কে মিশেল প্লাতিনি বলেন, “সেরাদের মধ্যে সেরা।

স্যার ববি চার্ল্টন বলেন, “আলফ্রেডো ডি স্টেফানোই আমার দেখা সর্বশ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়। সাধারণভাবেই সে সবচেয়ে বুদ্ধিমান খেলোয়াড়। আমাকে যদি মাত্র একজন কে বেছে নিতে বলা হয় আমার জীবন বাঁচানোর জন্য, আমি তাকেই বেছে নিতাম”।

হেলেনিও হেরেরা বলেন, “আলফ্রেডো ডি স্টেফানোই সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়। পেলের থেকেও সে ভালো।”

গেন্তো বলেন, “ফি স্টেফানোই প্রথম গ্যালাক্টিকো। ইন ফ্যাক্ট, সে তিন গ্যালাক্টিকোর সমমানের।”

দিয়াগো ম্যারাডোনা বলেন, “আমি জানি না আমি পেলে থেকে সেরা কিনা, কিন্তু ডি স্টেফানো নিঃসন্দেহে পেলের চেয়ে সেরা”

২০০৪ সালের এক জরিপে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়ের তালিকায় পেলে, ম্যারাডোনা, ক্রুইফের পরই স্থান পান তিনি। অনেক ফুটবল লিজেন্ড দের মতে তিনিই সর্বকালের সেরা।

২০১৪ সালে এই ফুটবল লিজেন্ড মৃত্যুবরণ করেন। সর্বকালের সেরা নিয়ে এই তর্ক চলবেই, যার কোন শেষ নেই। কিন্তু নিজের এই জাদুকরী খেলার জন্য ফুটবল ভক্তদের মনে যেভাবে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন, তা কখনো মলিন হবে না।

তথ্যসূত্রঃ

১. Realmadrid.com

২. Autobiography of Alfredo De Stefano

৩. Redcafe.net

Leave A Reply

Your email address will not be published.

sativa was turned on.mrleaked.net www.omgbeeg.com

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More