গ্রিক দেবতা জিউসের অন্ধকার দিক: ক্ষমতা ও নিষ্ঠুরতার গল্প

স্কুলের বইয়ে বা কোনো পুরাণের গল্পে জিউসের নাম প্রথম পড়েছিলাম যখন, তখন মনে হয়েছিল এ তো দারুণ একজন দেবতা। আকাশের রাজা, বজ্রপাতের অধিপতি, দেবতাদের দেবতা। মাথায় চুল সাদা, হাতে বজ্র, চোখে রাজকীয় দীপ্তি।

কিন্তু যত বেশি পড়েছি, তত বেশি চমকে উঠেছি।

জিউস যদি আজকের যুগে জন্মাতেন, তিনি দেবতা হিসেবে পূজিত হতেন না। বরং তাকে নিয়ে প্রতিদিন পত্রিকার হেডলাইন হতো। আদালতে মামলা চলত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় উঠত।

গ্রিক পুরাণের সবচেয়ে শক্তিশালী দেবতা একই সাথে ছিলেন সবচেয়ে বিতর্কিত। তাঁর মহিমার গল্প যতটা আছে, অন্ধকারের গল্পও ততটাই আছে। হয়তো একটু বেশিই আছে।

আজকে সেই অন্ধকার দিকটার গল্প বলব। শুরু করি একেবারে শুরু থেকে।

যে ছেলে বাবাকে উপড়ে ফেলল

জিউসের জন্মের গল্পটা দিয়েই বোঝা যায় এই পরিবারটা কেমন ছিল।

জিউসের বাবা ছিলেন ক্রোনাস, টাইটানদের রাজা। ক্রোনাস একটা ভবিষ্যদ্বাণী পেয়েছিলেন যে তার নিজের সন্তানই একদিন তাকে সিংহাসনচ্যুত করবে। এই ভয় থেকে বাঁচার জন্য তিনি একটা অদ্ভুত সমাধান বের করলেন।

প্রতিটি সন্তান জন্মানোর সাথে সাথে তিনি সেটাকে গিলে ফেলতেন।

হ্যাঁ, আক্ষরিক অর্থেই। হেস্টিয়া, ডিমিটার, হেরা, হেডিস, পোসেইডন, একে একে সবাই গেলেন ক্রোনাসের পেটে। মা রিয়া প্রতিবার সন্তান হারিয়ে কাঁদতেন, কিন্তু কিছু করার ছিল না।

যখন জিউসের জন্ম হলো, রিয়া আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি শিশু জিউসকে ক্রেট দ্বীপে লুকিয়ে রাখলেন এবং ক্রোনাসকে একটি পাথর কাপড়ে মুড়িয়ে দিলেন। ক্রোনাস সেটাকেই শিশু মনে করে গিলে ফেললেন।

জিউস বড় হলেন লুকিয়ে। একসময় বাবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেন, ক্রোনাসকে বমি করিয়ে ভাইবোনদের মুক্ত করলেন। তারপর বাবাকে টার্টারাসে নির্বাসন দিলেন।

এখানে একটু থামুন।

জিউস নিজেই একটা ভয়াবহ পরিবারের মধ্যে বড় হয়েছিলেন। এমন একটা পরিবার যেখানে বাবা নিজের সন্তান খেয়ে ফেলেন। মনোবিজ্ঞানীরা হয়তো বলতেন এই শৈশব একটা মানুষের ব্যক্তিত্বকে কীভাবে গড়ে দেয়। কিন্তু জিউসের ক্ষেত্রে দেখা গেল, বাবার অন্ধকার দিকটা তিনি অনেকটাই বহন করলেন নিজের মধ্যে।

অলিম্পাসের সিংহাসনে বসেই যা শুরু হলো

ক্রোনাসকে পরাজিত করে জিউস অলিম্পাসের রাজা হলেন। ভাইদের মধ্যে ভাগাভাগি হলো, হেডিস পেলেন পাতাল, পোসেইডন পেলেন সমুদ্র, জিউস পেলেন আকাশ ও পৃথিবী।

রাজত্ব পেতেই জিউস একটা কাজ শুরু করলেন যেটা তার পুরো পুরাণজুড়ে চলেছে। সেটা হলো ক্ষমতার অপব্যবহার।

জিউস ছিলেন বিবাহিত। তার স্ত্রী হেরা, দেবতাদের রানি। সম্পর্কটা শুধু স্বামী স্ত্রীর নয়, একই সাথে ভাই বোনেরও। গ্রিক পুরাণে এই ব্যাপারটা ছিল, দেবতাদের মধ্যে ভাইবোনের বিয়ে অস্বাভাবিক ছিল না।

কিন্তু বিয়ের পরেও জিউসের চরিত্র কখনো স্থির হয়নি। বরং বলা যায়, সিংহাসনে বসার পর থেকেই তিনি যেন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে ক্ষমতা থাকলে যা খুশি তাই করা যায়।

পুরাণ ঘাঁটলে জিউসের প্রেম বা যোগাযোগের যে তালিকা পাওয়া যায় সেটা এতটাই দীর্ঘ যে গবেষকরা আজও সঠিক সংখ্যা নিয়ে একমত হতে পারেননি। কেউ বলেন পঞ্চাশের বেশি, কেউ বলেন একশোর কাছাকাছি।

কিন্তু সংখ্যার চেয়ে বড় সমস্যা হলো পদ্ধতি।

ছদ্মবেশের রাজনীতি: ক্ষমতার সবচেয়ে কাপুরুষোচিত অস্ত্র

জিউসের সবচেয়ে আলোচিত কৌশল ছিল ছদ্মবেশ। তিনি যখনই কাউকে পছন্দ করতেন, রূপ বদলে যেতেন।

ইউরোপার গল্পটা দিয়ে শুরু করা যাক। ইউরোপা ছিলেন ফিনিশিয়ার রাজকুমারী, অসাধারণ সুন্দরী। জিউস তাকে দেখে মুগ্ধ হলেন।

তিনি একটি সাদা ষাঁড়ের রূপ নিলেন। এতটাই সুন্দর, এতটাই নিরীহ দেখতে যে ইউরোপা কাছে এলেন, আদর করলেন। তারপর ষাঁড়ের পিঠে উঠলেন।

সেই মুহূর্তে জিউস দৌড়াতে শুরু করলেন। সমুদ্র পার হয়ে ক্রেটে নিয়ে গেলেন ইউরোপাকে।

রেনেসাঁ চিত্রকলা শৈলীতে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের উপর সাদা ষাঁড়ের পিঠে বিভ্রান্ত ও ভয়ার্ত ইউরোপা, দূরে ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে উপকূল

লেডার গল্প আরও অদ্ভুত। লেডা ছিলেন স্পার্টার রানি। জিউস এবার হাঁসের রূপ নিলেন। সেই হাঁস লেডার কাছে আসে এবং পরে হেলেন ও পলাক্সের জন্ম হয়।

আলকমেনের ক্ষেত্রে জিউস নিলেন তার স্বামী আম্ফিট্রিয়নের রূপ। মানে স্বামীর বেশে এলেন, আর আলকমেনা বুঝতেই পারলেন না এটা আসলে তার স্বামী নন। সেই সম্পর্ক থেকে জন্ম নিলেন হারকিউলিস।

এই গল্পগুলো পড়তে পড়তে একটা প্রশ্ন বারবার আসে। এখানে কি সম্মতি ছিল? লেডা কি জানতেন এটা জিউস? আলকমেনা কি জানতেন এটা তার স্বামী নন?

উত্তর স্পষ্ট।

গ্রিক পুরাণ এই প্রশ্নগুলোকে সেভাবে দেখেনি কারণ সেই সমাজ এই প্রশ্নগুলো করত না। কিন্তু আজকের দৃষ্টিতে এই গল্পগুলো পড়লে স্পষ্ট বোঝা যায় এগুলো ক্ষমতার অপব্যবহারের গল্প, ছদ্মবেশ ব্যবহার করে প্রতারণার গল্প।

হেরার যন্ত্রণা: যে রানি কখনো শান্তি পাননি

জিউসের অন্ধকার দিক বুঝতে হলে হেরার কথা বলতে হবে।

হেরা ছিলেন দেবতাদের রানি। মর্যাদায়, ক্ষমতায় তিনি ছিলেন অলিম্পাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেবী। কিন্তু তার জীবনটা ছিল একটানা অপমানের গল্প।

স্বামী জিউস প্রতিনিয়ত অন্য নারীর পেছনে ছুটছেন। হেরা জানেন, সবাই জানেন। অলিম্পাসে এটা যেন স্বাভাবিক ঘটনা।

কিন্তু হেরা প্রতিশোধ নিতেন। সমস্যা হলো, প্রতিশোধ তিনি নিতেন সেই নারীদের উপর যাদের উপর জিউস আকৃষ্ট হয়েছিলেন। যেন দোষটা ছিল তাদের, জিউসের নয়।

ইও ছিলেন একজন পুরোহিত তরুণী। জিউস তাঁকে ভালোবাসলেন। হেরা টের পেতেই জিউস ইওকে একটি সাদা গাভীতে পরিণত করলেন লুকানোর জন্য। হেরা বুঝলেন, সেই গাভীকে নিয়ে গেলেন। তারপর একটি শতচক্ষু দৈত্য আর্গাসকে দিয়ে পাহারা বসালেন। সারাক্ষণ নজর রাখার জন্য।

ইও বছরের পর বছর গরু হয়ে ঘুরে বেড়ালেন। তার কী দোষ ছিল?

সেমেলের গল্প আরও করুণ। সেমেলা ছিলেন একজন থেবান রাজকুমারী। জিউসের সাথে তার সম্পর্ক ছিল, এবং তিনি গর্ভবতী হলেন। হেরা জানলেন।

হেরা এলেন বৃদ্ধা দাইয়ের ছদ্মবেশে। সেমেলার কানে দিলেন, তোমার প্রেমিক সত্যিই জিউস কিনা কীভাবে বুঝবে? বলো সে যেন আসল রূপে আসে।

সেমেলা সেটাই চাইলেন জিউসের কাছে। জিউস বাধ্য হলেন, কারণ তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু দেবতার আসল রূপ মানুষ সহ্য করতে পারে না। বজ্র ও আগুনে সেমেলা পুড়ে ছাই হয়ে গেলেন।

হেরা কি সেটা জানতেন? নিশ্চয়ই জানতেন।

এই পুরো গল্পটায় ভিলেন আসলে কে? শুধু কি হেরা? নাকি যে পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন সেই জিউসও?

প্রমিথিউসের শাস্তি: যে ক্ষমা করতে জানতেন না

জিউসের নিষ্ঠুরতার সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হলো প্রমিথিউসের গল্প।

প্রমিথিউস ছিলেন একজন টাইটান। কিন্তু তিতানদের যুদ্ধে তিনি জিউসের পক্ষে ছিলেন, মানব জাতির প্রতি তার গভীর ভালোবাসা ছিল। দেবতারা আগুন মানুষের থেকে লুকিয়ে রাখতেন, কারণ আগুন মানে ক্ষমতা, জ্ঞান, উন্নতি।

প্রমিথিউস দেবতাদের নিষেধ উপেক্ষা করে মানুষকে আগুন দিলেন।

জিউস ক্রোধে অন্ধ হয়ে গেলেন।

শাস্তিটা ছিল ভয়ঙ্কর। প্রমিথিউসকে কককেশাস পর্বতে একটি পাথরের সাথে শেকল দিয়ে বাঁধা হলো। প্রতিদিন একটি ঈগল এসে তার যকৃৎ ঠোকরে খেত। রাতে যকৃৎ আবার জন্মাত। পরের দিন আবার একই ঘটনা। এটা চলল যুগের পর যুগ।

প্রমিথিউস মানুষের জন্য ভালো কিছু করেছিলেন। এটাই ছিল তার অপরাধ।

এই গল্পটা পড়লে জিউসকে দেবতা না ভেবে একজন নিরঙ্কুশ স্বৈরশাসক মনে হয়। যে ক্ষমতার বিরোধিতা করে, তাকে এমন শাস্তি দাও যেটা শুনলেই বাকিরা ভয়ে কাঁপবে।

প্যান্ডোরার বাক্স: প্রতিশোধের অস্ত্র হিসেবে একজন নারী

প্রমিথিউসকে শাস্তি দিলেও জিউসের রাগ মানুষের উপর থেকে কমল না। কারণ মানুষ আগুন পেয়ে সুখী হচ্ছে, উন্নতি করছে। এটা জিউস মেনে নিতে পারছিলেন না।

তাই তিনি হেফেস্টাসকে দিয়ে তৈরি করলেন প্যান্ডোরাকে, প্রথম নারী। তাকে সাজিয়ে দিলেন সৌন্দর্য, কৌতূহল, মিষ্টি কণ্ঠ দিয়ে। আর দিলেন একটি বাক্স, যেটা কখনো খুলতে নেই।

প্যান্ডোরাকে পাঠানো হলো মানুষের কাছে।

হন্টিং ক্লাসিক্যাল চিত্রকলায় প্যান্ডোরা সোনালি বাক্সের সামনে, ঢাকনা থেকে ঘূর্ণায়মান অন্ধকার ও দানবীয় রূপ বের হচ্ছে, একটি ক্ষুদ্র আলো বাক্সে রয়ে গেছে

কৌতূহলবশত প্যান্ডোরা বাক্স খুললেন। ভেতর থেকে বের হলো রোগ, দুঃখ, ঈর্ষা, ঘৃণা, যুদ্ধ, মৃত্যু, পৃথিবীর সব দুর্ভোগ।

এই গল্পটার একটা বড় সমস্যা আছে। প্যান্ডোরাকে তৈরিই করা হয়েছিল একটি উদ্দেশ্যে, মানুষকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। কিন্তু দোষ দেওয়া হলো প্যান্ডোরাকে। কৌতূহলী নারীই সব সমস্যার কারণ, এই বার্তাটা পুরাণের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো।

জিউস পুরো পরিকল্পনাটা করলেন, কিন্তু ইতিহাস মনে রাখল প্যান্ডোরার নাম।

এটা কি শুধু পুরাণের গল্প? নাকি ক্ষমতাবানরা যুগে যুগে যেভাবে নিজের দায় অন্যের ঘাড়ে চাপায়, তারই একটি প্রাচীন উদাহরণ?

নিওবির ট্র্যাজেডি: অহংকারের শাস্তি নাকি নিষ্ঠুরতা?

নিওবে ছিলেন একজন রানি, গর্বিত মা। তার ছিল চোদ্দটি সন্তান, সাত ছেলে সাত মেয়ে। এই সন্তানদের নিয়ে তিনি এতটাই গর্বিত ছিলেন যে একদিন বলে ফেললেন, দেবী লেটোর মাত্র দুটি সন্তান, আর আমার চোদ্দটি। আমি কি লেটোর চেয়ে বেশি পূজার যোগ্য নই?

লেটোর দুটি সন্তান ছিল অ্যাপোলো ও আর্টেমিস।

খবর পৌঁছাল অলিম্পাসে। অ্যাপোলো ও আর্টেমিস নেমে এলেন পৃথিবীতে। একে একে নিওবির সাতটি ছেলেকে তীর মেরে হত্যা করলেন। তারপর সাতটি মেয়েকেও।

নিওবে পাথর হয়ে গেলেন দুঃখে। পুরাণ বলে তিনি এখনো কাঁদছেন।

এই শাস্তিটা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল? একজন মা অহংকারী কথা বললেন, আর তার শাস্তি হলো চোদ্দটি নিরপরাধ শিশুর মৃত্যু?

এটা কি ন্যায়বিচার, নাকি দেবতাদের অহংকার?

ট্যান্টালাসের শাস্তি: যে শাস্তির নাম হয়ে গেছে একটি শব্দ

ট্যান্টালাস ছিলেন জিউসের পুত্র। তিনি দেবতাদের সাথে বসে খেতে পারতেন, এটা ছিল বিরল সম্মান।

কিন্তু একদিন তিনি দেবতাদের পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। নিজের ছেলে পেলোপসকে হত্যা করে রান্না করলেন এবং দেবতাদের পরিবেশন করলেন। দেখতে চাইলেন দেবতারা বুঝতে পারেন কিনা।

দেবতারা বুঝলেন। ক্রোধান্বিত হলেন।

জিউস ট্যান্টালাসকে পাঠালেন টার্টারাসে। সেখানে একটি হ্রদের মাঝে তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন। পানি তার থুতনি পর্যন্ত আসে, কিন্তু যখনই পান করতে চান পানি নেমে যায়। মাথার উপর ফলের গাছ, কিন্তু হাত বাড়ালেই ডাল সরে যায়। চিরকাল ক্ষুধার্ত, চিরকাল তৃষ্ণার্ত।

এই গল্প থেকেই ইংরেজিতে এসেছে Tantalize শব্দটা। কাছে থেকেও পাওয়া যাচ্ছে না এই অনুভূতিকে এখন Tantalize বলা হয়।

ট্যান্টালাসের অপরাধ ছিল ভয়াবহ, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু শাস্তিটাও ছিল অনন্তকালের, নিষ্ঠুর।

গ্যানিমিড: ক্ষমতার সবচেয়ে নির্লজ্জ প্রকাশ

এই গল্পটা অনেকে এড়িয়ে যান। কিন্তু জিউসের অন্ধকার দিক বুঝতে হলে এটা না বললে অসম্পূর্ণ থাকবে।

গ্যানিমিড ছিলেন ট্রয়ের এক রাজপুত্র, অসাধারণ সুন্দর এক কিশোর। জিউস তাকে দেখলেন এবং পছন্দ করলেন।

তিনি একটি ঈগলের রূপ নিলেন, নেমে এলেন পৃথিবীতে এবং গ্যানিমিডকে তুলে নিয়ে গেলেন অলিম্পাসে। গ্যানিমিডকে দেবতাদের পানীয় পরিবেশনকারী করা হলো।

গ্যানিমিডের পরিবার? তারা কাঁদতে কাঁদতে রইলেন। জিউস তাদের কিছু ঘোড়া পাঠিয়ে দিলেন ক্ষতিপূরণ হিসেবে।

একটি ছেলেকে তুলে নিয়ে গিয়ে তার পরিবারকে ঘোড়া দিয়ে দেওয়া হলো। যেন এটা একটি বাণিজ্যিক লেনদেন।

এই গল্পটা গ্রিক পুরাণে গৌরবের সাথেই বলা হয়েছে। কিন্তু আজকের দৃষ্টিতে এটা ক্ষমতার সবচেয়ে বেপরোয়া অপব্যবহারের উদাহরণ।

হেরার প্রতিশোধ যখন হারকিউলিসের উপর পড়ল

জিউসের অন্যায়ের মাশুল অনেক সময় গুনতে হয়েছে নিরপরাধ মানুষদের।

হারকিউলিস ছিলেন জিউস ও আলকমেনার পুত্র। তার জন্মই ছিল প্রতারণার ফল, কারণ জিউস আলকমেনার স্বামীর রূপ নিয়ে এসেছিলেন। হারকিউলিসের এতে কোনো দোষ ছিল না।

কিন্তু হেরা এই শিশুটাকেই বেছে নিলেন তার রাগের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে।

হারকিউলিস যখন দোলনায় শুয়ে আছেন শিশু হয়ে, হেরা দুটো বিষধর সাপ পাঠিয়ে দিলেন। হারকিউলিস সেই সাপ দুটো মেরে ফেললেন নিজের ছোট হাতে।

কিন্তু হেরার প্রতিশোধ থামল না। বড় হওয়ার পর হারকিউলিস যখন বিয়ে করলেন, সুখী সংসার করছেন, হেরা তাকে পাগল করে দিলেন। সেই পাগলামির ঘোরে হারকিউলিস নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যা করলেন।

যখন জ্ঞান ফিরল, হারকিউলিস দেখলেন তার চারপাশে কী হয়েছে।

এই ট্র্যাজেডির মূলে ছিল জিউসের প্রতারণা। হেরার রাগের মূলে ছিল জিউসের বিশ্বাসঘাতকতা। কিন্তু মাশুল দিল হারকিউলিস, তার নিরপরাধ স্ত্রী, তার ছোট শিশুরা।

ক্ষমতা যখন দেবত্বের মুখোশ পরে

এতক্ষণ ধরে যে গল্পগুলো বললাম, এগুলো পড়তে পড়তে একটা কথা বারবার মাথায় আসে।

জিউস কি আসলে একজন দেবতা, নাকি তিনি হলেন একজন অতিশক্তিশালী মানুষের প্রতিচ্ছবি? এমন একজন মানুষ যার হাতে অসীম ক্ষমতা আছে, জবাবদিহিতা করতে হয় না কাউকে, আর তাই যা খুশি তাই করেন?

গ্রিক পুরাণের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এখানে দেবতারা মানুষের মতোই আবেগপ্রবণ, লোভী, ঈর্ষাপরায়ণ, প্রতিশোধপরায়ণ। হিন্দু বা আব্রাহামিক ধর্মের দেবতাদের মতো তারা নিখুঁত নন।

অনেক পণ্ডিত মনে করেন গ্রিক পুরাণ আসলে সেই সমাজের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। রাজারা যখন যা খুশি করতেন এবং সেটা দেবতার ইচ্ছা বলে প্রচার করা হতো। ক্ষমতাবানদের অন্যায়কে পুরাণের মোড়কে বৈধতা দেওয়া হতো।

জিউসের প্রতিটি কুকর্মের পর দেখা যায় গল্পটাকে এমনভাবে বলা হয় যেন এটা স্বাভাবিক, এমনকি মহিমান্বিত। ইউরোপাকে অপহরণ করলেন, একটা মহাদেশের নাম হলো তার নামে। গ্যানিমিডকে নিয়ে গেলেন, সে হলো দেবতাদের সেবক। প্রমিথিউসকে শাস্তি দিলেন, সেটা হলো দেবতার ন্যায়বিচার।

শেষ কথা

জিউস দেবতাদের রাজা ছিলেন, এটা ঠিক। তাঁর শক্তি, তাঁর মহিমার গল্পও কম নয়। মানবজাতিকে রক্ষা করেছেন অনেকবার, ন্যায়বিচার করেছেন বহু ক্ষেত্রে।

কিন্তু পুরাণের শুধু উজ্জ্বল দিকটা দেখলে পুরোটা বোঝা যায় না।

জিউসের অন্ধকার দিকটা আসলে একটা চিরন্তন সত্যকে সামনে নিয়ে আসে। ক্ষমতা মানুষকে, এমনকি দেবতাকেও, অন্ধ করে দিতে পারে। যার কাছে জবাবদিহিতা নেই, সে একসময় ন্যায় আর অন্যায়ের পার্থক্য ভুলে যায়। আর সেই ভুলের মাশুল দিতে হয় নিরপরাধদের।

হাজার বছর আগে গ্রিকরা এই গল্পগুলো লিখে রেখে গেছেন। হয়তো এটা শুধু পুরাণ নয়, এটা একটা সতর্কবার্তাও।

ক্ষমতা যখন জবাবদিহিতার বাইরে চলে যায়, তখন দেবতাও দানব হয়ে যেতে পারেন।

Comments are closed.