ক্রিসমাসঃ ইতিহাসের অভিজাত এক ধর্মীয় উৎসবের ইতিবৃত্ত (পর্ব ১)

1

প্রায় দু’হাজার বছর আগে ‘ঈসা মাসীহ্’ তথা যীশু খ্রিষ্টের জন্ম হলেও ক্রিসমাস বা বড়দিন পালন শুরু হয় তারও অনেক পরে। এমনকি যীশুর শিষ্যরাও কখনো তাঁর জন্মোৎসব পালন করেননি। শুরুর দিকে খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় উৎসবের অন্তর্ভুক্তও ছিল না বড়দিন। দ্বিতীয় শতাব্দীর দুজন খ্রিষ্টধর্মগুরু ও ইতিহাসবিদ ইরেনাউস ও তার্তুলিয়ান বড়দিনকে খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় উৎসবের তালিকায় যুক্ত করেন।

ক্রিসমাস ডে’র ইতিহাসঃ

সর্বপ্রথম ২০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে মিসরে বড়দিন পালনের প্রমাণ পাওয়া যায়। গ্রিক কবি, লেখক ও ইতিহাসবিদ লুসিয়ান তার সময়ে ক্রিসমাস পালিত হত বলে উল্লেখ করেছেন। ২২১ খ্রিস্টাব্দে মিসরের একটি দিনপঞ্জিতে লেখা হয়েছিল, মাতা মেরী ২৫ মার্চ গর্ভধারণ করেন। এ বিষয়টি রোমান ক্যালেন্ডারেও ছিল। এ ক্যালেন্ডারে সূর্যদেবতা স্যাটার্ন এর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের উৎসবের কথাও রয়েছে। সে হিসাবে গর্ভধারণের নয় মাস পর ২৫ ডিসেম্বর যীশু জন্মগ্রহণ করেন বলে খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরা মত দেন।

ইতিহাসমতে, ৩৩৬ খ্রিস্টাব্দে রোমে বড় আকারে বড়দিন উৎযাপন শুরু হয় ‘স্যাটার্নালিয়া’ উৎসবকে কেন্দ্র করে। এরপর তা ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য দেশেও। ৩৫৪ খ্রিস্টাব্দে রোমান পঞ্জিকায় ২৫ ডিসেম্বর যীশুর জন্মদিন উল্লেখ করে দিনটিকে যীশুর জন্মদিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ৪৪০ খ্রিষ্টাব্দে পোপ কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করে দিনটি।

যদিও প্রাচ্যের দেশগুলোতে তখনও জানুয়ারি মাসেই পালন করা হতো খ্রিস্টের জন্মদিবস। তবে রোমান প্রভাবের ফলশ্রুতিতে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালনের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে প্রাচ্যের দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে।

খ্রিস্টধর্ম ছড়িয়ে পড়ার আগ থেকেই শীতের শেষে নানারকম উৎসবের চল ছিলো গোটা ইউরোপ জুড়ে। আধুনিক ক্রিসমাস উৎসবের অনেক রীতিনীতিও সেসব উৎসবেরই সংকলন বলে অনেকের বিশ্বাস।

ক্রিসমাস বা বড় দিন
Source: www.history.com

সূর্যদেবতাকে উপলক্ষ্য করে রোমানরা যে পূঁজা, অর্চনা ও উৎসব পালন করতো তাতে ছিলো উপহার আদান-প্রদানের রীতি, যা আধুনিক ক্রিসমাস পালনের অন্যতম একটি অঙ্গ হিসেবে এখন প্রচলিত। একইভাবে জার্মান উৎসবগুলো থেকে এসেছে নানারকম খাবার দাবার তৈরী ও উপভোগের রীতি, আর রোমান নববর্ষ উৎসবের অনুকরণে প্রচলিত হয়েছে আলোকসজ্জা।
ইউরোপজুড়ে খ্রিস্ট ধর্ম ছড়িয়ে পড়ার আগে যে প্যাগান সংস্কৃতি চালু ছিলো স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে, তাতে শীতের শেষে এবং বসন্তের আগে পালন করা উৎসবগুলো ছিলো সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ।

কালে কালে সেসব উৎসব হারিয়ে গেলেও ক্রিসমাসের মনকাড়া আয়োজনগুলোর মধ্যেই এখনো বেঁচে আছে সেসব উৎসবের স্মৃতি।

মধ্যযুগে বড়দিন উৎসব আরও জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ৮০০ খ্রিস্টাব্দের ২৫ ডিসেম্বর জার্মানির রাজা রোমান সম্রাট হিসেবে গীর্জা কর্তৃক মুকুট ধারণ করেন। ১০০০ খ্রিস্টাব্দে রাজা সেন্ট স্টিফেন হাঙ্গেরিকে খ্রিষ্টান রাজ্য ঘোষণা করেন। ১০৬৬ খ্রিস্টাব্দে রাজা উইলিয়াম ইংল্যান্ডের মুকুট ধারণ করেন। ক্রিসমাস উৎসবের প্রসারে ঘটনাগুলো বেশ প্রভাব ফেলে।
মধ্যযুগে ক্রিসমাস পালনের প্রধান আকর্ষণ ছিলো প্রজা ও রাজাদের মধ্যে উপহার আদান-প্রদান, গণ ভোজসভা এবং খেলাধুলা ও নাচ-গানের উৎসব।

ক্রিসমাস ক্যারল বা ক্রিসমাসের গান এসময়েই জনপ্রিয়তা পায়।
তবে,
অষ্টাদশ শতাব্দীতেই প্রোটেস্ট্যান খ্রিস্টানদের উত্থানের পর থেকে ক্রিসমাসকে ক্যাথলিক উৎসব ঘোষণা দিয়ে বহু জায়গায় ক্রিসমাস বর্জনের ডাক দেয় বিশুদ্ধতাবাদীরা (তাদের অভিযোগ ছিল, উৎসবটি পৌত্তলিক ও ধর্মীয়ভাবে এর কোন তাৎপর্য নেই)। এতে করে প্রায়ই ক্রিসমাস পরবর্তী দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়তো প্রোটেস্ট্যান্ট অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ইংল্যান্ডের গোঁড়া শাসকরা ১৬৪৭ সালে বড়দিন উৎসব পালন নিষিদ্ধ করে। অবশ্য একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর এ নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়া হয়। এমনকি খোদ আমেরিকার বোস্টনে মৌলবাদী প্রোটেস্ট্যান্টরা ১৬৫৯ থেকে ১৬৮১ সাল পর্যন্ত আইন পাশ করে বড়দিন উদযাপন বন্ধ রেখেছিলো। ধীরে ধীরে গোঁড়ামি কমতে থাকলে একসময় আবারো ক্রিসমাস তার জনপ্রিয়তা ফিরে পায় ।

বিশেষত চার্লস ডিকেন্সের জনপ্রিয় উপন্যাস “অ্যা ক্রিসমাস ক্যারল” এর মাধ্যমেই আনন্দ ও উপভোগের দিন হিসেবে ক্রিসমাসের পুনর্জাগরণ ঘটে। এরপর থেকেই নানা গল্প, কবিতা এবং সংবাদমাধ্যমের বরাতে ক্রিসমাস হয়ে ওঠে উৎসব ও উচ্ছ্বাসের আরেক নাম । ইউরোপীয় শাসনাধীন কলোনীগুলোতে ক্রিসমাস পৌঁছে যায় সাংস্কৃতিক উৎসব হয়ে । আর এখন তো ক্রিসমাস পালিত হচ্ছে গোটা বিশ্বজুড়ে।

ভারতবর্ষে প্রথম ক্রিসমাস উৎযাপিত হয় ১৬৬৮ সালে। কলকাতা নগরীর গোড়াপত্তনকারী জব চার্ণক প্রথম বড়দিন পালন শুরু করেন বলে জানা যায়। সে বছর হিজলি যাওয়ার পথে সুতানুটি গ্রামে আসার পর চার্ণক খেয়াল করলেন, বড়দিন এল বলে! সেখানেই যাত্রাবিরতি করে বড়দিন পালন করেন চার্ণক। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালিত হলেও রাশিয়া, জর্জিয়া, মিসর, আর্মেনিয়া, ইউক্রেন ও সার্বিয়ায় ব্যতিক্রম। জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এ দেশগুলোর অধিকাংশ অঞ্চলের চার্চে এখনও ক্রিসমাস পালিত হয় ৭ জানুয়ারি। (কেননা জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের ২৫ ডিসেম্বর অনুযায়ী জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ৭ জানুয়ারি পড়ে)। উত্তর ইউরোপীয়রা যখন খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে তখন পৌত্তলিকতার প্রভাবে ক্রিসমাস শীতকালীন উৎসবের মতো পালন শুরু হয়। ফলে সেখানকার এ উৎসবে শীত উৎসবের অনুষঙ্গও যুক্ত হয়েছে। এখনও পর্যন্ত স্ক্যান্ডিনেভীয়রা এ দিনটিকে জুন উৎসব বলে থাকে।

সময়ের আবর্তে বড়দিন পেয়েছে সার্বজনীন উৎসবের আবহ। একই সঙ্গে বড়দিন পালনে যুক্ত হয়েছে নানান অনুসঙ্গ। প্রায় দুই হাজার বছর আগে পৃথিবীর মানুষকে যীশু খ্রিষ্ট দেখিয়েছিলেন মুক্তি ও কল্যাণের পথ। বড়দিনে তাই খ্রিষ্টকে গভীরভাবে স্মরণ করেন সারা বিশ্বের খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীরা।

ক্রিসমাস শব্দের উৎপত্তি ও খ্রিষ্টের জন্মঃ

ইংরেজী ‘ক্রিসমাস’ শব্দটি মূলত গ্রীক ও লাতিন শব্দের সমন্বয়। যদিও রক্ষণশীল ইংরেজরা তা একেবারেই মানতে নারাজ। তাদের মতে, শব্দটির ব্যুৎপত্তি ঘটে মধ্যযুগীয় ইংরেজি ‘Christe masse’ ও আদি ইংরেজি ‘Cristes masse’শব্দ থেকে। শেষোক্ত শব্দটির প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় ১০৩৮ সালের একটি রচনায়। “Cristes” শব্দটি আবার গ্রীক Christos এবং “masse” শব্দটি লাতিন “missa” শব্দ থেকে আগত। প্রাচীন গ্রীসের Christos (χριστος) বানানের আদ্য অক্ষরটি লাতিনঅক্ষর ‘এক্স’ এর সমরূপ। ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে তাই এক্স অক্ষরটি খ্রিষ্টেরর নামের শব্দ সংক্ষেপ হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। এই কারণেই ক্রিসমাসের নামসংক্ষেপ হিসেবে এক্সমাস(Xmas) কথাটি চালু হয়। বাংলা অভিধানে যীশু খ্রিষ্টের জন্মোৎসবকে বড়দিন আখ্যা দেওয়ার কারণটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে : “২৩ ডিসেম্বর থেকে দিন ক্রমশ বড়ো এবং রাত ছোটো হতে আরম্ভ করে”।  খ্রিষ্টের জন্ম আসলে কখন হয়েছে সে বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কেউই নিশ্চিত নয়। তেমন কোন মজবুত দলিলাদিও পাওয়া যায়না ইতিহাসে। এমনকি খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বাইবেলেও খ্রিষ্টের জন্ম তারিখ ও জন্ম ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলা নেই। তবে এ সম্পর্কিত দুটি প্রচলিত মত পাওয়া যায়। যীশুর মৃত্যুর পর তাঁর আত্মদান স্মরনে ইস্টার সানডে পালন করা হলেও, জন্মদিন পালন করা হতো না। চতুর্থ খ্রিষ্টাব্দের আগে রোমান শাসকেরাও ২৫ জিসেম্বর যীশুর জন্মদিন নির্ধারণ করেননি। সে সময় রোমে সূর্যদেবতার উপাসনার পাশাপাশি বছরের দীর্ঘ ও ক্ষুদ্রতম দিনও উদ্যাপন করা হতো। রোমান ক্যালেন্ডার অনুসারে, শীতের ক্ষুদ্রতম দিন ছিল ২৫ ডিসেম্বর। রোমান নেতারা ভাবলেন, যীশুর জন্মদিন যদি ২৫ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়, তাহলে আরও অনেক অবিশ্বাসী খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করবে। কেননা, অবিশ্বাসীরাও তখন রোমান দেবতা স্যাটার্ন ও পারস্য আলোর দেবতার মিথরা’র পূঁজা করতো। আর তা হতো একই দিনে ২৫ ডিসেম্বর।  তবে এই ২৫ ডিসেম্বর তারিখটি নির্ধারণ করার পেছনে আরও একটি কারণ আছে, সেটা সম্ভবত ধর্মতাত্ত্বিক। ইতিহাসবিদেরা বলেন, দুনিয়া সৃষ্টি হয়েছে বসন্তের কোন এক দিনে, যখন দিন-রাত্রি সমান। তার চার দিন পর ২৫ মার্চ আলোর সৃষ্টি হয়। যীশুর জন্ম এক নতুন কালের ইঙ্গিত দেয় বলে বাইবেলের ভাষ্যকারেরা ধরে নেন। যীশুকে তাঁর মা গর্ভধারণ করেন ২৫ মার্চ। ফলে তাঁরা তাঁর জন্মের তারিখ নির্ধারণ করেন ২৫ ডিসেম্বর, ঠিক নয় মাস পর। খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী ও ধর্মগুরুদের মত অনুসারে, দুই হাজার বছরের কিছু আগে মাতা মেরীর (বিবি মরিয়ম) গর্ভে জন্মেছিলেন যীশু। মেরী ছিলেন ইসরাইলের নাজারেথবাসী যোসেফের বাগদত্তা। সৎ, ধর্মপ্রাণ ও সজ্জন এ মানুষটি পেশায় ছিলেন একজন কাঠমিস্ত্রী। একদিন এক স্বর্গদূতের কাছ থেকে মরিয়ম জানতে পারেন, মানুষের মুক্তির পথ দেখাতে তাঁর গর্ভে আসছেন ঈশ্বরের পুত্র। দূত শিশুটির নাম রাখার নির্দেশ দেন যীশু। স্বর্গদূতের এ কথা শুনে দারুণভাবে বিচলিত হন মাতা মেরী। স্বর্গদূতের কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘স্বামীর শারীরিক স্পর্শ ছাড়াই তিনি কীভাবে সন্তানের জন্ম দেবেন’?স্ব র্গদূত মেরীকে বলেন, ঈশ্বরের পবিত্র আত্মার প্রভাবেই মেরী গর্ভবতী হবেন এবং ছেলে সন্তানের জন্ম দিবেন। স্বর্গদূতের এ কথা মেরী আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেন এটা জেনেও যে কুমারী অবস্থায় গর্ভধারণ করায় তাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা হতে পারে (তখনকার ইহূদী নিয়ম অনুযায়ী)। মেরীর হবু স্বামী যোসেফ যখন জানতে পারেন মেরী সন্তানসম্ভবা, তখন তাকে আর বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ঈশ্বরের দূত স্বপ্নে তাকে দেখা দিয়ে বলেন, মেরী গর্ভবতী হয়েছে ঈশ্বরের পবিত্র আত্মার প্রভাবে এবং তার যে সন্তান হবে তা ঈশ্বরেরই পরিকল্পনা। অতএব, যোসেফ যেন মেরীকে সন্দেহ না করে তাকে গ্রহণ করেন। মাতা মেরীর সন্তান প্রসবের সময় যখন ঘনিয়ে আসে, ঠিক সেই সময় রোমান সম্রাট অগাস্টাস সিজার আদমশুমারী শুরু করেন। তিনি নির্দেশ দেন যার যার পিতৃপুরুষদের শহরে গিয়ে নাম লিপিবদ্ধ করতে হবে। যোসেফের পিতৃপুরুষরা ছিলেন যিহূদিয়ার (বর্তমান ফিলিস্তিন) বেথলেহেমের। যোসেফ তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রী মেরীকে নিয়ে নাম লেখাতে চলে যান সেখানে। কিন্তু নাম লেখাতে প্রচুর লোক আসায় তারা থাকার জন্য কোনো জায়গা পেলেন না। সে সময় বেথেলহেমের একজন অধিবাসী তাদের গোয়াল ঘরে থাকতে দেন। সেখানেই মাতা মেরী সন্তান প্রসব করেন এবং শিশুটিকে কাপড়ে জড়িয়ে যাবপাত্রে (যে পাত্রে পশুদের ঘাস, খড় বা পানি খেতে দেওয়া হয়) রাখেন। স্বর্গদূতের কথামতো যোসেফ শিশুটির নাম রাখলেন যীশু (ঈসা আঃ)।

ক্রিসমাস বা বড় দিন
Source: dailymail.co.uk

যীশুর জন্মের সময় বেশ কয়েকটি অলৌকিক ঘটনা ঘটে। সে সময়ে মাঠে মেষ চড়ানো রাখালদের কাছে গিয়ে স্বর্গদূত যীশুর জন্মের খবর দেন। বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী রাখালরা তখনই যীশুকে দেখতে যান এবং উপহার হিসেবে সঙ্গে নিয়ে যান একটি ভেড়ার বাচ্চা। প্রায় একই সময় আকাশে একটি উজ্জ্বল তারা দেখা যায় যেটা দেখে কয়েকজন জোতির্বিদ ও ম্যাজাই বুঝতে পারেন যে মর্তে এক বিশেষ শিশুর জন্ম হয়েছে। বাইবেলের ম্যাথিউ ও লুক ভার্সনের বর্ণনায় যাদের জ্ঞানী মানুষ বলা হয়েছে। তারাও অনেক খোজাখুঁজি করে যীশুকে দেখতে আসেন এবং ধূপ,স্বর্ণ ও গন্ধতৈল উপহার দেন। এভাবে একের পর এক অলৌকিক ঘটনার মধ্য দিয়ে যীশু খ্রিষ্ট বড় হন এবং মানুষের মাঝে মুক্তির বাণী প্রচার করতে থাকেন। তিনি নিজেও অনেক অলৌকিক কাজ করেছেন। যার মধ্যে জলকে আঙ্গুরের রসে রূপান্তর থেকে শুরু করে অন্ধকে দৃষ্টিদান সহ মৃত ব্যক্তিকে জীবন দানের মতো ঘটনার বর্ণনা বাইবেলে পাওয়া যায়। এ সবকিছুই তিনি করতেন ঈশ্বরের পবিত্র আত্নার সহায়তায়। আর এ থেকেই মূলত ত্রিনিটি (পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্না) মতবাদের প্রচলন ঘটে খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের মাঝে। কিন্তু যীশুর শিক্ষা ও আশ্চর্য কাজ ইহুদি ধর্মগুরুদের ঈর্ষান্বিত করে তুলে। ফলে তারা রোমান শাসকদের কাছে যীশুর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে ক্রুশ বিদ্ধ করে হত্যা করেন বলে ধারনা করা হয়(যদিও অন্যান্য ধর্ম অনুযায়ী এমনটা মানা হয় না)। বাইবেল অনুযায়ী এটাও ছিল ঈশ্বরের পরিকল্পনা।

বড়দিনের সাজসজ্জা, মুখরোচক খাবার ও ক্রিসমাস ট্রিঃ

ক্রিসমাস বা বড় দিন
Souce: blogs.nottingham.ac.uk

বড়দিনের সর্বশেষ প্রস্তুতিটি নেওয়া হয় ক্রিসমাস পূর্বসন্ধ্যায়। বড়দিন উৎসব পর্বের অন্যতম অঙ্গ হল গৃহসজ্জা ও উপহার আদানপ্রদান। কোনো কোনো খ্রিষ্টীয় শাখা সম্প্রদায়ে ছোটো ছেলেমেয়েদের দ্বারা খ্রিষ্টের জন্মসংক্রান্ত নাটক অভিনয় এবং ক্যারোল গাওয়ার প্রথা বিদ্যমান। আবার খ্রিষ্টানদের কেউ কেউ তাঁদের গৃহে পুতুল সাজিয়ে খ্রিষ্টের জন্মদৃশ্যের ছোটো প্রদর্শনী করে থাকেন। চার্চগুলোতেও রাখা হয় এধরনের আয়োজন। এই দৃশ্যকে নেটিভিটি দৃশ্য বা ক্রিব বলা হয়। এই ধরনের প্রদর্শনীই উৎসবের মুখ্য আকর্ষণ হয়ে ওঠে। খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দীতে রোমেও নেটিভিটি দৃশ্য প্রচলিত ছিল। ১২২৩ সালে সেন্ট ফ্রান্সিস অফ আসিসি এগুলিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। এরপর দ্রুতই তা সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও লাইভ নেটিভিটি দৃশ্য ও ট্যাবলো ভাইভ্যান্টও অনুষ্ঠিত হয়; এই জাতীয় অনুষ্ঠানে অভিনেতা ও জন্তুজানোয়ারের সাহায্যে যীশুর জন্মদৃশ্যের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়। চিত্রশিল্পে যীশুর জন্মদৃশ্য ফুটিয়ে তোলার ঐতিহ্যটি সুদীর্ঘ। এই সকল দৃশ্যে মাতা মেরী, যোসেফ, শিশু যীশু, স্বর্গদূত, মেষপালক এবং যীশুর জন্মের পর বেথলেহেমের তারার সাহায্যে পথ চিনে তাঁকে দর্শন করতে আসা বালথাজার, মেলকোয়ার ও ক্যাসপার নামক তিনজন জ্ঞানী ব্যক্তির চিত্রও অঙ্কন করা হয়। যে সকল দেশে খ্রিষ্টান সংস্কার প্রবল, সেখানে দেশজ আঞ্চলিক ও লোকসংস্কৃতির সঙ্গে মিলনের ফলে বড়দিন উদযাপনে নানা বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। বেশিরভাগ খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীর কাছে ধর্মীয় উপাসনায় অংশ নেওয়া এই উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। উল্লেখ্য, বড়দিন ও ইস্টারের মৌসুমেই গির্জায় জনসমাগম হয় সর্বাধিক। অনেক ক্যাথলিক দেশে খ্রিষ্টমাসের পূর্বদিন ধর্মীয় শোভাযাত্রা বা কুচকাওয়াজেরও আয়োজন করা হয়। অন্যান্য দেশে সান্তাক্লজ ও অন্যান্য পৌরণিক চরিত্রদের নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। এ মৌসুমের অন্যতম বহুলপ্রচলিত বৈশিষ্ট্য হল পারিবারিক সম্মেলন ও উপহার আদান-প্রদান। অধিকাংশ দেশেই বড়দিন উপলক্ষে উপহার আদান-প্রদান হয়; আবার কোনো কোনো দেশে এই প্রথাটির জন্য বেছে নেওয়া হয় ৬ ডিসেম্বরের সেন্ট নিকোলাস ডে বা ৬ জানুয়ারির এপিফেনি উৎসবের দিনগুলি। প্রায় প্রতিটি খ্রিষ্টান পরিবারেই বড়দিন উপলক্ষে বিশেষ পারিবারিক ভোজসভা আয়োজিত হয়। ভোজসভার খাদ্যতালিকা অবশ্য এক এক দেশে এক এক রকমের হয়। ইতালির সিসিলি সহ বেশকিছু অঞ্চলে ক্রিসমাসের পূর্বসন্ধ্যায় যে ভোজসভা আয়োজিত হয় তাতে পরিবেশিত হয় বারো রকমের মাছ। ইংল্যান্ড ও পশ্চিমা সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবান্বিত দেশগুলিতে সাধারণ বড়দিনের ভোজসভার পদে দেখা যায় টার্কি (উত্তর আমেরিকা থেকে আনীত), আলু, শাকসবজি, সসেজ ও গ্রেভি; এছাড়াও থাকে ক্রিসমাস পুডিং , মিন্স পাই ও ফ্রুট কেক । পোল্যান্ড, পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য দেশ ও স্ক্যান্ডিনেভিয় ান অঞ্চলের ভোজে মাছের উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়; তবে এই সব অঞ্চলে ভেড়ার মাংসের মতো অত্যধিক-চর্বিযুক্ত মাংসের ব্যবহারও বাড়ছে। জার্মানি, ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়ায় হাঁস ও শূকরের মাংস বেশ জনপ্রিয়। এছাড়া প্রায় সারা বিশ্বেই গোমাংস, হ্যাম ও মুরগির যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। ফিলিপাইনের ভোজসভার প্রধান খাদ্য হল হ্যাম। বিশেষ ধরনের টার্ট ও কেকের সঙ্গে বিশেষ ডেসার্টও তৈরি হয় ক্রিসমাস উপলক্ষে। ফ্রান্সে bûche de Noël বা ইতালিতে প্রচলিত panettone । মিষ্টি আর চকোলেট সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়। ক্রিসমাসের বিশেষ মিষ্টিগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য জার্মান স্টোলেন , মারজিপান কেক বা ক্যান্ডি এবং জামাইকান রাম ফ্রুট কেক। উত্তর দেশগুলিতে শীতকালে যে অল্প কয়েকটি ফল পাওয়া যায় তার মধ্যে কমলালেবু খ্রিষ্টমাসের বিশেষ খাদ্য হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে পরিচিত। বড়দিন উপলক্ষে সাজসজ্জার ইতিহাসটি অতি প্রাচীন। প্রাক-খ্রিষ্টীয় যুগে, রোমান সাম্রাজ্যের অধিবাসীরা শীতকালে চিরহরিৎ বৃক্ষের শাখাপ্রশাখা বাড়ির ভিতরে এনে সাজাতো। খ্রিষ্টানরা এই জাতীয় প্রথাগুলিকে তাদের সৃজ্যমান রীতিনীতির মধ্যে স্থান দেয়। পঞ্চদশ শতাব্দীর লন্ডনের একটি লিখিত বর্ণনা থেকে জানা যায়, এই সময়কার প্রথানুসারে ক্রিসমাস উপলক্ষে প্রতিটি বাড়ি ও সকল গ্রামীণ গির্জা ” হোম, আইভি ও বে এবং সেই মৌসুমের যা কিছু সবুজ, তাই দিয়েই সুসজ্জিত করে তোলা হতো। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, হৃদয়াকার আইভিলতার পাতা মর্ত্যে যীশুর আগমনের প্রতীক; হলি প্যাগান (অখ্রিষ্টান পৌত্তলিক) ও ডাইনিদের হাত থেকে রক্ষা করে; ক্রুশবিদ্ধকরণের সময় পরিহিত যীশুর কণ্টকমুকুট এবং লাল বেরিগুলি ক্রুশে যিশুর রক্তপাতের প্রতীক। সমগ্র খ্রিষ্টান বিশ্বেই স্থানীয় প্রথা ও প্রাপ্ত দ্রব্যাদির অনুষঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সাজসজ্জার প্রথা চালু রয়েছে। ১৮৬০-এর দশকে শিশুদের হাতে নির্মিত কাগজের শিকলের অনুপ্রেরণায় প্রথম বাণিজ্যিক ক্রিসমাস সজ্জা প্রদর্শিত হয়। ক্রিসমাস বৃক্ষ ও চিরহরিৎ শাখাপ্রশাখার ব্যবহার দক্ষিণায়নান্তকে ঘিরে প্যাগান প্রথা ও অনুষ্ঠানগুলির খ্রিষ্টীয়করণের ফলস্রুতি; এক ধরনের প্যাগান বৃক্ষপূজা অনুষ্ঠান থেকে এই প্রথাটি সর্বপ্রথম গৃহীত হয়েছিল। ইংরেজি ভাষায় “Christmas tree” শব্দটির প্রথম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় ১৮৩৫ সালে। শব্দটি গৃহীত হয়েছিল জার্মান ভাষা থেকে। মনে করা হয়, আধুনিক ক্রিসমাস ট্রি প্রথাটির সূচনা ঘটেছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর জার্মানিতে। যদিও অনেকের মতে, এই প্রথাটি ষোড়শ শতাব্দীতে মার্টিন লুথার চালু করেছিলেন। প্রথমে তৃতীয় জর্জের স্ত্রী রানী শার্লোট এবং পরে রানী ভিক্টোরিয়ার রাজত্বকালে আরও সফলভাবে প্রিন্স অ্যালবার্ট জার্মানি থেকে ব্রিটেনে এই প্রথাটির আমদানি করেন। ১৮৪১ সাল নাগাদ ক্রিসমাস ট্রির প্রথা সমগ্র ব্রিটেনে যথেষ্ট প্রসার লাভ করেছিল। ১৮৭০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণও ‘ক্রিসমাস ট্রি’ প্রথাটি গ্রহণ করে। ক্রিসমাস ট্রি বর্ণিল আলোকসজ্জা ও গহনার দ্বারা সুসজ্জিত করা হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে পোইনসেটিয়া নামে মেক্সিকোর একটি দেশজ বৃক্ষ ‘ক্রিসমাস ট্রি’ প্রথার সঙ্গে যুক্ত হয়।

অন্যান্য জনপ্রিয় হলিডে গাছ হল হলি , মিসলটো , লাল অ্যামারিলিস , ও ক্রিসমাস ক্যাকটাস । ক্রিসমাস ট্রির পাশাপাশি চিরসবুজ পত্রসজ্জায় সজ্জিত এই সব গাছ দিয়েও বাড়ির অভ্যন্তর সাজানো হয়ে থাকে। খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্য অনুসারে, ২৪ ডিসেম্বর ক্রিসমাস ইভ এর আগে এই গাছ সাজানো যায় না। আর এটি সরিয়ে ফেলা হয় ১২তম রাতে অর্থাৎ ৬ জানুয়ারি। কোন কোন দেশে উৎসব শেষে এই গাছ আগুনে পুঁড়িয়ে ফেলার রেওয়াজও প্রচলিত। ক্রিসমাস ট্রি সাজানো বড়দিনের একটি বিশেষ অঙ্গ। আপেল, পাখি, মোমবাতি, ঘুঘু, মাছ, ফুল, ফল, স্বর্গদূত আর রঙ বেরঙের কাগজ ও বাতি দিয়ে ক্রিসমাস ট্রি সাজানো হয়। ক্রিসমাস ট্রি হিসেবে যে গাছটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয় সেটি হলো ফার গাছ। এটি মূলত দেবদারু জাতীয় গাছ। এ গাছই বিভিন্ন রংয়ের আলো আর বিভিন্ন দ্রব্যে সাজিয়ে রাখা হয়। এই গাছের উপরে একটি তারা বা স্বর্গদূত বসানো হয়। এই স্বর্গদূত বেথেলেহেমে জন্ম নেওয়া যীশু খ্রিস্টের প্রতীক। এছাড়া ঝাউ জাতীয় গাছও ক্রিসমাস ট্রি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ক্রিসমাস ট্রি হতে পারে জীবিত কিংবা কৃত্রিম। তবে যাই হোক সেটি হতে হবে এই দেবদারু গাছ।

ক্রিসমাস বা বড় দিন
Source: dream3d.co.uk

ইউরোপের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্রিসমাস ট্রি সাজানোর শুরুটা। প্রথাগত ক্রিসমাস সজ্জার বাইরেও অস্ট্রেলিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং ইউরোপে বাড়ির বাইরে আলোকসজ্জা এবং কখনও কখনও আলোকিত স্লেজ , স্নোম্যান, ও অন্যান্য ক্রিসমাস চরিত্রের পুতুল দিয়েও সাজানোর প্রথা রয়েছে। অনেক জায়গায় পৌরসভাগুলিও এই সাজসজ্জার পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। রাস্তার বাতিস্তম্ভে ক্রিসমাস ব্যানার লাগানো এবং টাউন স্কোয়ারে বসানো করা হয় ক্রিসমাস বৃক্ষ। পাশ্চাত্য বিশ্বে ধর্মনিরপেক্ষ বা ধর্মীয় ক্রিসমাস মোটিফ সহ উজ্জ্বল-রঙা রোলকরা কাগজ উৎপাদিত হয় উপহারের মোড়ক হিসেবে ব্যবহারের জন্য। এই মৌসুমে অনেক গৃহে ক্রিসমাস গ্রামের দৃশ্যরচনার প্রথাও পরিলক্ষিত হয়। অন্যান্য প্রথাগত সাজসজ্জার অঙ্গ হল ঘণ্টা, ক্যান্ডি ক্যান , ক্রিসমাস মোজা, বিভিন্ন রিঙ। ক্রিসমাস ট্রি সহ সমস্ত সাজসজ্জা দাদশতম রাতে খুলে ফেলা হয়। ক্রিসমাসের প্রথাগত রংগুলি হল চিরহরিৎ পাইনের সবুজ, তুষার ধবল ও হৃদয়ের রক্তবর্ণ । ক্রিসমাস ক্যারোল, শুভেচ্ছা কার্ড ও ডাক টিকিটের প্রচলনঃ প্রাচীনতম যে বিশেষ ক্রিসমাস স্তোত্রবন্দনাগুলি পাওয়া যায়, সেগুলি রচিত হয়েছিল খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর রোমে । মিলানের আর্চবিশপ অ্যামব্রোস রচিত Veni redemptor gentium লাতিন স্তোত্রগুলি যীশুর অবতারবাদের ধর্মীয় তত্ত্বকথার পবিত্র ভাষ্য। স্প্যানিশ কবি প্রুডেন্টিয়াস (মৃত্যু ৪১৩ খ্রি.) রচিত Corde natus ex Parentis (Of the Father’s love begotten) স্তোত্রটি আজও কোনো কোনো গীর্জায় গীত হয়। নবম ও দশম শতাব্দীতে উত্তর ইউরোপের খ্রিষ্টীয় মঠগুলিতে বার্নার্ড অফ ক্লেয়ারভক্স কর্তৃক ছন্দায়িত স্তবকে সজ্জিত হয়ে ক্রিসমাস “সিকোয়েন্স” বা “প্রোজ” প্রচলিত হয়। দ্বাদশ শতাব্দীতে পেরিসিয়ান সন্ন্যাসী অ্যাডাম অফ সেন্ট ভিক্টর জনপ্রিয় গানগুলি থেকে সুর আহরণ করে প্রথাগত ক্রিসমাস ক্যারোলের মতো এক প্রকার সঙ্গীত সৃষ্টি করেন। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ফ্রান্স, জার্মানি, এবং বিশেষ করে ফ্রান্সিস অফ আসিসির প্রভাবাধীন ইতালিতে আঞ্চলিক ভাষায় জনপ্রিয় ক্রিসমাস সঙ্গীতের একটি শক্তিশালী প্রথা গড়ে ওঠে। ইংরেজী ভাষায় প্রথম ক্রিসমাস ক্যারোল পাওয়া যায় চ্যাপলেইন জন অডেলের রচনায়। তাঁর তালিকাভুক্ত পঁচিশটি “ক্যারোলস অফ ক্রিসমাস” ওয়েসেলারদের দল বাড়ি বাড়ি ঘুরে গেয়ে শোনাত।যে গানগুলিকে আমরা ক্রিসমাস ক্যারোল বলে জানি, আসলে সেগুলি ছিল বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকসংগীত। বড়দিন ছাড়াও “হারভেস্ট টাইড” উৎসবেও সেগুলি গাওয়া হত। পরবর্তীকালে গীর্জায় ক্যারোল গাওয়ার সূচনা হয়। ঐতিহ্যগতভাবে ক্যারোল মধ্যযুগীয় কর্ড প্যাটার্নে সুরারোপিত হয়ে থাকে। এই কারণে এই গানগুলির সুর বেশ স্বতন্ত্র ধরনের হয়ে থাকে। “Personent hodie” , “Good King Wenceslas”, এবং “The Holly and the Ivy” ক্যারোলগুলি মধ্যযুগের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্কযুক্ত। এখনও গীত হয় এমন প্রাচীনতম গানগুলির অন্যতম এগুলি। Adeste Fidelis (O Come all ye faithful) ক্যারোলটি তার বর্তমান রূপটি পরিগ্রহ করে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে; যদিও গানটির কথা সম্ভবত ত্রয়োদশ শতাব্দীর রচনা। উত্তর ইউরোপে প্রোটেস্টান্ট সংস্কার আন্দোলনের পর সাময়িকভাবে ক্যারোলের জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়। যদিও মার্টিন লুথারের মতো কোনো কোনো সংস্কারক ক্যারোল রচনা করতেন এবং উপাসনায় ক্যারোল ব্যবহারকে উৎসাহিতও করতেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে জনপ্রিয় সঙ্গীতের আকারে পুণরুজ্জীবনের পূর্বে ক্যারোল সাধারণ গ্রামীণ সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে প্রচলিত ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংরেজ সংস্কারক চার্লস উইজলি উপাসনায় সঙ্গীতের প্রয়োজনীতা অনুধাবন করেন। তিনি একাধিক গানে সুরারোপ করেছিলেন। এগুলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাজাগরণে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। এছাড়াও তিনি অন্তত তিনটি ক্রিসমাস ক্যারোলের বাণী রচনা করেন। এগুলির মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত ক্যারোলটির আদি শিরোনাম ছিল “Hark! How All the Welkin Rings”; বর্তমানে গানটির শিরোনাম “Hark! the Herald Angels Sing”।ফেলিক্স মেন্ডেলসন উইজলির কথার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ একটি সুরও রচনা করেছিলেন। ১৮১৮ সালে অস্ট্রিয়ায় মোর ও গ্রুবার এই সংগীতধারায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। ওবার্নডর্ফের সেন্ট নিকোলাস চার্চের জন্য তাঁরা রচনা করেছিলেন “Silent Night” ক্যারোলটি। উইলিয়াম বি. স্যান্ডিজ রচিত ক্রিসমাস ক্যারোল এনসিয়েন্ট অ্যান্ড মডার্ন (১৮৩৩) গ্রন্থে একাধিক নব্য-ধ্রুপদি ইংরেজি ক্যারোল প্রথম প্রকাশিত হয়। এগুলি ভিক্টোরিয়ান যুগের মধ্যভাগে উৎসবের পুনরুজ্জীবনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ ক্রিসমাস ঋতুসঙ্গীতের উদ্ভব ঘটে। ১৭৮৪ সালে রচিত হয় “ডেক দ্য হলস “। আমেরিকান ” জিঙ্গল বেলস ” গানটির মেধাসত্ত্ব ১৮৫৭ সালের। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে আফ্রিকান আমেরিকানদের সংস্কৃতি ও ধর্মচেতনায় সমৃদ্ধ তাদের নিজস্ব ধর্মীয় সঙ্গীত ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। বিংশ শতাব্দীতে মৌসুমী ছুটির দিনের গান বাণিজ্যিকভাবে গাওয়া হতে থাকে। এই জাতীয় গানগুলির মধ্যে জ্যাজ ও ব্লুজ জাতীয় গানের নানা রূপ পরিলক্ষিত হয়। এর সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীন সঙ্গীতের পুনরুজ্জীবনেও আগ্রহ দেখা যেতে থাকে। গাওয়া হতে থাকে দ্য রিভেলস-এর মতো লোকসঙ্গীত এবং আদি মধ্যযুগীয় ও ধ্রুপদি সংগীতও। মূলত ১৮৭০ সালের একটি ক্রিসমাস কার্ড হল এক প্রকারের চিত্রিত শুভেচ্ছাবার্তা। সাধারণত বড়দিনের পূর্বের সপ্তাহগুলিতে বন্ধুবান্ধব ও পারিবারিক সদস্যদের মধ্যে ক্রিসমাস কার্ড আদানপ্রদান চলে। পাশ্চাত্য সমাজ ও এশিয়ার অখ্রিষ্টান সম্প্রদায় সহ এক বিরাট সংখ্যক জনসাধারণের মধ্যে এই প্রথা জনপ্রিয়। যেহেতু, বড়দিন ও ইংরেজী নববর্ষ কাছাকাছি সসময় উদযাপিত হয়, তাই চিরাচরিত শুভেচ্ছাবার্তার বাণীটি হল “পবিত্র ক্রিসমাস ও শুভ নববর্ষের শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন” (“wishing you a Merry Christmas and a Happy New Year”)। ১৮৪৩ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত স্যার হেনরি কোল নির্মিত প্রথম বাণিজ্যিক ক্রিসমাস কার্ডের বাণীটিও এই প্রকারই ছিল। যদিও এই শুভেচ্ছাবার্তা রচনার বহুতর পন্থা বিদ্যমান। অনেক কার্ডে একদিকে যেমন ধর্মীয় অনুভূতি, কবিতা, প্রার্থনা বা বাইবেলের স্তব স্থান পায়, তেমনই অন্যদিকে “সিজন’স গ্রিটিংস”-এর মতো কার্ডগুলি ধর্মীয় চেতনার বাইরে সামগ্রিক ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায়। বড়দিন উৎসব সম্পর্কিত চিত্রকর্ম সংবলিত বা বাণিজ্যিকভাবে নকশাকৃত মৌসুমের সঙ্গে প্রাসঙ্গিকতাযুক্ত ক্রিসমাস কার্ডের বিক্রির পরিমাণ যথেষ্টই।

ক্রিসমাস বা বড় দিন এর কার্ড
Source: FirstSiteGuide

কার্ডের নকশায় স্থান পায় যীশুর জন্মদৃশ্য-সম্বলিত ক্রিসমাসের বর্ণনা , অথবা বেথলেহেমের তারা বা পবিত্র আত্মা ও বিশ্বে শান্তির প্রতীক সাদা পায়রা ইত্যাদি খ্রিষ্টীয় প্রতীক। ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়কেন্দ্রিক কার্ডগুলিতে ক্রিসমাস সংস্কারের নানা দৃশ্য, সান্তাক্লজ প্রভৃতি ক্রিসমাস চরিত্র, বা বড়দিনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত মোমবাতি, হলি ও বাবল, শীত ঋতুর নানা চিত্র, ক্রিসমাসের নানা প্রমোদানুষ্ঠান, তুষারদৃশ্য ও উত্তরদেশীয় শীতের জন্তুজানোয়ারের ছবিও স্থান পায় কার্ডগুলোতে। এছাড়াও পাওয়া যায় হাস্যরসাত্মক কার্ড এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর পথেঘাটে ক্রিনোলাইন দোকানদারদের চিত্রসম্বলিত নস্টালজিক কার্ডও। শুভেচ্ছা কার্ডের পাশাপাশি ক্রিসমাস অনেক দেশেই বড়দিন উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়। ডাকব্যবহারকারীরা ক্রিসমাস কার্ড পাঠানোর সময় এই ডাকটিকিটগুলি ব্যবহার করে থাকেন। ডাকটিকিট সংগ্রাহকদের কাছেও এগুলি খুব জনপ্রিয়। ক্রিসমাস সিল ও মাত্র এক বছরের বৈধতা ছাড়া এগুলি সাধারণ ডাকটিকিটের মতোই হয়ে থাকে। এগুলি যথেষ্ট পরিমাণে ছাপা হয় এবং অক্টোবরের সূচনা থেকে ডিসেম্বরের সূচনা পর্যন্ত এই ডাকটিকিট বিক্রি হয়। ১৮৯৮ সালে ইম্পিরিয়াল পেনি পোস্টেজ হারের উদ্বোধন উপলক্ষে একটি কানাডিয়ান ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়েছিল। এই ডাকটিকিটে বিশ্বের একটি মানচিত্রের তলায় “XMAS 1898” কথাটি খোদিত ছিল। ১৯৩৭ সালে অস্ট্রিয়া গোলাপ ও জোডিয়াক চিহ্ন সম্বলিত দুটি “ক্রিসমাস গ্রিটিংস স্ট্যাম্প” প্রকাশ করে। ১৯৩৯ সালে ব্রাজিল চারটি অর্ধ-ডাকটিকিট প্রকাশ করে; এগুলির বিষয় ছিল: তিনজন ম্যাজাই ও বেথলেহেমের তারা,স্বর্গদূত ও শিশু, দক্ষিণী ক্রুশ ও শিশু, এবং মাতা মেরী ও শিশু। যুক্তরাষ্ট্র ডাক পরিষেবা ও যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মেইল উভয়েই প্রতি বছর ক্রিসমাস-বিষয়বস্তু সম্বলিত ডাকটিকিট প্রকাশ করে থাকে। আজ তবে এ পর্যন্তই পরবর্তী পর্বে আমরা জানবো ক্রিসমাসের সবচেয় আকর্ষনীয় চরিত্র সান্তাক্লজ সহ অজানা সব বিচিত্র পৌরণিক চরিত্র সম্পর্কে। বড় দিন সকলের জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল আনন্দ।

তথ্যসূত্রঃ
https://bn.m.wikipedia.org/wiki/

Leave A Reply
1 Comment
  1. Pzvyrl says

    buy generic rybelsus online – buy rybelsus generic buy desmopressin generic

sativa was turned on.mrleaked.net www.omgbeeg.com

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More