ইয়েতি: হিমালয়ের তুষারমানবের রহস্য আজও কেন অমীমাংসিত

বরফে ঢাকা পাহাড়ের চূড়া, হাড়কাঁপানো ঠান্ডা বাতাস, আর দিগন্তজুড়ে শুধু সাদা নীরবতা—এমনই এক পরিবেশে শত বছর ধরে পর্বতারোহীরা দাবি করে আসছেন এক রহস্যময় প্রাণীর অস্তিত্বের কথা। লম্বা, লোমশ শরীর, দুই পায়ে হাঁটা এক বিশালদেহী জীব, যাকে স্থানীয়রা ডাকে “ইয়েতি” নামে। পশ্চিমা বিশ্বে এটি পরিচিত “অ্যাবোমিনেবল স্নোম্যান” নামে। বিজ্ঞান আজও নিশ্চিতভাবে বলতে পারেনি এই প্রাণীর অস্তিত্ব সত্যি নাকি নিছক কল্পনা, কিন্তু এই অনিশ্চয়তাই ইয়েতিকে করে তুলেছে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত রহস্যগুলোর একটি। আমাদের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রহস্য সিরিজের এই পর্বে চলুন জেনে নেওয়া যাক ইয়েতি রহস্যের আদ্যোপান্ত—এর উৎপত্তি, প্রমাণ, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এবং আজকের দিনেও কেন এই প্রশ্নের সমাধান হয়নি।

ইয়েতি নামের উৎপত্তি ও লোককথা

“ইয়েতি” শব্দটি এসেছে তিব্বতি ভাষা থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ “পাথুরে ভালুক” বা “পাথরের জায়গার প্রাণী”। শেরপা ও তিব্বতি সম্প্রদায়ের মধ্যে এই প্রাণী নিয়ে লোককথা প্রচলিত আছে বহু শতাব্দী ধরে, এমনকি হিমালয় অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসারেরও আগে থেকে। তাদের বিশ্বাসে ইয়েতি শুধু একটা প্রাণী নয়, বরং পাহাড়ের রক্ষক—যে হিমালয়ের পবিত্রতা রক্ষা করে এবং অনধিকার প্রবেশকারীদের ভয় দেখায়। কিছু কিংবদন্তিতে বলা হয়, ইয়েতি মানুষকে আক্রমণ করে না, বরং শুধু ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেয়; আবার কিছু গল্পে একে হিংস্র ও প্রতিহিংসাপরায়ণ প্রাণী হিসেবে দেখানো হয়েছে, যে একা পথ হারানো পর্বতারোহীদের আক্রমণ করতে পারে। পশ্চিমা বিশ্বে এই প্রাণীটি প্রথম ব্যাপক পরিচিতি পায় বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, যখন ব্রিটিশ পর্বত অভিযাত্রীরা এভারেস্ট অভিযানের সময় বরফে অদ্ভুত পায়ের ছাপ দেখতে পান।

প্রথম আন্তর্জাতিক পরিচিতি: ১৯২১ সালের অভিযান

১৯২১ সালে ব্রিটিশ পর্বতারোহী চার্লস হাওয়ার্ড-বারির নেতৃত্বে একটি এভারেস্ট রিকনেসাঁ অভিযানে দলটি প্রায় ২১,০০০ ফুট উচ্চতায় বরফের মধ্যে অস্বাভাবিক বড় পায়ের ছাপ দেখতে পায়। স্থানীয় শেরপা গাইডরা তাদের জানান, এই ছাপ “মেতোহ-কাংমি” নামের এক প্রাণীর, যাকে তারা “নোংরা তুষারমানব” বলে ডাকে। সংবাদমাধ্যমে ভুল অনুবাদের কারণে এটি হয়ে যায় “অ্যাবোমিনেবল স্নোম্যান” (Abominable Snowman)—আর এভাবেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ইয়েতির নাম। মজার ব্যাপার হলো, এই ভুল অনুবাদই আজ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত নাম হিসেবে টিকে আছে, যদিও প্রকৃত তিব্বতি অর্থের সাথে এর তেমন মিল নেই।

বরফে ইয়েতির পায়ের ছাপ আবিষ্কারের ইলাস্ট্রেশন

এরিক শিপটনের বিখ্যাত পায়ের ছাপ

১৯৫১ সালে ব্রিটিশ পর্বতারোহী এরিক শিপটন এভারেস্টের মেনলুং হিমবাহে একটি বিশাল পায়ের ছাপের ছবি তোলেন, যা আজও ইয়েতি রহস্যের সবচেয়ে বিখ্যাত ও আলোচিত প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ছাপটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৩ ইঞ্চি, যা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পায়ের চেয়ে বহুগুণ বড়। ছবিতে একটা বরফ কুড়াল আর একটা বুট রাখা হয়েছিল আকার তুলনার জন্য, যা ছবিটিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। বহু বিশেষজ্ঞ পরবর্তীতে যুক্তি দেন যে সূর্যের তাপে বরফ গলে গিয়ে একটা সাধারণ পায়ের ছাপ বড় ও বিকৃত আকার ধারণ করতে পারে, তবে শিপটনের তোলা ছবিটি আজও ইয়েতি-বিশ্বাসীদের কাছে সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত।

১৯৫৪ সালের ডেইলি মেইল অভিযান ও এডমন্ড হিলারির অনুসন্ধান

১৯৫৪ সালে ডেইলি মেইল পত্রিকা একটি বিশাল অভিযান পরিচালনা করে ইয়েতির খোঁজে, যেখানে বিজ্ঞানী ও পর্বতারোহীদের একটি দল হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুসন্ধান চালায়। তারা কিছু পশমের নমুনা ও মলের নমুনা সংগ্রহ করে, স্থানীয়দের সাক্ষাৎকার নেয়, এবং বিভিন্ন মঠে সংরক্ষিত “ইয়েতির নিদর্শন” পরীক্ষা করে দেখে। তবে অভিযান শেষে কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি তারা।

১৯৬০ সালে বিখ্যাত পর্বতারোহী স্যার এডমন্ড হিলারি—যিনি এভারেস্ট জয় করা প্রথম মানুষদের একজন—নিজে একটি অভিযান চালান ইয়েতির অস্তিত্ব যাচাই করতে। তিনি নেপালের খুম্বু অঞ্চলের একটি মঠ থেকে সংগৃহীত একটি “ইয়েতির খুলি” পরীক্ষা করে দেখেন এটি আসলে একটি হিমালয়ী ছাগলের (সেরাউ) চামড়া দিয়ে তৈরি একটি ধর্মীয় নিদর্শন মাত্র। হিলারির এই সিদ্ধান্ত সে সময় ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল, কারণ তিনি নিজে একজন অভিজ্ঞ পর্বতারোহী হয়েও ইয়েতির অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় ইয়েতি দেখতে কেমন

বিভিন্ন সময়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া বর্ণনা পর্যালোচনা করলে একটা সাধারণ চিত্র উঠে আসে। ইয়েতিকে বর্ণনা করা হয় প্রায় ৭ থেকে ৮ ফুট লম্বা, শক্তিশালী শরীরের অধিকারী, লালচে-বাদামি বা কালচে লোমে ঢাকা একটি প্রাণী হিসেবে, যার হাঁটার ভঙ্গি অনেকটা মানুষের মতো হলেও শরীরের গঠন গরিলার সাথে বেশি মেলে। কিছু বর্ণনায় বলা হয়েছে, এর মুখ অনেকটা চ্যাপ্টা এবং মাথার উপর একটা শঙ্কু আকৃতির লোমের গোছা থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা প্রায়ই বলেন যে এই প্রাণীটি রাতের বেলায় বা কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় দূর থেকে দেখা গেছে, যা সঠিক পর্যবেক্ষণকে আরও কঠিন করে তোলে।

বিশ্বজুড়ে একই ধরনের কিংবদন্তি

ইয়েতি একা নয়—পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে একই ধরনের “রহস্যময় লোমশ মানবাকৃতির প্রাণী”র কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। উত্তর আমেরিকায় একে বলা হয় “বিগফুট” বা “স্যাসকোয়াচ”, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ায় একে বলা হয় “আলমাস”, আর অস্ট্রেলিয়ায় এই ধরনের প্রাণীকে ডাকা হয় “ইয়াওয়ি” নামে। বিজ্ঞানীদের একটা অংশ মনে করেন এই বৈশ্বিক মিল নিছক কাকতালীয় নয়—বরং এটি মানুষের মনস্তত্ত্বের একটা সার্বজনীন প্রবণতা প্রতিফলিত করে, যেখানে অজানা বন্য পরিবেশে মানুষ নিজের কল্পনায় “অর্ধ-মানব, অর্ধ-পশু” এক সত্তা তৈরি করে ফেলে। আবার কেউ কেউ যুক্তি দেন, এই মিল প্রমাণ করে যে সত্যিই এমন কোনো অজানা প্রজাতি থাকতে পারে, যা পৃথিবীর বিভিন্ন দুর্গম বনাঞ্চল ও পার্বত্য এলাকায় টিকে আছে।

বিশ্বজুড়ে ইয়েতি বিগফুট আলমাসের মতো কিংবদন্তির ইলাস্ট্রেশন

বিজ্ঞান কী বলে: DNA বিশ্লেষণের ফলাফল

আধুনিক যুগে, বিশেষ করে গত দুই দশকে, বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময়ে সংগৃহীত “ইয়েতির” পশম, হাড় ও মলের নমুনার উপর DNA বিশ্লেষণ চালিয়েছেন। ২০১৪ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনতত্ত্ববিদ ব্রায়ান সাইকসের নেতৃত্বে একটি গবেষণায় বিশ্বজুড়ে সংগৃহীত ৩০টিরও বেশি “ইয়েতি” নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, অধিকাংশ নমুনা আসলে হিমালয়ী বাদামি ভালুক, তিব্বতি নীল ভালুক বা সাধারণ কালো ভালুকের সাথে মিলে যায়। ২০১৭ সালে বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি গবেষণায়ও একই ধরনের ফলাফল পাওয়া যায়—নমুনাগুলো মূলত এশিয়ান কালো ভালুক এবং হিমালয়ী বাদামি ভালুকের, যাদের মধ্যে কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্য সাধারণ ভালুক থেকে সামান্য ভিন্ন।

এই গবেষণাগুলো অনেকাংশে ইয়েতি রহস্যের বৈজ্ঞানিক সমাধান দিয়েছে বলে মনে করা হয়—অর্থাৎ, মানুষ যা “ইয়েতি” বলে ভুল করছে, তা আসলে হিমালয়ের অস্বাভাবিক আকৃতির ভালুক হতে পারে, যারা মাঝেমধ্যে দুই পায়ে দাঁড়িয়ে হাঁটে, বিশেষ করে খাবারের খোঁজে বা হুমকি অনুভব করলে। তবে এই তত্ত্ব সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি—বিশেষ করে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা করা অস্বাভাবিক উচ্চতা (৭-৮ ফুট পর্যন্ত) এবং আচরণ ভালুকের সাথে পুরোপুরি মেলে না। কিছু গবেষক তাই এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নন যে DNA বিশ্লেষণ পুরো রহস্যের সমাধান দিয়েছে।

ইয়েতির নমুনা ও ভালুকের DNA বিশ্লেষণ ইলাস্ট্রেশন

স্থানীয় সংস্কৃতিতে ও ধর্মে ইয়েতির স্থান

নেপাল, তিব্বত ও ভুটানের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কাছে ইয়েতি শুধু একটি রহস্যময় প্রাণী নয়, বরং তাদের সংস্কৃতি ও ধর্মবিশ্বাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। খুম্বু অঞ্চলের বৌদ্ধ মঠগুলোতে আজও “ইয়েতির খুলি” ও “চামড়া” হিসেবে পরিচিত ধর্মীয় নিদর্শন সংরক্ষিত আছে, যেগুলো স্থানীয়দের কাছে পবিত্র বলে বিবেচিত এবং বিশেষ উৎসবে প্রদর্শন করা হয়। ভুটান সরকার এতটাই গুরুত্ব দেয় এই বিশ্বাসকে যে, দেশটির উত্তরাঞ্চলের একটি বিশাল এলাকাকে “ইয়েতি সংরক্ষিত অঞ্চল” (Sakteng Wildlife Sanctuary) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে বন্যপ্রাণী শিকার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। নেপাল সরকারও পর্যটন শিল্পের অংশ হিসেবে ইয়েতির কিংবদন্তিকে ব্যবহার করে থাকে—দেশটির অনেক ট্রেকিং রুট ও লজের নামকরণেই “ইয়েতি” শব্দটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

আধুনিক দর্শন ও অভিযান

২১ শতকেও ইয়েতি নিয়ে অনুসন্ধান থেমে নেই। ২০১৯ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী একটি বিবৃতিতে জানায়, তাদের একটি পর্বতারোহী দল নেপালের মাকালু বেস ক্যাম্পের কাছে প্রায় ৩২ ইঞ্চি লম্বা রহস্যময় পায়ের ছাপ দেখতে পেয়েছে, যা তারা “ইয়েতির” বলে দাবি করে এবং ছবি প্রকাশ করে। ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তোলে, যদিও বিজ্ঞানী মহল থেকে এটিকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়—অনেকের মতে এটি একই পায়ের ছাপ বরফ গলে বড় হয়ে যাওয়ার ফল হতে পারে, অথবা এক লাইনে একের পর এক পড়া একাধিক ছোট প্রাণীর পদচিহ্নের মিশ্রণ।

এছাড়া ডিসকভারি চ্যানেল ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের মতো চ্যানেলগুলো একাধিকবার ইয়েতির খোঁজে বিশেষ অভিযান-ভিত্তিক ডকুমেন্টারি তৈরি করেছে, যেখানে থার্মাল ক্যামেরা, ক্যামেরা ট্র্যাপ ও অত্যাধুনিক ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এসব অভিযানে কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ না মিললেও, স্থানীয়দের সাক্ষাৎকার আর অস্বাভাবিক শব্দ রেকর্ডিং নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে।

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে ইয়েতি

ইয়েতি শুধু বিজ্ঞান বা লোককথার সীমায় আটকে নেই—এটি সিনেমা, কার্টুন ও সাহিত্যেরও জনপ্রিয় চরিত্র। হলিউডের একাধিক অ্যানিমেটেড সিনেমায় (যেমন বরফ-দেশ নিয়ে তৈরি বিভিন্ন কার্টুন) ইয়েতিকে বন্ধুত্বপূর্ণ ও রহস্যময় চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। ভিডিও গেম ও কমিক বইয়েও ইয়েতির উপস্থিতি লক্ষণীয়। এই জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে, বাস্তবে প্রমাণিত না হলেও মানুষের কল্পনায় ইয়েতি এক চিরন্তন রহস্যময় চরিত্র হয়ে থেকে গেছে।

ইয়েতি দেখার সবচেয়ে বেশি রিপোর্ট হওয়া অঞ্চলগুলো

হিমালয়ের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ইয়েতি দর্শনের দাবি ছড়িয়ে থাকলেও কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে এর ঘনত্ব বেশি লক্ষ্য করা যায়। নেপালের খুম্বু উপত্যকা—যেখান দিয়ে এভারেস্ট বেস ক্যাম্প ট্রেকিং রুট গেছে—সেখানে সবচেয়ে বেশি দর্শনের দাবি পাওয়া যায়, সম্ভবত এখানে পর্বতারোহীদের যাতায়াতও সবচেয়ে বেশি বলে। এছাড়া তিব্বতের উত্তরাঞ্চলীয় মালভূমি, ভুটানের সাকতেং অঞ্চল, এবং ভারতের সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশের দুর্গম পার্বত্য এলাকা থেকেও নিয়মিত ইয়েতি-সদৃশ প্রাণী দেখার দাবি আসে। মজার বিষয় হলো, এই সব এলাকাই জনবসতি থেকে দূরে, ঘন বনাঞ্চল বা বরফাবৃত দুর্গম পথ দিয়ে ঘেরা—যা যেকোনো অজানা প্রজাতির টিকে থাকার জন্য আদর্শ পরিবেশ হতে পারে বলে অনেক জীববিজ্ঞানী মনে করেন।

ইয়েতি অনুসন্ধানে ব্যবহৃত আধুনিক প্রযুক্তি

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়েতি অনুসন্ধানে প্রযুক্তির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ক্যামেরা ট্র্যাপ, যা সাধারণত বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত হয়, হিমালয়ের বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চলে স্থাপন করা হয়েছে যাতে রাতের বেলাতেও কোনো নড়াচড়া রেকর্ড করা যায়। থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা ব্যবহার করে দূর থেকে প্রাণীর শরীরের তাপ শনাক্ত করার চেষ্টাও হয়েছে, যদিও চরম ঠান্ডা আবহাওয়ায় এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা সীমিত। এছাড়া অডিও রেকর্ডিং ডিভাইস দিয়ে অস্বাভাবিক প্রাণীর ডাক রেকর্ড করার চেষ্টাও চলেছে, যার কিছু রেকর্ডিং পরবর্তীতে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে সেগুলো আসলে পরিচিত পাখি বা স্তন্যপায়ী প্রাণীর ডাক। ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে, যা দুর্গম ও বিপজ্জনক এলাকায় মানুষের পক্ষে পৌঁছানো কঠিন এমন জায়গাতেও পর্যবেক্ষণ চালাতে সক্ষম।

ইয়েতি কি নিছক এক মনস্তাত্ত্বিক ঘটনা?

কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, উচ্চ পর্বতে অক্সিজেনের স্বল্পতা, ক্লান্তি এবং চরম প্রতিকূল পরিবেশে দীর্ঘ সময় থাকার ফলে মস্তিষ্কে হ্যালুসিনেশন বা বিভ্রম তৈরি হতে পারে, যা প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে। এছাড়া দূর থেকে দেখা তুষারচিতা, ভালুক বা বরফের অস্বাভাবিক আকৃতির ছায়াও মানুষের কল্পনায় “মানবাকৃতির দানব” রূপে ধরা দিতে পারে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মস্তিষ্ক অস্পষ্ট বা আধা-দৃশ্যমান বস্তুকে পরিচিত আকৃতিতে সাজিয়ে নিতে চায়—এই প্রবণতাকে বলা হয় “প্যারাইডোলিয়া”, যা মেঘের মধ্যে মুখ দেখা বা অন্ধকারে ছায়াকে মানুষ মনে করার মতোই একটি স্বাভাবিক মানসিক প্রক্রিয়া।

রহস্য কি শেষ হয়েছে?

DNA গবেষণা ইয়েতি রহস্যের একটা বড় অংশের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিলেও, শত বছরের পুরনো এই কিংবদন্তি সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা যায়নি। হিমালয়ের প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলগুলো এখনো পুরোপুরি অনুসন্ধান করা হয়নি, আর স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস আজও অটুট। হয়তো ইয়েতি সত্যিই কোনো অজানা প্রাণী, অথবা হয়তো এটি মানুষের কল্পনা আর প্রকৃতির রহস্যময়তার এক অপূর্ব মিশ্রণ। যতদিন না হিমালয়ের প্রতিটি কোণ অনুসন্ধান করা সম্ভব হচ্ছে, ততদিন এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর অধরাই থেকে যাবে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

ইয়েতি কি সত্যিই আছে?
নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। DNA পরীক্ষায় বেশিরভাগ নমুনা হিমালয়ী ভালুকের সাথে মিলে গেলেও, সব প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা এই ব্যাখ্যায় পুরোপুরি মেলে না।

ইয়েতি আর বিগফুট কি একই প্রাণী?
না, দুটো ভিন্ন অঞ্চলের কিংবদন্তি—ইয়েতি হিমালয়ের, বিগফুট উত্তর আমেরিকার। তবে দুটোরই বর্ণনা প্রায় একই রকম, তাই অনেকে এদের একই ধরনের রহস্যের অংশ মনে করেন।

সবচেয়ে বিখ্যাত ইয়েতির প্রমাণ কোনটি?
১৯৫১ সালে এরিক শিপটনের তোলা পায়ের ছাপের ছবি এখনো সবচেয়ে বিখ্যাত ও আলোচিত প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

কোন দেশে ইয়েতি সংরক্ষিত অঞ্চল আছে?
ভুটানের সাকতেং ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারিকে সরকারিভাবে ইয়েতি সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

কোথায় ইয়েতি দেখার দাবি সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে?
নেপালের খুম্বু উপত্যকা, তিব্বতের উত্তরাঞ্চল, ভুটানের সাকতেং এবং ভারতের সিকিম-অরুণাচল অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ইয়েতি দর্শনের দাবি রিপোর্ট হয়েছে।

এডমন্ড হিলারির অভিযানের ফলাফল কী ছিল?
১৯৬০ সালে হিলারি নেপালের একটি মঠ থেকে সংগৃহীত “ইয়েতির খুলি” পরীক্ষা করে দেখেন এটি আসলে হিমালয়ী ছাগলের (সেরাউ) চামড়া দিয়ে তৈরি একটি ধর্মীয় নিদর্শন।

আমাদের রহস্য সিরিজের অন্যান্য পর্বগুলোও পড়তে পারেন—পৃথিবীর ১০টি সবচেয়ে বড় রহস্য, অথবা ইতিমধ্যে প্রকাশিত বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল নিয়ে বিস্তারিত লেখা।

Comments are closed.