বড়দিনের আগের এক শীতের রাত। পুরোনো এক বাড়ির ফায়ারপ্লেসের পাশে বসে একদল মানুষ ভূতের গল্প বলছে। হঠাৎ ডগলাস নামের এক ভদ্রলোক জানালেন—তাঁর কাছে এমন এক গল্প আছে, যার ভয়াবহতার কাছে বাকি সব গল্প তুচ্ছ। কারণ সেই গল্পে ভূত দেখা দিয়েছিল দুটি নিষ্পাপ শিশুকে। আর একটি শিশু যদি গল্পে ভয়ের এক প্যাঁচ বাড়ায়, তবে দুটি শিশু বাড়ায় আরও এক প্যাঁচ—“another turn of the screw”!
এভাবেই শুরু হয় ইংরেজি সাহিত্যের সবচেয়ে আলোচিত, সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সবচেয়ে অস্বস্তিকর ভৌতিক উপন্যাসিকা ‘দ্য টার্ন অফ দ্য স্ক্রু’ (The Turn of the Screw)। ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত মার্কিন-ব্রিটিশ লেখক হেনরী জেমস (Henry James)-এর এই রচনাটি সোয়াশো বছরেরও বেশি সময় ধরে পাঠক ও সমালোচকদের একটি প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত করে রেখেছে—ভূতগুলো কি সত্যিই ছিল, নাকি সবই ছিল এক নিঃসঙ্গ তরুণীর মনের বিভ্রম?
বাংলা ভাষায় বইটির পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ করেছেন লুৎফুল কায়সার, প্রকাশ করেছে বেনজিন প্রকাশন। এই রিভিউতে আমরা স্পয়লার ছাড়া গল্পের প্রেক্ষাপট, চরিত্র, বিখ্যাত ‘দ্ব্যর্থতা বিতর্ক’, চলচ্চিত্র ও সিরিজ রূপান্তর এবং বইটি কাদের জন্য—সবকিছু বিস্তারিত আলোচনা করব।
এক নজরে ‘দ্য টার্ন অফ দ্য স্ক্রু’ বই পরিচিতি

| বইয়ের নাম: | দ্য টার্ন অফ দ্য স্ক্রু (পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ) |
| মূল লেখক: | হেনরী জেমস (Henry James, ১৮৪৩–১৯১৬) |
| অনুবাদক: | লুৎফুল কায়সার |
| প্রকাশনী: | বেনজিন প্রকাশন |
| মূল প্রকাশকাল: | ১৮৯৮ (Collier’s Weekly-তে ধারাবাহিকভাবে) |
| জনরা: | গথিক হরর, ভৌতিক ও সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার |
কাহিনীর প্রেক্ষাপট (স্পয়লারহীন প্লট সামারি)
গল্পের মূল অংশটি এক নামহীন তরুণী গভর্নেসের (আয়া/গৃহশিক্ষিকা) নিজের হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি। গ্রামের এক যাজকের কনিষ্ঠ কন্যা এই তরুণী লন্ডনে এসে চাকরির সাক্ষাৎকার দেন এক সুদর্শন, ধনী ভদ্রলোকের কাছে। ভদ্রলোক তাঁর অনাথ ভাইপো-ভাইঝির দেখাশোনার জন্য একজন গভর্নেস খুঁজছেন। শর্ত একটাই—কোনো অবস্থাতেই তাঁকে কোনো বিষয়ে বিরক্ত করা যাবে না, চিঠিও লেখা যাবে না।
অদ্ভুত শর্ত মেনেই তরুণী পৌঁছান ইংল্যান্ডের গ্রামাঞ্চলে বিশাল ও নির্জন জমিদারবাড়ি ব্লাই (Bly)-তে। সেখানে তাঁর অপেক্ষায় ছিল ফুটফুটে, দেবদূতের মতো সুন্দর দুটি শিশু—আট বছরের ফ্লোরা এবং দশ বছরের মাইলস—আর সরল-স্বভাবের হাউসকিপার মিসেস গ্রোস।
কিন্তু শুরুতেই এক কালো ছায়া পড়ে। বোর্ডিং স্কুল থেকে মাইলসকে বহিষ্কার করা হয়েছে—কোনো কারণ না জানিয়েই। এত মিষ্টি একটা ছেলে কী এমন করতে পারে? এরপর একদিন সন্ধ্যায় বাড়ির পুরোনো টাওয়ারের মাথায় গভর্নেস দেখতে পান এক অচেনা পুরুষকে, যে স্থির দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুদিন পর সেই একই মুখ দেখা দেয় ডাইনিং রুমের জানালার কাচে।
মিসেস গ্রোসের কাছে বর্ণনা দিতেই তিনি আতঙ্কে সাদা হয়ে যান। এই বর্ণনা হুবহু মিলে যায় পিটার কুইন্ট-এর সাথে—বাড়ির প্রাক্তন খানসামা, যে মারা গেছে। এরপর লেকের ধারে দেখা দেয় এক কালো পোশাকের নারী—আগের গভর্নেস মিস জেসেল, যিনিও আর বেঁচে নেই।
তরুণী ধীরে ধীরে নিশ্চিত হয়ে ওঠেন—এই দুই অশুভ আত্মা ফিরে এসেছে শিশু দুটিকে দখল করে নিতে। আরও ভয়ংকর সন্দেহ জাগে—শিশুরা কি তাদের দেখতে পায়, কিন্তু ইচ্ছে করে লুকোচ্ছে? শুরু হয় শিশুদের ‘রক্ষা’ করার জন্য এক মরিয়া, শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই।
“একটি শিশু যদি গল্পে আরও এক প্যাঁচ ঘোরায়, তাহলে দুটি শিশু কী করবে?” “অবশ্যই, দুটো প্যাঁচ!” — উপন্যাসের সূচনা অংশ থেকে (ভাবানুবাদ)
প্রধান চরিত্রসমূহ
| চরিত্র | পরিচয় | গল্পে ভূমিকা |
|---|---|---|
| গভর্নেস (নামহীন) | তরুণী গৃহশিক্ষিকা ও কথক | পুরো ঘটনা তাঁর চোখ দিয়েই দেখা—তিনি কি নির্ভরযোগ্য? |
| মাইলস | দশ বছরের বালক | স্কুল থেকে রহস্যজনকভাবে বহিষ্কৃত, অস্বাভাবিক পরিণত আচরণ |
| ফ্লোরা | আট বছরের বালিকা | নিষ্পাপ চেহারা, কিন্তু লেকের ধারে তার আচরণ রহস্যময় |
| মিসেস গ্রোস | বাড়ির হাউসকিপার | অতীতের সাক্ষী, গভর্নেসের একমাত্র ভরসা |
| পিটার কুইন্ট | প্রয়াত খানসামা | টাওয়ার ও জানালায় দেখা দেওয়া পুরুষ আত্মা |
| মিস জেসেল | প্রয়াত পূর্ববর্তী গভর্নেস | লেকের ধারে দেখা দেওয়া কালো পোশাকের নারী |
সাহিত্যের সবচেয়ে বিখ্যাত বিতর্ক: ভূত সত্যি, নাকি মনের বিভ্রম?
এই বইকে অন্য সব ভূতের গল্প থেকে আলাদা করেছে এর ইচ্ছাকৃত দ্ব্যর্থতা (Ambiguity)। হেনরী জেমস কোথাও স্পষ্ট করে বলেননি ভূতগুলো বাস্তব কিনা। ফলে সমালোচকেরা মূলত দুই শিবিরে বিভক্ত:
- অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যা: ভূতেরা সত্যিই আছে। গভর্নেস কুইন্টকে না চিনেও তার যে নিখুঁত বর্ণনা দেন, তা মিসেস গ্রোস হুবহু শনাক্ত করেন—এটাই প্রমাণ যে তিনি সত্যিই কিছু দেখেছেন।
- মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা: ১৯৩৪ সালে মার্কিন সমালোচক এডমান্ড উইলসন যুক্তি দেন—ভূত আসলে গভর্নেসের অবদমিত আবেগ ও স্নায়বিক উত্তেজনার ফল। নিঃসঙ্গ, অনভিজ্ঞ এক তরুণী, যিনি মালিকের প্রতি গোপনে আকৃষ্ট এবং নিজেকে নায়িকা প্রমাণ করতে মরিয়া—তিনিই কি শিশুদের জন্য আসল বিপদ?
মজার বিষয় হলো, বইটির প্রতিটি দৃশ্য দুই ব্যাখ্যাতেই সমান যুক্তিসঙ্গত। তাই একবার পড়ে শেষ করার পর অনেক পাঠকই দ্বিতীয়বার পড়েন—সম্পূর্ণ ভিন্ন চোখে। এই কারণেই একে বলা হয় সাহিত্যে ‘আনরিলায়েবল ন্যারেটর’ (অনির্ভরযোগ্য কথক)-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
পর্দায় ‘দ্য টার্ন অফ দ্য স্ক্রু’: সিনেমা, অপেরা ও নেটফ্লিক্স
আপনি হয়তো না জেনেই এই গল্পের কোনো না কোনো রূপান্তর দেখে ফেলেছেন:
- দ্য ইনোসেন্টস (The Innocents, ১৯৬১): ডেবোরা কার অভিনীত সাদাকালো চলচ্চিত্র, যা সর্বকালের সেরা ভৌতিক সিনেমার তালিকায় প্রায়ই জায়গা পায়।
- বেঞ্জামিন ব্রিটেনের অপেরা (১৯৫৪): বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বিখ্যাত ইংরেজি অপেরা।
- দ্য হন্টিং অফ ব্লাই ম্যানর (The Haunting of Bly Manor, ২০২০): নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় সিরিজ, যা এই উপন্যাস ও হেনরী জেমসের অন্যান্য গল্প অবলম্বনে নির্মিত।
- দ্য টার্নিং (The Turning, ২০২০): আধুনিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত হলিউড হরর চলচ্চিত্র।
তবে সিরিজ বা সিনেমা দেখে থাকলেও মূল বই পড়ার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা—কারণ পর্দা আপনাকে ভূত ‘দেখিয়ে দেয়’, কিন্তু বই আপনাকে সন্দেহের মধ্যে ঝুলিয়ে রাখে।
বইটির শক্তিশালী দিক ও সীমাবদ্ধতা
✅ যা ভালো লাগবে
- রক্ত বা জাম্পস্কেয়ার ছাড়াই ধীরে ধীরে জমে ওঠা গা-ছমছমে ভয়
- দুই ব্যাখ্যাতেই যুক্তিসঙ্গত—দ্বিতীয়বার পড়ার মতো বই
- আকারে ছোট, কয়েক বসায় শেষ করা যায়
- পূর্ণাঙ্গ (সংক্ষেপিত নয়) বাংলা অনুবাদ
⚠️ যা জেনে রাখা ভালো
- ভিক্টোরিয়ান যুগের দীর্ঘ, জটিল বাক্যগঠন—গতি কিছুটা ধীর
- অনেক প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই, যা কারও কাছে অতৃপ্তিকর লাগতে পারে
- আধুনিক অ্যাকশন-হরর পছন্দ করলে প্রত্যাশা মেলাতে হবে
কাদের জন্য এই বই?
- যাঁরা দ্য হন্টিং অফ ব্লাই ম্যানর দেখেছেন এবং মূল গল্পটা জানতে চান।
- যাঁরা জাম্পস্কেয়ারের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক, ধীরলয়ের অস্বস্তিকর ভয় পছন্দ করেন।
- ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থী—বইটি বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে রয়েছে।
- যাঁরা ক্লাসিক গথিক সাহিত্য (যেমন ড্রাকুলা, জেন আয়ার) ভালোবাসেন।
পাঠকদের প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
❓ ‘দ্য টার্ন অফ দ্য স্ক্রু’ নামের অর্থ কী?
গল্পের শুরুতে ডগলাস বলেন, ভূতের গল্পে একটি শিশু থাকলে ভয়ের মাত্রা এক প্যাঁচ বাড়ে, আর দুটি শিশু থাকলে আরও এক প্যাঁচ। অর্থাৎ নামটি ক্রমশ বাড়তে থাকা মানসিক চাপ ও আতঙ্কের রূপক।
❓ গল্পে কি সত্যিই ভূত আছে?
লেখক ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তরটি অস্পষ্ট রেখেছেন। অতিপ্রাকৃত ও মনস্তাত্ত্বিক—দুই ধরনের ব্যাখ্যাই সমানভাবে প্রচলিত। সিদ্ধান্তটা পাঠকের নিজের।
❓ নেটফ্লিক্সের ‘ব্লাই ম্যানর’ আর বইয়ের গল্প কি এক?
মূল চরিত্র ও প্রেক্ষাপট (ব্লাই, মাইলস, ফ্লোরা, কুইন্ট, জেসেল) এই বই থেকে নেওয়া, তবে সিরিজটি অনেক নতুন চরিত্র ও উপকাহিনি যোগ করেছে। বইয়ের গল্প অনেক বেশি সংক্ষিপ্ত, ঘনবদ্ধ ও দ্ব্যর্থবোধক।
❓ বইটি কি শিশু-কিশোরদের জন্য উপযুক্ত?
এতে কোনো রক্তাক্ত বা বীভৎস বর্ণনা নেই, তবে বিষয়বস্তু ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার কারণে এটি পরিণত পাঠক ও কিশোর-উত্তীর্ণদের জন্য বেশি উপভোগ্য।
Comments are closed.