দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্তিম লগ্নে যখন জার্মানির পতন আসন্ন, তখন হিটলারের অত্যন্ত গোপন গবেষক ও বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন সর্বনাশা প্রযুক্তি দখল করতে মিত্রবাহিনীর মধ্যে শুরু হয়েছিল এক অঘোষিত প্রতিযোগিতা। সেই সময় নাৎসি বিজ্ঞানীদের গোপন পরীক্ষাগারগুলো থেকে উধাও হয়ে যায় মানবজাতির সবচেয়ে ভয়ংকর কিছু গবেষণাপত্র। তার মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় ছিল কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা ও মানব জেনেটিক্সের এক চরম বিকৃত পরীক্ষা—যার সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘দ্য বেল’ (Die Glocke / The Bell)!
সেই প্রাচীন গোপন অস্ত্র কি সত্যিই হারিয়ে গিয়েছিল, নাকি ৬০ বছর ধরে কোনো ছায়া সংগঠনের আড়ালে গোপনে পরিচালিত হচ্ছিল পরবর্তী মহাপরিকল্পনা? বিশ্বখ্যাত মার্কিন থ্রিলার সম্রাট জেমস রলিন্স (James Rollins)-এর বেস্টসেলার সিগমা ফোর্স সিরিজের তৃতীয় ও অন্যতম জনপ্রিয় উপন্যাস ‘ব্ল্যাক অর্ডার’ (Black Order) সেই রুদ্ধশ্বাস ষড়যন্ত্রের পর্দা উন্মোচন করে।
বাংলা ভাষায় বইটি চমৎকার ও গতিশীল শৈলীতে অনুবাদ করেছেন সাঈম শামস্ এবং প্রকাশ করেছে রোদেলা প্রকাশনী। কোয়ান্টাম মেকানিক্স, ডারউইনের বিবর্তনবাদ, হিমালয়ের বৌদ্ধ আশ্রমের রহস্য এবং বিশ্বব্যাপী নাৎসি কনস্পিরেসি নিয়ে রচিত এই বৈজ্ঞানিক থ্রিলারের ইন-ডেপথ বুক রিভিউ পড়ুন এখানে।
এক নজরে ‘ব্ল্যাক অর্ডার’ বই পরিচিতি

| বইয়ের নাম: | ব্ল্যাক অর্ডার (Black Order) |
| মূল লেখক: | জেমস রলিন্স (James Rollins) |
| অনুবাদক: | সাঈম শামস্ |
| প্রকাশনী: | রোদেলা প্রকাশনী |
| সিরিজ: | সিগমা ফোর্স সিরিজ (বই ৩) |
| জনরা: | সায়েন্স ফিকশন, হিস্টোরিক্যাল মিস্ট্রি ও টেকনো-থ্রিলার |
| পাঠক রেটিং: | ⭐ ৪.৭ / ৫ (রকমারি ও গুডরিডস বেস্টসেলার) |
কাহিনীর সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপট (স্পয়লারহীন প্লট সামারি)
গল্পের শুরু তিনটি ভিন্ন মহাদেশে তিনটি আপাতদৃষ্টিতে অসংলগ্ন কিন্তু রক্তহিম করা ঘটনার মাধ্যমে:
- কোপেনহেগেন, ডেনমার্ক: এক প্রাচীন বইয়ের নিলামে হঠাৎ বন্দুকধারীদের নারকীয় হামলা হয়। তাদের উদ্দেশ্য কোটি টাকার ধনরত্ন নয়, বরং চার্লস ডারউইনের হারিয়ে যাওয়া একটি ব্যক্তিগত ডায়েরি! সেই নিলামে উপস্থিত ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সামরিক গোয়েন্দা গ্রেসন পিয়ার্স। ডায়েরিটি রক্ষা করতে গিয়ে তিনি জড়িয়ে পড়েন আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রে।
- হিমালয়ের দুর্গম বৌদ্ধ আশ্রম, নেপাল: হিমালয়ের এক প্রত্যন্ত আশ্রমে হঠাৎ করে সব সন্ন্যাসী ভয়াবহ এক উন্মাদনায় আক্রান্ত হন। একে অপরকে নৃশংসভাবে হত্যা করতে শুরু করেন তারা। সেই এলাকা পরিদর্শনে যান ডা. লিসা কামিংস। সেখানে তিনি দেখতে পান এমন এক জৈবিক বিপর্যয়, যা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্পনারও বাইরে।
- দক্ষিণ আফ্রিকা: প্রত্যন্ত এক পশু অভয়ারণ্যে জন্ম নিচ্ছে ভয়ংকরভাবে বিকৃত ও অতিমানবীয় বৈশিষ্ট্যের কিছু জন্তু—যেন বিবর্তন কোটি বছর লাফিয়ে এক নিমেষে এগিয়ে গেছে!
এই তিনটি অদ্ভুত সূত্রের একমাত্র যোগসূত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের একটি গোপন নাৎসি গবেষণা এবং হেনরিক হিমলার-এর প্রতিষ্ঠিত কুখ্যাত অকাল্ট সংগঠন ‘অ্যানেনার্বে’ (Ahnenerbe)! নাৎসিরা এমন এক যন্ত্র তৈরি করেছিল যা মানবদেহের ডিএনএ এবং প্রকৃতির কোয়ান্টাম বিন্যাসকে ইচ্ছেমতো রূপান্তর করতে সক্ষম। আর সেই গবেষণা আধুনিক যুগে পুনরুজ্জীবিত করতে চাচ্ছে এক ভয়ংকর ছায়া সংগঠন—‘ব্ল্যাক অর্ডার’!
“বিজ্ঞান যখন উন্মাদনার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ রূপও পরিণত হতে পারে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অভিশাপে। অতীতের যে ছায়া আমরা ভুলে গেছি, তা আবার নতুন রূপে ফিরে আসছে।”
সিগমা ফোর্স: বিজ্ঞানের সাথে স্পেশাল অপসের যুগলবন্দি
জেমস রলিন্সের সিগমা ফোর্স (Sigma Force) কোনো সাধারণ সামরিক কমান্ডো দল নয়। এই ইউনিটের প্রতিটি সদস্য একাধারে যেমন বিশ্বমানের বিজ্ঞানী বা চিকিৎসক (পিএইচডি ডিগ্রিধারী), তেমনই সামরিক স্পেশাল ফোর্সের অপ্রতিরোধ্য স্নাইপার ও ট্যাকটিক্যাল অপারেটর। উপন্যাসে নেতৃত্ব দেন কমান্ডার পেইন্টার ক্রু এবং ফিল্ড এজেন্ট গ্রেসন পিয়ার্স। ডারউইনের রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে গ্রেসন পিয়ার্স, জো কোয়ালস্কি এবং ডা. লিসা কামিংসকে লড়তে হয় বিশ্বরাজনীতির শীর্ষ মহলের প্রভাবশালী এক নাৎসি বংশধর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।
| ঘটনার প্রেক্ষাপট | ভৌগোলিক অঞ্চল | বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক রহস্য |
|---|---|---|
| ডারউইনের হারানো ডায়েরি | কোপেনহেগেন ও জার্মানি | বিবর্তনবাদের গোপন অপ্রকাশিত তত্ত্ব ও জেনেটিক কোড |
| হিমালয়ের ম্যাস-ম্যাডনেস | তিব্বত ও নেপাল সীমান্ত | কোয়ান্টাম রেজোন্যান্স ও মস্তিষ্কের স্নায়বিক মিউটেশন |
| ডাই গ্লোক (Die Glocke) | পোল্যান্ড ও আল্পস পর্বতমালা | নাৎসিদের গোপন অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি ও বেল ডিভাইস প্রযুক্তি |
| চূড়ান্ত যুদ্ধ | দক্ষিণ আফ্রিকার গোপন গবেষণাগার | কৃত্রিম মানব প্রজাতি তৈরির মহা-ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ |
কেন ‘ব্ল্যাক অর্ডার’ অন্যান্য থ্রিলার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা?
- বাস্তব ইতিহাস ও বিজ্ঞানের নিখুঁত মেলবন্ধন: জেমস রলিন্স পেশায় একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী (Veterinary Physician) হওয়ায় তিনি প্রতিটি বইয়ে বাস্তব বৈজ্ঞানিক গবেষণা ব্যবহার করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আসল ‘Die Glocke’ প্রোজেক্ট এবং হিমলারের অকাল্ট সংস্থা অ্যানেনার্বের ঐতিহাসিক সত্যের সাথে আধুনিক জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অপূর্ব ফিউশন ঘটিয়েছেন তিনি।
- শ্বাসরুদ্ধকর সিনেমাটিক গতি: শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোনো বিরতি নেই। ইউরোপের তুষারাবৃত আল্পস থেকে শুরু করে হিমালয়ের চূড়া এবং আফ্রিকার উন্মুক্ত সাভানায় নন-স্টপ চেজ সিকোয়েন্স ও গানফাইট পাঠককে চুম্বকের মতো আটকে রাখে।
- সাঈম শামসের অনবদ্য অনুবাদ: বৈজ্ঞানিক পরিভাষাগুলোকে প্রাঞ্জল ও গতিশীল বাংলায় রূপান্তর করে পাঠকদের জন্য রোমাঞ্চকর পাঠ-অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করেছেন অনুবাদক।
বইটির শক্তিশালী দিক ও কাদের পড়া উচিত
✅ যাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য
- যাঁরা মাইকেল ক্রিকটন ও ড্যান ব্রাউনের বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক ষড়যন্ত্র থ্রিলার পছন্দ করেন
- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, নাৎসি গোপন প্রযুক্তি ও রহস্যপ্রেমী পাঠক
- কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা, ডারউইনের বিবর্তনবাদ ও বায়ো-টেররিজমে আগ্রহী পাঠকেরা
- সিগমা ফোর্স সিরিজের ভক্তবৃন্দ
💡 পড়ার আগে যা জানা ভালো
- যদিও এটি সিরিজের ৩ নম্বর বই, তবে কাহিনীটি সম্পূর্ণ স্ট্যান্ডঅ্যালোন—পূর্ববর্তী বই না পড়লেও উপভোগে কোনো সমস্যা হয় না
- প্রচুর বৈজ্ঞানিক ধারণা ও তত্ত্ব রয়েছে, যা মননশীল পাঠকদের বাড়তি আনন্দ দেয়
পাঠকদের প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
❓ ‘ব্ল্যাক অর্ডার’ কি সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত?
বইটির মূল কাহিনী কাল্পনিক থ্রিলার হলেও এতে উল্লিখিত নাৎসি অকাল্ট সংস্থা ‘অ্যানেনার্বে’, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘ডাই গ্লোক’ বা বেল প্রজেক্ট এবং চার্লস ডারউইনের বহু গবেষণাপত্র ঐতিহাসিক বাস্তবতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
❓ বইটি বোঝার জন্য কি পূর্বের ‘স্যান্ডস্টর্ম’ বা ‘ম্যাপ অব বোন্স’ পড়তে হবে?
না, প্রয়োজন নেই। জেমস রলিন্সের প্রতিটি উপন্যাসেই নতুন মিশন শুরু হয় এবং আগের চরিত্রগুলোর প্রয়োজনীয় ভূমিকা সুন্দরভাবে বর্ণনা করা থাকে।
❓ অনুবাদটির মান কেমন?
সাঈম শামসের অনুবাদ অত্যন্ত ঝরঝরে ও গতিশীল। টেকনিক্যাল পরিভাষাগুলোর সহজ ব্যাখ্যা থাকায় বাংলা পাঠকদের কাছে এটি অত্যন্ত উপভোগ্য ও রোমাঞ্চকর হয়ে উঠেছে।
Comments are closed.