নায়েবে নাজিম: মুর্শিদাবাদের শেষ নবাব ও ঢাকার বিস্মৃত শাসকদের অজানা ইতিহাস
বাংলার ইতিহাসে মুর্শিদাবাদ ও ঢাকার নাম উচ্চারিত হলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে নবাব সিরাজউদ্দৌলা, মীর জাফর, আলীবর্দী খাঁ কিংবা পলাশীর রক্তস্নাত আম্রকাননের করুণ দৃশ্য। কিন্তু এই সুবিশাল ভূখণ্ডের শাসনব্যবস্থার এক অত্যন্ত প্রভাবশালী অথচ কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া পদের নাম নায়েবে নাজিম (Naib Nazim)। ১৭১৭ সালে সুবাহ বাংলার রাজধানী জাহাঙ্গীরনগর (বর্তমান ঢাকা) থেকে ভাগীরথী নদীর তীরের মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরের পর পূর্ব বাংলার বিশাল অঞ্চলের শাসনভার ন্যস্ত ছিল এই নায়েবে নাজিমদের ওপর।
প্রায় সোয়া এক শতাব্দী ধরে (১৭১৭ থেকে ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) ঢাকার মসনদে বসে যারা পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলার রাজস্ব, সামরিক প্রতিরক্ষা, বিচারব্যবস্থা এবং মোগল ঐতিহ্যের শিখা প্রজ্বলিত রেখেছিলেন, তাদের ইতিহাস আজ পাঠ্যবই কিংবা সাধারণ আলোচনায় প্রায় পুরোপুরি বিস্মৃত। কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল এই পদ? মুর্শিদাবাদের নবাবদের সাথে তাদের সম্পর্ক কেমন ছিল? আর কীভাবে ধূর্ত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চক্রান্তে এই প্রতাপশালী শাসকরা শেষ পর্যন্ত নামমাত্র পেনশনার ও নিঃস্ব রাজপরিবারে পরিণত হয়েছিলেন? এই আর্টিকেলে মুর্শিদাবাদের শেষ নবাব ও ঢাকার নায়েবে নাজিমদের উত্থান, শাসনকাল, নিমতলী প্রাসাদ এবং তাঁদের ট্র্যাজিক পতনের সম্পূর্ণ ইতিহাস বিশদভাবে উন্মোচন করা হলো।

নায়েবে নাজিম পদের পটভূমি ও ঐতিহাসিক উৎপত্তি
মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে সুবাহ বাংলা (বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা) ছিল সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী প্রদেশ, যাকে তৎকালীন বিশ্বে বলা হতো ‘জান্নাতুল বিলাদ’ বা স্বর্গোদ্যান। মোগল শাসন কাঠামোয় দুটি প্রধান প্রশাসনিক পদ ছিল—
- নাজিম বা সুবাহদার: যিনি ছিলেন সামরিক প্রধান ও সার্বিক প্রশাসনিক গভর্নর।
- দেওয়ান: যিনি ছিলেন রাজস্ব ও কর আদায় বিষয়ক প্রধান কর্মকর্তা।
১৭০৪ সালে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে বাংলার সুদক্ষ দেওয়ান মুর্শিদকুলি খাঁ সুবাহ বাংলার রাজস্ব কার্যালয় ঢাকা থেকে মাকসুদাবাদে (যা পরবর্তীতে তাঁর নামানুসারে মুর্শিদাবাদ হয়) স্থানান্তর করেন। ১৭১৭ সালে সম্রাট ফারুকশিয়ার মুর্শিদকুলি খাঁকে একই সাথে বাংলার নাজিম (সুবাহদার) ও দেওয়ান হিসেবে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিলে মুর্শিদাবাদ পূর্ণাঙ্গ প্রাদেশিক রাজধানীতে রূপ নেয়।
কিন্তু ঢাকা ছিল পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলার কেন্দ্রবিন্দু। আসাম ও বার্মার সীমান্ত পাহারা, মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের দমন এবং মেঘনা ও পদ্মা নদী অববাহিকার বিপুল রাজস্ব আদায়ের জন্য ঢাকায় একজন শক্তিশালী সহকারী বা ডেপুটি সুবাহদারের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই ডেপুটি গভর্নর বা সহ-প্রশাসককেই বলা হতো নায়েবে নাজিম (نائب ناظم বা Naib Nazim)।
নায়েবে নাজিমদের সোনালী যুগ ও ক্ষমতার পরিধি
১৭১৭ থেকে ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধ পর্যন্ত নায়েবে নাজিমরা কেবল নামেমাত্র শাসক ছিলেন না; তাঁরা কার্যত স্বাধীন সম্রাটের মতোই পূর্ব বাংলার একচ্ছত্র ক্ষমতা ভোগ করতেন। তাঁদের ক্ষমতার আওতায় ছিল ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, ত্রিপুরা এবং বাকেরগঞ্জ (বরিশাল) অঞ্চল।

নায়েবে নাজিমদের প্রধান দায়িত্ব ও ক্ষমতা:
- নৌবহর বা নওয়ারা পরিচালনা: মোগল নৌবাহিনীর প্রধান কেন্দ্র ছিল ঢাকা। নায়েবে নাজিমরা বিশাল নৌবহর (Nawara) রক্ষণাবেক্ষণ করতেন এবং উপকূলীয় জলদস্যুদের হাত থেকে বাংলার বাণিজ্যপথ সুরক্ষিত রাখতেন।
- বিচার ও আইনশৃঙ্খলা (ফৌজদারি আদালত): ঢাকার প্রধান কাজি ও কোতোয়াল সরাসরি নায়েবে নাজিমের অধীনে কাজ করতেন। দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচারের সর্বোচ্চ ক্ষমতা ছিল তাঁর হাতে।
- বাণিজ্য ও মসলিন শিল্প নিয়ন্ত্রণ: ঢাকার জগৎবিখ্যাত মসলিন উৎপাদন, রাজকীয় কারখানা (মালবুস খাস) এবং ইউরোপীয় বণিকদের (ইংরেজ, ফরাসি, ওলন্দাজ) বাণিজ্য শুল্ক নির্ধারণের দায়িত্ব ছিল তাদের ওপর।
- পরবর্তী নবাবদের উত্থানের সিঁড়ি: নায়েবে নাজিম পদটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, বহু শাসক ঢাকার নায়েবে নাজিম হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করার পরই মুর্শিদাবাদের মূল মসনদে বসেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, নবাব আলীবর্দী খাঁ এবং সরফরাজ খান উভয়েই ঢাকার শাসনকাজ পরিচালনার মাধ্যমে নিজেদের প্রজ্ঞা প্রমাণ করেছিলেন।
গুরুত্বপূর্ণ নায়েবে নাজিমদের সময়ক্রম ও অবদান
| নায়েবে নাজিমের নাম | শাসনকাল | ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রধান ঘটনা |
|---|---|---|
| খান মুহাম্মদ আলী খাঁ | ১৭১৭ – ১৭২০ | ঢাকার প্রথম আনুষ্ঠানিক নায়েবে নাজিম; প্রশাসনিক পুনর্গঠন সম্পন্ন করেন। |
| মির্জা লুৎফুল্লাহ (মুর্শিদকুলি খাঁ দ্বিতীয়) | ১৭২৮ – ১৭৩৪ | ঢাকার সংস্কৃতি, চারুকলা ও স্থাপত্যের বিকাশ ঘটান; সুশাসক হিসেবে পরিচিত। |
| সরফরাজ খান ও আলীবর্দী খাঁ | ১৭৩৪ – ১৭৪০ | সামরিক দক্ষতা প্রদর্শন এবং পরবর্তীতে মুর্শিদাবাদের পূর্ণাঙ্গ নবাব হিসেবে অভিষেক। |
| নওয়াজিশ মুহাম্মদ খান | ১৭৪০ – ১৭৫৪ | আলীবর্দী খাঁর জামাতা ও ঘসেটি বেগমের স্বামী। ঢাকার হোসাইনী দালান সম্প্রসারণ ও ধনভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেন। |
| নবাব জসরাত খান | ১৭৫৫ – ১৭৮৫ (বিরতিসহ) | পলাশীর যুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী; তাঁর জন্য ব্রিটিশরা ঐতিহাসিক নিমতলী প্রাসাদ নির্মাণ করে। |
| নওয়াব নুসরাত জং | ১৭৮৫ – ১৮২২ | পণ্ডিত, ঐতিহাসিক ও কবি; ‘তারিখে নুসরাতজঙ্গী’ গ্রন্থের রচয়িতা। |
| নবাব শামসুদ্দৌলা | ১৮২২ – ১৮৩১ | ব্রিটিশ বিরোধী চক্রান্তের অভিযোগে অভিযুক্ত হন এবং ক্ষমতার সংকোচন ঘটে। |
| গাজীউদ্দীন হায়দার (পাগলা নবাব) | ১৮৩১ – ১৮৪৩ | ঢাকার শেষ নায়েবে নাজিম। তাঁর মৃত্যুর পর লর্ড এলেনবরা এই পদটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করেন। |

পলাশীর যুদ্ধ এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলদারিত্ব
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর বাংলার রাজনৈতিক আকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা নেমে আসে। মীর জাফরকে মুর্শিদাবাদের পুতুল নবাব বানানোর পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ঢাকার নায়েবে নাজিমদের ক্ষমতার ওপরও কঠোর নজরদারি শুরু করে।
নবাব জসরাত খান ও মীর কাশিমের সংঘাত:
পলাশীর যুদ্ধের সময় ঢাকার নায়েবে নাজিম ছিলেন জসরাত খান। ব্রিটিশদের প্রতি সহানুভূতিশীল সন্দেহে নবাব মীর কাশিম ১৭৬৩ সালে জসরাত খানকে বন্দী করে বিহারের মুঙ্গের দুর্গে নিয়ে যান। তবে বক্সারের যুদ্ধে (১৭৬৪) ইংরেজদের বিজয়ের পর জসরাত খানকে মুক্ত করে পুনরায় ঢাকার নায়েবে নাজিম পদে বসানো হয়।
১৭৬৫ সালের দেওয়ানি লাভ ও ক্ষমতার নিঃশেষ:
১৭৬৫ সালে মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে লর্ড রবার্ট ক্লাইভ যখন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি সনদ লাভ করেন, তখন থেকেই নায়েবে নাজিমদের বাস্তব ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া শুরু হয়।
- ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস ঢাকায় ব্রিটিশ কালেক্টর এবং ম্যাজিস্ট্রেট বসিয়ে রাজস্ব ও বিচারের মূল ক্ষমতা কোম্পানির হাতে তুলে নেন।
- নায়েবে নাজিমদের শুধুমাত্র সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের অনুমতি দেওয়া হয় এবং তাঁদের জন্য বার্ষিক নির্দিষ্ট ভাতা (পেনশন) ধার্য করা হয়।
- একদিন যারা কোটি টাকার রাজস্ব নিয়ন্ত্রণ করতেন, তারা ব্রিটিশ কোম্পানির সামান্য বৃত্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
ঢাকার নিমতলী প্রাসাদ ও নিমতলী দেউড়ি
১৭৬৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অর্থায়নে ঢাকার কেন্দ্রস্থলে নায়েবে নাজিম জসরাত খানের বসবাসের জন্য নির্মিত হয় বিখ্যাত নিমতলী প্রাসাদ (Nimtoli Palace)। বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই প্রাসাদে ছিল দরবার হল, হারেম, নহবতখানা, সুদৃশ্য বাগান এবং রাজকীয় তোরণদ্বার।

১৮৪৩ সালে নায়েবে নাজিম পদ বিলুপ্তির পর ব্রিটিশ সরকার প্রাসাদটি অধিগ্রহণ করে এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কালক্রমে প্রাসাদের বেশিরভাগ অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। বর্তমানে ঢাকার নিমতলী মোড়ে (বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রাঙ্গণে) সেই বিশাল প্রাসাদের একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঐতিহাসিক নিমতলী দেউড়ি (Nimtoli Gate)। এই দেউড়িটি তৎকালীন মোগল ও ইউরোপীয় মিশ্র স্থাপত্যরীতির এক অপূর্ব নিদর্শন।
শেষ নায়েবে নাজিম ও পদের করুণ বিলুপ্তি
ঢাকার দশম এবং সর্বশেষ নায়েবে নাজিম ছিলেন নবাব সৈয়দ গাজীউদ্দীন হায়দার, যিনি জনগণের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘পাগলা নবাব’ নামে। তাঁর অমিতব্যয়িতা, খেয়ালী স্বভাব এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের কারণে তিনি বিপুল ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েন।
১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে নিঃসন্তান অবস্থায় নবাব গাজীউদ্দীন হায়দার মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড এলেনবরা (Lord Ellenborough) এক ঘোষণায় নায়েবে নাজিম পদটি আনুষ্ঠানিকভাবে চিরতরে বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।
পরিবারের চরম দারিদ্র্য ও ট্র্যাজেডি:
পদ বিলুপ্তির পর রাজকীয় ভাতা বন্ধ হয়ে যায়। নায়েবে নাজিমদের বিধবা নারী, ভৃত্য ও উত্তরসূরিরা চরম আর্থিক অনটনে পড়েন। এককালের রাজপ্রাসাদের উত্তরসূরিদের ঢাকার অলিগলিতে অত্যন্ত মানবেতর জীবন কাটাতে হয়েছিল, যা বাংলার নবাবী ইতিহাসের অন্যতম হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি হিসেবে বিবেচিত হয়।
মুর্শিদাবাদের শেষ নবাব বনাম ঢাকার শেষ নায়েবে নাজিম
ঢাকার নায়েবে নাজিমদের পতনের সমান্তরালেই ঘটেছিল মুর্শিদাবাদের মূল নবাবদের পতন। মুর্শিদাবাদের শেষ স্বাধীন নবাব ছিলেন সিরাজউদ্দৌলা। এরপর মীর জাফর, মীর কাশিম, নজমউদ্দৌলা হয়ে ১৮৩৮ সালে মসনদে বসেন শেষ নবাব নাজিম মনসুর আলী খান (ফেরাদুন জাহ)।
- ১৮৮০ সালে ব্রিটিশরা আর্থিক সংকটের অজুহাতে মনসুর আলী খানকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে।
- ১৮৮১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নবাব নাজিম অব বেঙ্গল’ পদবী চিরতরে বাতিল করা হয় এবং তাঁর পুত্র হাসান আলী মির্জাকে কেবল সাধারণ খেতাব ‘নবাব বাহাদুর অব মুর্শিদাবাদ’ দেওয়া হয়।
- এভাবেই একই শতাব্দীর ব্যবধানে মুর্শিদাবাদের নবাব এবং ঢাকার নায়েবে নাজিম—উভয় রাজবংশই ইতিহাসের পাতা থেকে চিরতরে মুছে যায়।
বাংলার সংস্কৃতি ও স্থাপত্যে নায়েবে নাজিমদের অবদান
ক্ষমতা হারালেও ঢাকার সমাজ, সাহিত্য ও ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় নায়েবে নাজিমদের ভূমিকা ছিল অনন্য:
- হোসাইনী দালানের সংস্কার ও মহররম ঐতিহ্য: শিয়া মতাবলম্বী হলেও নায়েবে নাজিমরা সুন্নি ও হিন্দু সম্প্রদায়ের সাথে যৌথভাবে মহররমের ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল ও শোকগাথা পরিচালনা করতেন, যা ঢাকাইয়া সংস্কৃতির প্রধান উপাদানে পরিণত হয়েছিল।
- সাহিত্য ও উর্দু-ফার্সি চর্চা: নায়েবে নাজিম নুসরাত জং নিজে একজন উচ্চমানের ইতিহাসবিদ ও কবি ছিলেন। তাঁর রচিত ‘তারিখে নুসরাতজঙ্গী’ আজও অষ্টাদশ শতাব্দীর ঢাকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল।
- ঢাকার চকবাজার ও নগর উন্নয়ন: চকবাজারের শাহী মসজিদ, মসজিদ-ই-নওরোজ এবং বিভিন্ন রাজকীয় উদ্যান তৈরিতে তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল অতুলনীয়।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
নায়েবে নাজিম এবং মুর্শিদাবাদের নবাবের মধ্যে মূল পার্থক্য কী ছিল?
মুর্শিদাবাদের নবাব (নবাব নাজিম) ছিলেন পুরো সুবাহ বাংলার (বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা) সর্বপ্রধান শাসক। আর নায়েবে নাজিম ছিলেন তাঁর অধীনস্থ ডেপুটি গভর্নর, যিনি ঢাকা থেকে পূর্ব বাংলার (ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ) শাসনকাজ পরিচালনা করতেন।
ঢাকার শেষ নায়েবে নাজিম কে ছিলেন এবং কখন এই পদ বিলুপ্ত হয়?
ঢাকার শেষ নায়েবে নাজিম ছিলেন নবাব সৈয়দ গাজীউদ্দীন হায়দার (যিনি পাগলা নবাব নামে পরিচিত)। ১৮৪৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পর ব্রিটিশ সরকার নায়েবে নাজিম পদটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত ঘোষণা করে।
ঢাকার নিমতলী দেউড়ি কেন ঐতিহাসিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ?
১৭৬৬ সালে নায়েবে নাজিম জসরাত খানের বসবাসের জন্য নির্মিত বিশাল নিমতলী প্রাসাদের একমাত্র টিকে থাকা স্মৃতিচিহ্ন হলো এই নিমতলী দেউড়ি। এটি বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়াটিক সোসাইটি প্রাঙ্গণে অবস্থিত।
পলাশীর যুদ্ধের সময় ঢাকার নায়েবে নাজিম কে ছিলেন?
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের সময় ঢাকার নায়েবে নাজিম ছিলেন নবাব জসরাত খান।
উপসংহার
নায়েবে নাজিমদের ইতিহাস কেবল রাজপ্রাসাদের বিলাসবহুল উপাখ্যান নয়; এটি একটি সমৃদ্ধ জাতির স্বাধীনতা হারানো, ঔপনিবেশিক আগ্রাসন এবং কালের নির্মম বিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল। ঢাকার রাজপথে হেঁটে চলা আজকের ব্যস্ত মানুষ হয়তো নিমতলী দেউড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ভুলেই যান যে, এককালে এই মাটির বুকেই দাঁড়িয়েছিল পূর্ব বাংলার শাসন ক্ষমতার সর্বোচ্চ কেন্দ্র। ইতিহাসের এই বিস্মৃত নায়কদের জীবন ও কীর্তি পুনরায় মূল্যায়ন করা আমাদের জাতীয় শেকড় ও ঐতিহ্যকে উপলব্ধি করার জন্য অপরিহার্য।
Comments are closed.