পম্পেই নগরীর শেষ মুহূর্ত: আগ্নেয়গিরির ছাইয়ে জমাট বাঁধা জীবন ও ভিসুভিয়াসের ট্র্যাজেডি
৭৯ খ্রিস্টাব্দের এক উজ্জ্বল শরৎকাল। ইতালির নেপলস উপসাগরের তীরে অবস্থিত রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম বিলাসবহুল, ঐশ্বর্যমণ্ডিত ও প্রাণচঞ্চল নগরী পম্পেই (Pompeii)। মার্বেল পাথরের সুদৃশ্য অট্টালিকা, খোলা ফোরাম চত্বর, সুরভিত মদের সরাইখানা, রুটির বেকারি এবং পাবলিক বাথহাউসে মুখরিত ছিল প্রায় ২০ হাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবন। শহরের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে ছিল সবুজ অরণ্যে ঘেরা শান্ত ও নিরীহ পর্বত—মাউন্ট ভিসুভিয়াস (Mount Vesuvius)। মানুষ জানতোই না, প্রকৃতির এই অপরূপ পাহাড়টির গভীরে হাজার বছর ধরে সুপ্ত অবস্থায় জমে রয়েছে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রলয়ংকরী ধ্বংসের বারুদ।
মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সেই শান্ত পাহাড়ের গর্ভ ফেটে বের হয়ে এল নরকের আগুন। আকাশে উঠল ৩০ কিলোমিটার উঁচু বিষাক্ত কালো ছাইয়ের দানবীয় স্তম্ভ, নেমে এল সূর্যের আলো ঢেকে দেওয়া চির অন্ধকার এবং ধেয়ে এল কয়েকশত ডিগ্রি সেলসিয়াস উত্তপ্ত ‘পাইরোক্লাস্টিক প্রবাহ’। প্রায় ২০ ফুট পুরু আগ্নেয় ছাই ও লাভার স্তূপের নিচে এক নিমিষে চিরতরে জীবন্ত কবর রচিত হলো পুরো পম্পেই নগরীর। সময় সেখানে আক্ষরিক অর্থেই জমাট বেঁধে গেল প্রায় দুই হাজার বছরের জন্য।

পম্পেই নগরীর আভিজাত্য ও প্রাক-ধ্বংস রোমান জীবন
তৎকালীন রোমান সাম্রাজ্যের ধনী অভিজাত, সিনেটর ও বণিকদের জন্য পম্পেই ছিল এক পরম স্বর্গরাজ্য। রোমের প্রচণ্ড গরম থেকে বাঁচতে ধনী রোমানরা এখানে ছুটি কাটাতে আসতেন। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, নগর পরিকল্পনায় পম্পেই ছিল সমকালের চেয়ে বহু বছর এগিয়ে:
- উন্নত অ্যাকুয়াডাক্ট ও স্যানিটেশন: দূরবর্তী পর্বত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে শহরে বিশুদ্ধ পানি আনা হতো। পাবলিক ফোয়ারা, ব্যক্তিগত ভিলা এবং আধুনিক নিষ্কাশন নালা দিয়ে শহরটি সজ্জিত ছিল।
- শিল্পকলা ও মোজাইক সংস্কৃতি: বাড়ির মেঝেগুলোতে ছিল রঙিন পাথরের সূক্ষ্ম মোজাইক শিল্পকর্ম এবং দেওয়ালে উজ্জ্বল লাল ও সোনালী রঙের দৃষ্টিনন্দন ‘ফ্রেস্কো’ (Fresco) চিত্রকর্ম।
- বাণিজ্যিক গতিশীলতা: শহরে ছিল ৩৩টি বেকারি, শতাধিক ট্যাকভার্ন (বার ও রেস্তোরাঁ), অ্যাম্ফিথিয়েটার যেখানে ২০ হাজার মানুষ বসে গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই দেখতে পারত।
তবে ৬২ খ্রিস্টাব্দে এক শক্তিশালী ভূমিকম্প এবং পরবর্তীতে ঘন ঘন ছোটখাটো ভূকম্পনে শহরের অনেক দালান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। রোমানরা ভাবত এটি দেবতা ভলকানের কোনো সাধারণ লীলাখেলা; তারা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি যে ভিসুভিয়াসের ভূগর্ভস্থ ম্যাগমা চেম্বার ফেটে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ভিসুভিয়াসের মহাবিস্ফোরণ: প্লিনিয়ান অগ্ন্যুৎপাতের ভয়াল রূপ
ঐতিহাসিকভাবে ধারণা করা হতো বিস্ফোরণটি ঘটেছিল ৭৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ আগস্ট। তবে সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া এক শ্রমিকের কাঠকয়লার শিলালিপি (Charcoal Inscription) এবং শুকনো ডালিম-আখরোটের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে বিপর্যয়টি আসলে ঘটেছিল ৭৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ অক্টোবর।
দুপুর একটার দিকে এক বিকট গগনবিদারী শব্দে ভিসুভিয়াসের শীর্ষদেশ উড়ে যায়। এই অগ্ন্যুৎপাতের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন রোমান লেখক প্লিনি দ্য ইয়াঙ্গার (Pliny the Younger), যিনি উপসাগরের অপর প্রান্ত থেকে পুরো ঘটনাটি চিঠিতে লিখে রেখেছিলেন। তাঁর নামানুসারেই আধুনিক আগ্নেয়গিরি বিজ্ঞানে এই ধরনের মহাবিস্ফোরণকে ‘প্লিনিয়ান অগ্ন্যুৎপাত’ (Plinian Eruption) বলা হয়।
প্লিনি লিখেছেন, আকাশ জুড়ে এমন এক ধোঁয়ার কুন্ডলী উঠেছিল যা দেখতে একটি বিশাল ভূমধ্যসাগরীয় পাইন গাছের মতো—একটি দীর্ঘ কাণ্ড আকাশে উঠে গিয়ে ওপরের দিকে ডালপালার মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৫ লক্ষ টন গলিত পাথর ও ছাই আকাশে নিক্ষিপ্ত হচ্ছিল, যার শক্তি ছিল হিরোশিমার পারমাণবিক বোমার চেয়ে প্রায় ১ লক্ষ গুণ বেশি!

পাইরোক্লাস্টিক প্রবাহ: কয়েক সেকেন্ডে জমাট বাঁধা মৃত্যু
অগ্ন্যুৎপাতের প্রথম ভাগে আকাশ থেকে অবিরাম ঝরে পড়তে থাকে হালকা অথচ ধারালো পিউমিস পাথর ও বিষাক্ত ছাই। বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে বা ভয়ে ঘরের ভেতর আশ্রয় নেয়। কিন্তু আসল বিভীষিকা নেমে আসে পরের দিন ভোরে।
আকাশে জমে থাকা লাখ লাখ টন ভারী ছাই ও গ্যাসের মেঘ যখন আর বায়ুমণ্ডলে ভেসে থাকতে পারল না, তখন তা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে প্রচণ্ড বেগে নিচের দিকে আছড়ে পড়ল। একে বলা হয় পাইরোক্লাস্টিক প্রবাহ (Pyroclastic Surge)।
ঘণ্টায় প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার গতিতে ধেয়ে আসা ৩০০ থেকে ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস উত্তপ্ত এই গ্যাস ও ছাইয়ের সুনামি সেকেন্ডের মধ্যে পুরো পম্পেইকে ঢেকে ফেলে। আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞানীদের মতে, পম্পেইবাসীদের মৃত্যু দীর্ঘশ্বাসরোধে হয়নি; বরং প্রচণ্ড তাপীয় শকে (Thermal Shock) তাদের মস্তিষ্কের তরল মুহূর্তের মধ্যে বাষ্পীভূত হয়ে গিয়েছিল এবং শরীরের পেশিগুলো তাৎক্ষণিকভাবে শক্ত হয়ে জমে গিয়েছিল (Cadaveric Spasm)। কেউ হাত দিয়ে মুখ ঢেকে থাকা অবস্থায়, মা শিশুকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায়, কিংবা কেউ পালানোর জন্য দরজার হাতল ধরে থাকা অবস্থাতেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পাথরের মতো নিথর হয়ে যায়।

১৭৪৮ সালে পুনরাবিষ্কার ও ফিওরেল্লির জাদুকরী প্লাস্টার কাস্ট
বিপর্যয়ের পর দীর্ঘ প্রায় ১৭০০ বছর ধরে পম্পেই শহরটি পৃথিবীর মানচিত্র থেকে সম্পূর্ণ হারিয়ে গিয়েছিল। মাটির ২০ ফুট গভীরে অক্সিজেন ও আর্দ্রতাহীন ছাইয়ের আবরণে শহরটি ঠিক যেভাবে ছিল, সেভাবেই এক অক্ষত টাইম ক্যাপসুল হিসেবে সংরক্ষিত হয়ে থাকে।
১৭৪৮ সালে এক কৃষক কূপ খনন করতে গিয়ে প্রাচীন রোমান স্থাপত্যের সন্ধান পায়। কিন্তু পম্পেইকে বিশ্ববাসীর সামনে সবচেয়ে নাটকীয়ভাবে তুলে ধরেন ১৮৬০-এর দশকের ইতালীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জিউসেপ্পে ফিওরেল্লি (Giuseppe Fiorelli)।
প্লাস্টার কাস্টের বৈজ্ঞানিক কৌশল
খননকালে ফিওরেল্লি লক্ষ্য করেন, শক্ত ছাইয়ের স্তরের মধ্যে অদ্ভুত কিছু ফাঁপা গহ্বর (Hollow Voids) রয়েছে। তিনি বুঝতে পারেন, ছাইয়ের নিচে চাপা পড়া মানুষের মৃতদেহ শত শত বছর ধরে পচে মাটির সাথে মিশে গেছে, কিন্তু তাদের শরীরের আকারের শক্ত ছাঁচটি ছাইয়ের মধ্যে অবিকল রয়ে গেছে।
তিনি সেই ফাঁপা ছিদ্রগুলোতে তরল প্লাস্টার অব প্যারিস (Plaster of Paris) ঢেলে দেন এবং প্লাস্টার শুকিয়ে যাওয়ার পর চারপাশের নরম ছাই সাবধানে সরিয়ে ফেলেন। এর ফলে উন্মোচিত হয় এক অবিশ্বাস্য ও লোমহর্ষক দৃশ্য—৭৯ খ্রিস্টাব্দের রোমান নাগরিকদের মৃত্যুর শেষ মুহূর্তের শরীর, পরনের কাপড়ের ভাঁজ, জুতার ফিতা, এমনকি তাদের মুখের চরম আতঙ্ক ও যন্ত্রণার অভিব্যক্তি অবিকল ত্রিমাত্রিক ভাস্কর্য হিসেবে পুনর্জন্ম লাভ করে!

পম্পেই বনাম হারকিউলেনিয়াম: দুই শহরের পরিণতির তুলনা
ভিসুভিয়াসের প্রলয়ে পম্পেই ছাড়াও প্রতিবেশী হারকিউলেনিয়াম (Herculaneum) শহরটিও ধ্বংস হয়েছিল। তবে তাদের ধ্বংসের প্রকৃতি ছিল ভিন্ন:
| প্যারামিটার | পম্পেই (Pompeii) | হারকিউলেনিয়াম (Herculaneum) |
|---|---|---|
| ভিসুভিয়াস থেকে দূরত্ব | প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে | মাত্র ৬ কিলোমিটার পশ্চিমে (একেবারে কাছে) |
| প্রধান ধ্বংসের কারণ | পিউমিস পাথরের বৃষ্টি এবং পরবর্তীতে পাইরোক্লাস্টিক প্রবাহ | চরম উত্তপ্ত (৫০০°C) পাইরোক্লাস্টিক কাদার স্রোত |
| চাপা পড়ার গভীরতা | ১৫ থেকে ২০ ফুট ছাইয়ের স্তর | ৫০ থেকে ৬০ ফুট শক্ত আগ্নেয় শিলা |
| সংরক্ষণের অবস্থা | ভবনের দেওয়াল, প্লাস্টার কাস্ট ও ফ্রেস্কো সংরক্ষিত | কাঠের আসবাবপত্র, ছাদ, এমনকি প্যাপিরাসের বই ও কঙ্কাল সংরক্ষিত |
আধুনিক বিজ্ঞানের আলোয় পম্পেই ও আগামীর ভিসুভিয়াস
আজকের দিনে আধুনিক সিটি স্ক্যান, এক্স-রে এবং প্রাচীন ডিএনএ (aDNA) বিশ্লেষণের মাধ্যমে পম্পেইবাসীদের স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস এবং জেনেটিক উৎস সম্পর্কে চমকপ্রদ সব তথ্য উন্মোচিত হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সামুদ্রিক মাছ, জলপাইয়ের তেল ও দানাদার শস্য খাওয়ার কারণে তাদের দাঁত ও হাড়ের স্বাস্থ্য ছিল অবিশ্বাস্য রকম মজবুত।
তবে পম্পেইয়ের এই ট্র্যাজেডি কেবল অতীতের কোনো ইতিহাস নয়; এটি বর্তমান পৃথিবীর জন্যও এক গভীর দুশ্চিন্তা। মাউন্ট ভিসুভিয়াস আজও পৃথিবীর অন্যতম বিপজ্জনক সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। এর ঢালে এবং আশপাশের নেপলস মেট্রোপলিটন এলাকায় আজ প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের বসবাস। যদি ভিসুভিয়াস আবারও ৭৯ খ্রিস্টাব্দের মতো ভয়াল রূপ নিয়ে জেগে ওঠে, তবে আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে বড় উচ্ছেদ ও উদ্ধার সংকটের মুখোমুখি হতে হবে ইতালিকে।
পম্পেই নগরী আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের তৈরি সাম্রাজ্য, আভিজাত্য, প্রযুক্তি আর ধনদৌলত যতই শক্তিশালী হোক না কেন, প্রকৃতির রুদ্ররোষের সামনে তা কতখানি অসহায় ও ক্ষণস্থায়ী। ছাইয়ের নিচে নিথর হয়ে যাওয়া সেই প্লাস্টার কাস্টগুলো আজও নীরব কণ্ঠে বিশ্ববাসীকে প্রকৃতির শক্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার চিরন্তন বার্তা দিয়ে চলেছে।
Comments are closed.