দ্যা ম্যাসেজ (১৯৭৬)- দ্যা স্টোরি অব ইসলাম

একটা বায়োপিক তৈরি করা হবে কিন্তু বায়োপিকের কোথাও যাকে নিয়ে তৈরি করা হবে, তাকে এক মুহূর্তের জন্যেও দেখানো যাবেনা, তার কোন মৌখিক উদ্ধৃতিও শোনা যাবেনা। এ রকমটা কি করা সম্ভব? যে কেউই উত্তরে বলবে, অসম্ভব। মুল চরিত্র যেখানে অনুপস্থিত, সেখানে কি কিরে ওই চরিত্র পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব? এমন অসম্ভব কাজ করেছেন সিরিয়ায় জন্মগ্রহণ করা মোস্তফা আক্কাদ ১৯৭৬ সালে তার জীবনের প্রথম সিনেমা ‘দ্যা ম্যাসেজ’ এ।    

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে নিয়ে যতগুলো কাজ হয়েছে কোনটাই বিতর্কের বাইরে যায়নি। মোস্তফা আক্কাদকেও ‘দ্যা ম্যাসেজ’ তৈরি করতে গিয়ে বিড়ম্বনার স্বীকার হতে হয়েছে। যদিও শেষ পর্যন্ত চিত্রনাট্য দেখে মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় এ সিনেমা তৈরির ব্যাপারে সম্মতি জানিয়েছেন। মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ এ সিনেমা বর্জন করলেও পরবর্তীতে এ বায়োপিক তৈরি করতে মরক্কো সরকার ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছে। মরক্কোর পর লিবিয়ার গাদ্দাফিও এ বায়োপিক তৈরিতে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন।  

দ্যা ম্যাসেজ (১৯৭৬)
Source: DVDcity

সার-সংক্ষেপ:

সিনেমার গল্প শুরু হয় হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নবুওয়ত প্রাপ্তির সময় থেকে। নবুওয়ত প্রাপ্তির পূর্বের মক্কা ও কাবার মূর্তি পূজার কয়েকটি দৃশ্যের পর জিবরাইল (আঃ) হেরা পর্বতের গুহার সম্মুখে আসেন। এখানে জিবরাইল ও মুহাম্মদ (সাঃ) কাউকেই দেখানো হয়নি৷ তাদের কাউকে প্রদর্শন না করেও দক্ষতার সাথে প্রথম কুরান নাজিলের অবস্থা তুলে ধরেন।

পবিত্র কুরান নাজিলের পরবর্তী অবস্থা বর্ণনা করেন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পালকপুত্র যায়েদের মাধ্যমে। আবার কখনো তার চাচা আবু তালিব কিংবা অন্যত্র হামযা (রাঃ) এর মাধ্যমে। কিছুকাল নিজেদের মধ্যে ইসলাম প্রচারের পর প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার শুরু করার অনুমতি আসে। তারপর থেকে মক্কায় শুরু হয় নির্যাতন। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও তার মুসলিম সাহাবীদের উপর আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীদের নির্যাতন। হযরত বিলাল (রাঃ) কে উত্তপ্ত বালুকাময় মরুভূমির উপর পাথর চেপে হত্যার চেষ্টা করেন।

নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সহ সকল মুসলিমের প্রথমে তায়েফ গমন, আবার সেখান থেকে নির্যাতিত হয়ে পরে মদিনায় হিজরতের দৃশ্য উত্তপ্ত বালুকাময় মরুভূমির পথে অংকন করেন পরিচালক মোস্তফা আক্কাদ।  

মদিনায় মুসলমানদের সুদিন ফিরে আসে। প্রথমে সকলে মিলে মসজিদে নববী তৈরি করেন, সেখানে বিলাল (রাঃ) ইসলামের সর্বপ্রথম আজান দেন। তারপর ইসলাম চারদিকে ছড়িয়ে দিতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দূত পাঠান রসুল (সাঃ)। মক্কার কুরাইশদের সাথে দ্বন্দ্বে ইসলামের প্রথম দুটি যুদ্ধ বদর ও উহুদ যুদ্ধ সিনেমায় তুলে আনেন মোস্তফা আক্কাদ। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর্যন্ত ইসলামের ছায়াতলে অবস্থান নেয় দশ হাজারেরও অধিক মানুষ।   

তারপর মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে সিনেমা শেষ হয়। মক্কা বিজয়ের সময় কাবা শরীফের সকল মূর্তি সরিয়ে ফেলে আবু সুফিয়ান ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নেয়, ইসলামের জয়জয়কার অবস্থা। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে রসুল (সাঃ) এর জীবনের প্রথম ও শেষ হজ্জ্ব বিদায় হজ্জ্বের ভাষণ তুলে ধরেন।

সিনেমা ‘দ্যা ম্যাসেজ’
Source: The National

চিত্রনাট্য পর্যালোচনা:

ইসলামি ভাবধারার নিয়মানুযায়ী যেমন হযরত মোহাম্মাদ (সাঃ) কে দেখানো হয়নি, তেমনি তার পুত্র-কন্যা, ইসলামের চার খলিফা কাউকেই চিত্রায়ন করা হয়নি। বদর যুদ্ধে হামযা (রাঃ) এর সাথে আলী (রাঃ)ও যে উপস্থিত আছেন তা বুঝানো হয়েছে, কিন্তু আলী (রাঃ) কেও প্রদর্শন করা হয়নি।

পালকপুত্র যায়েদ, চাচা আবু তালিব, আবু সুফিয়ান, বিলাল (রাঃ) এরাই সিনেমার মূল চরিত্র। যখন যাকে দিয়ে সম্ভব হয়েছে তাকে দিয়ে কৌশলে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর উক্তি বর্ণনা করিয়েছেন।

মোস্তফা আক্কাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল যেহেতু হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর চিত্রায়ন ইসলামে নিষিদ্ধ, মুহাম্মদ (সাঃ) কে ছাড়াই চিত্রনাট্য তুলে আনতে হবে। সেজন্যে সিনেমার মূল চরিত্র একবারও প্রদর্শন করেন নি। এন্থনি কুইন পিপল ম্যাগাজিনে বলেন- ” হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে তো নয়ই, তার ছায়া পর্যন্ত দেখানো হয়নি”।

দ্যা ম্যাসেজ এক কথায় হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনী৷  যদিও এ সিনেমাকে পূর্নাঙ্গ জীবনী বলা যাবে না, এখানে নবুওয়াত প্রাপ্তির সময় থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তুলে ধরা হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এই সিনেমার সত্যায়ন কয়েকবার যাচাই করা হয়েছে৷ ফলে ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে কারো দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই।

পশ্চিমা বিশ্ব এবং ইসলামিক দেশ গুলোর বোঝার সুবিধার্থে দুটি সংস্করণে তৈরি করেন। আরবি ও ইংরেজি। ইংরেজি ভাষায়  Best Music, Original Score এ অস্কারে নমিনেশন পায়। IMBD রেটিং এ ৮.৮ নিয়ে সেরা সিনেমার তালিকায় আছে দ্যা ম্যাসেজ।  Rotten Tomatoes এ এভারেজ রেটিং ৪.৩/৫ ধরে রেখেছে ১৯৭৬ সালে তৈরি হওয়া দ্যা ম্যাসেজ।

দ্যা ম্যাসেজ
Source: Flicks.co.nz

বিশ্বব্যাপী ইসলামের জন্য কাজ করার উৎসাহ নিয়ে মোস্তফা আক্কাদ হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবদ্দশায় আরবে ইসলামের অবস্থা, প্রচার, প্রসার তুলে ধরেন। দ্যা ম্যাসেজের পর হ্যালুইন সিরিজের জন্য মোস্তফা আক্কাদ আরও সমাদৃত হন। ব্যক্তিজীবনে তিনি ডেভিড লীন (দ্যা লরেন্স অব এরাবিয়া [১৯৬২]) থেকে অনুপ্রাণিত। মোস্তফা আক্কাদ তার জীবনের প্রথম ছবির জন্যই ব্যাপক আলোচিত সমালোচিত হয়েছেন। সিনেমার নাম প্রথমে  Muhammad: The Messenger of God ঠিক করেন। কিন্তু তৎকালীন বিভিন্ন ইসলামি গোষ্ঠীর চাপে নাম পরিবর্তন করে The Message নামকরণে প্রচার করেন।

মুহাম্মদ (সাঃ) কে নিয়ে আরও অনেক সিনেমা, গল্প, উপন্যাস হলেও তন্মধ্যে ‘দ্যা ম্যাসেজ’ চিত্রনাট্যের কাতারে সবকিছুর ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পরবর্তী জীবন সম্পূর্ণভাবে বুঝতে হলে দেখতে হবে মোস্তফা আক্কাদের মত গল্প বলার দক্ষ কারিগরের মাস্টারপিস ‘দ্যা ম্যাসেজ’ চলচ্চিত্রটি।